বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিল্পোৎপাদনে পড়ছে এর প্রভাব। বাধ্য হয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক, সিরামিক, ইস্পাত, বস্ত্রসহ বিভিন্ন খাতের শিল্প-কারখানা। লোকসানে পড়ে উদ্যোক্তাদের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে; পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না হওয়ায় লোকসান ঠেকাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। জটিল এ পরিস্থিতিতে খোদ সরকারের কাছেও এর সহজ সমাধান নেই বলে জানানো হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। জ্বালানি সংকটে যেভাবে কারখানাগুলো বসে থাকছে, তাতে শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়; ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার শঙ্কাও বাড়ছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে বেসরকারি খাত কতটা ধুঁকছে, তার একটি চিত্র গত রোববার বিসিআইয়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার সামনে তুলে ধরেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা। ওই বৈঠকে তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত কয়েক মাসে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। উদ্বেগজনক খবর। শিল্পের উৎপাদন কমলে তার প্রভাবে অর্থনীতিও সংকুচিত হয়ে পড়বে, যা নতুন সংকট তৈরি করবে। এক্ষেত্রে দ্রুতই জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাড়তি দামে হলেও জ্বালানি নিশ্চিত করা হোক। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা আয় বাড়াতে সহায়তা জোগাবে।

কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন আলোচনা ও সেমিনারে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা বিষয়টি তুলে ধরছেন। দেশ এখন কঠিন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট মোকাবেলা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমদানির মতো বিপুল অর্থ না থাকায় সরকারের পক্ষে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় করা যাচ্ছে না। এতে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকার যে ঘোষণা দিয়েছে, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি হারে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কারখানাগুলো চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যারা পারছে, তারা বেশি খরচ করে চালাচ্ছে, যারা পারছে না তারা কঠিন বিপাকে আছে। কিন্তু এ সংকটের জন্য বহির্বিশ্বের যেমন প্রভাব পড়ছে, ঠিক একইভাবে সরকারেরও দায় রয়েছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে বেশি জোর দেয়ায় আজ সংকট এত তীব্র হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বল্প মূল্যে জ্বালানি আমদানির উৎস অনুসন্ধান করা হোক। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্রয়াদেশ আরো কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এখন সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারায় নতুন করে রফতানি কমছে। আর পোশাক খাতেও ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে নেয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এখন এলএনজি আমদানি করে শিল্প টিকিয়ে রাখা ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। রিজার্ভে হাত না দিয়েও বিকল্প উপায়ে সরকার টাকা সংগ্রহ করতে পারে, তার প্রক্রিয়া অনুসন্ধান জরুরি। আর সেটা দিয়ে ডলারের সংস্থান করা যাবে। সরকার অতিমাত্রায় সতর্ক হয়ে ডলার বাঁচাতে গিয়ে শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না দিতে পারলে পুরো অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তখন সেটা সামাল দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও সংকটে পড়েছে। যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানির মতো অন্যান্য উন্নত দেশও জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট কত দিন চলবে তা অনিশ্চিত। এ কারণে উন্নত দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে অধিক হারে জ্বালানি সংগ্রহ করে রিজার্ভ গড়ে তোলায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। উপমহাদেশের দেশগুলোও জ্বালানি সংকটের মধ্যে পড়েছে। পাকিস্তানে সংকট দেখা দেয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা অবলম্বন করে চলেছে দেশটি। জ্বালানি সংকটে শ্রীলংকার কী শোচনীয় অবস্থা দাঁড়িয়েছে তা সবারই জানা। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে পর্যবেক্ষকরা শ্রীলংকার মতো হওয়ার ‘পূর্বাভাস’ হিসেবে গণ্য করে এখন থেকেই সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ আশঙ্কা থেকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নেয়া এবং অপচয় রোধ করা ছাড়া উপায় নেই বলে তারা মত দিয়েছেন। তা না হলে দিন যত যাবে সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠবে। শুধু লোডশেডিং করে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এজন্য যেসব কম গুরুত্বপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে।

জ্বালানি উপদেষ্টা নানা আশঙ্কার কথা শুনেও তেমন আশ্বাস দিতে পারেননি উদ্যোক্তাদের। তিনি বরং দিনের বেলা বিদ্যুৎ না দিয়ে লোডশেডিং বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন। তিনি জানান, আগামী ছয় মাসের জন্য ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা ব্যয়বহুল হবে। এ সময়ে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ দেয়া ঠিক হবে না বলেই তিনি এমন মন্তব্য করেন। অনেকেই বলছেন, সরকারের রিজার্ভ যদি ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে থাকে, তাহলে মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করা কঠিন কিছু নয়। তাছাড়া পাইপলাইনে আইএমএফের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমলেও সেখান থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। প্রয়োজনীয় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সাশ্রয়ী হওয়া এবং কৃচ্ছ্রসাধনের বিকল্প নেই। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুঁজে বের করতে হবে কোথায় কোথায় বিদ্যুতের অপচয় হয়, অপ্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং কোথায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়—এসব বিষয় খতিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেখানে যেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যেতে পারে সেখানেই তা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা রয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। রাজধানীসহ বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে বিদ্যুচ্চালিত বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড রয়েছে, সেগুলো সময় নির্দিষ্ট করে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এসব অপ্রয়োজনীয় স্থান চিহ্নিত করতে হবে। যেসব অবৈধ সংযোগ রয়েছে, সেগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। বছরের পর বছর ধরে চলা সিস্টেম লস নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না, অথচ সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করার চিন্তাভাবনা করতে হবে।

বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল এবং গতিশীল রাখার উদ্যোগ অনেকটা কাজ দিলেও সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকট তথা লোডশেডিং থমকে দিচ্ছে সবকিছুকেই। কারণ এখন বিদ্যুিনর্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, জনজীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে বিদ্যুতের সার্বক্ষণিক ব্যবহার, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যুিনর্ভরতাকে কিছুতেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তেমনি পরিস্থিতিতে বিদ্যুত্প্রাপ্তিকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্প্রাপ্তিতে সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যাচ্ছে নয়তো ধীরগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। চলমান লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন। আগামী দিনগুলোয় সংকট আরো ঘনীভূত হলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে ধারণা করা যায়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমদানি করা জ্বালানিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে গত দেড় দশক সময়ে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাতের কার্যত আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যখন আমদানি কমাতে হয়েছে, তখন উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। জ্বালানির জন্য দেশীয় উৎস গ্যাসের অনুসন্ধান ও গ্যাস উত্তোলনে যথাযথ মনোযোগ না দেয়ার বিষয়টি স্পষ্টতই বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনার বড় ত্রুটি। মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নবিষয়ক সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্যানুযায়ী দেশের সব মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হওয়া।