গণপরিবহনের সংকট ও উন্মুক্ত স্থানের অপ্রতুলতার কথা বললে সবার দৃষ্টি চলে যায় ঢাকার দিকে। ঢাকা নিয়েই সবচেয়ে বেশি পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা হয়। কিন্তু জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সহজ গণপরিবহন ও উন্মুক্ত স্থান ব্যবহারের সূচকে অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরের পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে কুমিল্লা ও গাজীপুর এবং দুটি শহরই ঢাকার নিকটবর্তী। একটি শহর কীভাবে গড়ে উঠবে এবং তাতে নাগরিকদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা থাকবে তার সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকে নগর পরিকল্পনায়। কিন্তু কুমিল্লা ও গাজীপুরের ক্ষেত্রে অনেকটা পরিকল্পনাহীন এবং পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। এর জন্য নগরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান যেমন নেই, তেমনি নেই সহজ গণপরিবহন প্রাপ্তির সুযোগ। আলোচ্য সূচকে দেশের অন্যান্য জেলা শহরের অবস্থাও খুব একটা সুখকর নয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অন্যান্য বড় জেলা শহরের অবস্থা ঢাকার মতো হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। ভুলে গেলে চলবে না, ঢাকা কিন্তু বিশ্বের বসবাস অযোগ্য নগরীর একটি। নতুন করে কোনো জেলা শহরের নাম এ তালিকায় যুক্ত হোক তা কারো কাম্য নয়। তাই দ্রুত বর্ধিষ্ণু জেলা শহরগুলোকে কেন্দ্র করে কার্যকর নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, সেটি যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে। এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা জরুরি।

বড় শহরগুলোর প্রায় সবই সম্প্রসারণ হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। জনসাধারণের জন্য সহজ গণপরিবহন ও উন্মুক্ত স্থানের মতো নাগরিক সুবিধাগুলো এসব শহরের উন্নয়ন ভাবনায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। যদিও নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নগরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থানের অভাব অনুভূত হচ্ছে বেশ জোরেশোরেই। এসব সুবিধার অভাবে নগরগুলোর পরিবেশ যেমন অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে, তেমনি দুর্ভোগের মাত্রাও বেড়েছে নাগরিকদের। যেকোনো নগরবিদের দৃষ্টিতে একটি চলমান শহরের পরিচিতি নির্ভর করে তার মানসম্পন্ন ফুটপাত ও গণপরিবহনের ওপর। অর্থাৎ শহরে মানুষের চলাচল ব্যবস্থা আছে কিনা তার ওপর। কারণ স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে মানুষ হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। হাঁটা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এর মাধ্যমে অর্থেরও সাশ্রয় হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর শতকরা ২৭ দশমিক ৩ ভাগ হয় ডায়াবেটিস, হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের অসুখ ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর অন্যতম কারণ আমাদের শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া। আবার হাঁটার পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান না থাকায় মানুষ হেঁটে চলাচলে উৎসাহ বোধ করে না। নিরাপত্তাও এখানে একটা অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। ফুটপাত সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাণিজ্যিক চিন্তার কবলে। পথিকবান্ধব নাগরিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে ফুটপাতের বিকল্প নেই। দোকান মালিকদের যদি বোঝানো যায়, পরিষ্কার ফুটপাত মানে আরো ক্রেতা। এজন্য দোকানিকেই ফুটপাতের রক্ষক হিসেবে কাজ করা উচিত। লাইসেন্সধারী হকারদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরের কিছু স্থানে স্বল্পমূল্যের বাজার তৈরি করে পুনর্বাসিত করা সম্ভব। অবমুক্ত ফুটপাত শুধু হাঁটার সংস্কৃতিকেই উৎসাহিত করবে না, একটি নগরে সবুজ অর্থনীতি তৈরিতেও সাহায্য করবে। কারণ, কম গাড়ি মানে কার্বনমুক্ত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া।

নব্বই দশকের শেষ দিকে বোগোটার মেয়র এনরিকে পেনিয়ালোসা তার শহরের রাস্তাগুলোকে রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক মাফিয়া এবং তাদের পরিবহন ব্যবসার দখল থেকে অবমুক্ত করে গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং একটি গণচত্বর নীতিমালার আওতায় এনেছিলেন। এ কারণে রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা তাকে মেয়রের অফিস থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু পেনিয়াসোলার গণমুখী নগরনীতি শুধু তাকে রাজনৈতিকভাবেই টিকিয়ে রাখেনি, তাকে করেছে বোগোটার ইতিহাসের অন্যতম সফল মেয়র। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ঢাকাকেও গতিশীল ও বাসযোগ্য একটি পরিবেশবান্ধব আদর্শ শহরে পরিণত করা সম্ভব। যেখানে সব উপাদান থাকবে পরিকল্পিত ও প্রয়োজন অনুসারে। বাসস্থানের পাশাপাশি প্রচুর গাছপালা থাকবে, প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকবে সুরক্ষিত, শিশুরা পাবে নিরাপদে খেলাধুলার পরিবেশ, সব বয়সী মানুষের জন্য থাকবে সুস্থ চিত্তবিনোদনের উন্মুক্ত স্থান, গণপরিসর, যা মানুষের সামাজিকীকরণের মাধ্যমে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগানের জন্য শুধু গ্রামনির্ভর না থেকে বাসস্থানের কাছাকাছি কিংবা আধুনিক চিন্তা যেমন ছাদ বাগানের মাধ্যমে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এককথায়, যে নগরে মানুষ গতানুগতিক যান্ত্রিকতা এড়িয়ে আন্তরিকতাপূর্ণ সুন্দর জীবন উপভোগ করতে পারবে। যে নগর বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য ‘আদর্শ নগর’ হয়ে থাকবে। নগর তত্ত্বাবধায়কদের এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল এবং সুবিবেচনার প্রমাণ রাখতে হবে।

দেশের বড় শহরগুলো বেশ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এখানে হাঁটার সুযোগ খুব কম। নাগরিকরা চাইলেই হেঁটে গন্তব্যে যেতে পারে না। একটু হাঁটার পর বসার জায়গা, রাস্তায় পানি খাওয়া ইত্যাদি সেবার ব্যবস্থা যদি সিটি করপোরেশন নাগরিকদের জন্য রাখতে পারত, তাহলে শহরে গাড়ির পরিমাণ কমত। কার্বন নিঃসরণও কম হতো। শহুরে রাস্তায় নাগরিকদের হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত স্থানের সংস্থান রাখার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। দেশের প্রধান শহরগুলোয় ফুটপাত থাকলেও প্রায় ক্ষেত্রেই এসব স্থান বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই ফুটপাতগুলোর গঠন বৃদ্ধ, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের চলাচলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করা নেই। কোনো কোনো স্থানে আবার ফুটপাতের মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিবন্ধকতা, যা সবার চলাচলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা দরকার। ঢাকাসহ বর্ধিষ্ণু শহরে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনক কম। এ থেকেই অনুমান করা যায়, শহরগুলোয় খেলার মাঠের কেমন অবস্থা। সব শ্রেণী-পেশা, লিঙ্গ ও বয়সের মানুষ যে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করবে এমন জায়গার রয়েছে তীব্র সংকট। শহরগুলোয় অপরিকল্পিত ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একাধিক ওয়ার্ড, যেখানে একটিও মাঠ নেই। ঢাকায় যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেই প্রবেশের অনুমতি নেই জনসাধারণের। বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কলোনির তত্ত্বাবধানে থাকায় সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পায় হাতেগোনা কিছু নাগরিক। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আদর্শ একটি শহরের ১০-১৫ শতাংশ এলাকা জলাশয় এবং ১৫-২০ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি করে এলাকার মহাপরিকল্পনার গেজেট হলেও মন্ত্রণালয় দুটির দায়িত্ব আরো বিস্তৃত। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, অধিদপ্তরটি ১৯৮১ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা নিয়ে মোট ৪৪২টি মহাপরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে জেলা শহরের পৌরসভা এলাকার জন্য মহাপরিকল্পনা ছিল ৫০টি এবং ৩৯২টি মহাপরিকল্পনা ছিল বিভিন্ন উপজেলার জন্য। কিন্তু এগুলোর কোনোটিরই গেজেট হয়নি। ফলে এ পরিকল্পনাগুলো মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালে তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫৬টি পৌরসভা ও দুটি সিটি করপোরেশনের মহাপরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু অজানা কারণে পাঁচটি পৌরসভা ছাড়া আর কোনো এলাকার মহাপরিকল্পনার গেজেট হয়নি। এতে এসব পরিকল্পনাও বাক্সবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ফলে মহাপরিকল্পনা করার প্রকল্প বাস্তবায়নে যে টাকা খরচ হয়েছিল, তার অপচয় হয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের অর্ধেক মানুষ যে নগরগুলোতে বাস করবে, সেই নগর কি ঢাকার মতো বাসযোগ্যতাহীন হবে, শব্দদূষণে, বায়ুদূষণে কি শীর্ষ শহরের তালিকায় থাকবে, গণপরিবহনে, রাস্তার আয়তনে কি পিছিয়ে থাকবে, নাকি মোটামুটি বাসযোগ্য হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে মহাপরিকল্পনা করা ও তার বাস্তবায়নের ওপর।