অতিমারীর প্রকোপ থেকে দুনিয়া সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মাত্রা ফের বাড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার আবহে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে—সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা; মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জুনের তথ্য অনুযায়ী পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময়ে বহু দেশেই মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিত হারের তুলনায় বেশি। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমনে সরকারের উদ্যোগের ঘাটতিও লক্ষণীয়। এটা সবারই জানা যে মূল্যস্ফীতির প্রথম আঘাতটাই আসে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দুরবস্থা প্রশমনে সামাজিক সুরক্ষার বিস্তার, আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম পথ। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে আমদানি-মজুদের ভারসাম্য রক্ষা করে বাজারে খাদ্যশস্যের লভ্যতা সমুন্নত রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তির সক্ষমতা বাড়াতে তত্পর হতে হবে। সাময়িকভাবে হলেও স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার এক কোটি মানুষকে কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়ে মূলত দরিদ্র মানুষের ওপর। দেশে মূল্যস্ফীতি হওয়া মানে ডলারের নিরিখে টাকার মূল্য কমা। মূল্যস্ফীতি চলতেই থাকলে উপার্জিত আয়ের মূল্য ডলারের অংকে ক্রমে কমতে থাকে। অর্থনীতিবিদরা একে প্রকৃত আয়ের হ্রাস হিসেবে দেখেন। মূল্যস্ফীতির ফলে গরিবের প্রকৃত আয়ই কমে। নির্দিষ্ট উপার্জনে আগে যতখানি খাবার কেনা যেত, জিনিসের দাম বাড়ায় কেনা যায় তার চেয়ে কম। সমাধানের পথ সহজ নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে পন্থা গোটা দুনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গ্রহণ করে, তার অন্তর্নিহিত নীতি এ রকম—ধরে নেয়া হয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক আছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে তাই উৎপাদনের মাত্রা কমিয়ে আনা হয়। কাজটি করা হয় প্রধানত সুদের হার বাড়িয়ে। সুদহার বাড়লে ঋণ আরো বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে শিল্প ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে, অন্যদিকে ঋণ করে পণ্য কেনার চাহিদাও কমে। দুইয়ে মিলিয়ে উৎপাদন কমে। এতে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। কেউ বলতেই পারেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর ওষুধ যদি তেতো হয়ই, তবু উপায়ান্তর না থাকলে সেই ওষুধ খেতে হবে বৈকি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে অর্থপ্রবাহ কমাতেই হবে, বাংলাদেশের মতো দেশে কথাটি ততখানি ধ্রুব সত্য নয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের সব দেশেই কম-বেশি পড়েছে, সে কথা কেউ এখন আর অস্বীকার করতে পারবে না। এমনকি ধনী ও সম্পদশালী দেশ হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরও এ প্রভাব থেকে বাদ যায়নি। যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতিতে যথেষ্ট প্রভাব পড়েছে। যে কারণে মূল্যস্ফীতি কমাতে তাদের মুদ্রানীতি আরো কঠোর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদ সংস্থা নিক্কেই এশিয়া। সুদের হারের পরিবর্তে সিঙ্গাপুরের মুদ্রানীতি বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় বাজারে ডলারের বিনিময় হার কমে আর বাড়ে। ভারতে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, জ্বালানির দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ভারতে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা থাকলেও দেশটির সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করে রেখেছে। দেশটির জন্য আশার কথা, ভারতে এখন ৬০ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রয়েছে। যার বদৌলতে এক বছরের জন্য বিদেশী পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে তাদের হয়তো চিন্তা করতে হবে না।

সরকার গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলন করেছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ দেখা যাচ্ছে বিবিএসের হিসাবে জুন মাসেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, বাজেটে মূল্যস্ফীতির প্রাক্কলনে বাস্তবতার চেয়ে ফারাক এত বেশি হলো কেন? বিষয়টিকে একই সঙ্গে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাব্য বিপদের দিক থেকেও বিবেচনা করা জরুরি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিবিএসের পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি যে বাড়ছে, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি যে বাড়ছে, সেটা দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ বা স্থির আয়ের মানুষ, তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রতিফলন। এছাড়া সাধারণ ভোক্তা বা নিম্ন আয়ের মানুষ যেসব পণ্য ভোগ করে সেই পণ্যগুলোর মূল্যস্ফীতি আসলে বিবিএসের তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি। অবশ্য এ মূল্যস্ফীতির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের অভিঘাত দেখা যাচ্ছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমলে নিলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি লাঘব করা সম্ভব হতে পারে। প্রথমত, খাদ্যদ্রব্যের দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহের দিকে নজর দিতে হবে। বলাবাহুল্য, দেশের মাটি অনেক উর্বর। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই করার জন্য দরকার কিছু সংস্কার। শুধু ভর্তুকির ব্যবস্থা করলেই হবে না, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।  সেচ, সার ও কীটনাশকের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন কৃষিকে শিল্পের প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করতে পারে। এর সুফল পেতে হলে দরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাত যেকোনো অর্থনীতির জন্যই অপরিহার্য। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিকারক একটি দেশ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, যেমন ১৯৭৪ সালের অয়েল শক এবং ২০১০ সালের জ্বালানি তেলের দামের অভাবনীয় উল্লম্ফন বিশ্বকে ভুগিয়েছিল। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবশ্যই জ্বালানি আমদানিকারক দেশকে বিপদে ফেলবে। ইউরোপীয় দেশগুলোও রাশিয়ার জ্বালানির বলয় থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে। তাই তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি ঝুঁকছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বার্তা। মনে রাখতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্বনির্ভরতা শুধু মূল্যস্ফীতি রোধেই নয়, বরং আগামীর উন্নয়নের প্রধান অংশীদার হবে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বৈদেশিক বিনিময় হার। ডলারের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বর্তমানে দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মূল্যস্ফীতি যখন হয়, দেশীয় মুদ্রার (টাকা) ক্রয়ক্ষমতা কমে। অন্যান্য বাজারের মতো টাকার বিপরীতে ডলারের দাম তখনই বাড়বে, যখন দেশীয় বাজারে এর চাহিদা বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশে ডলারের চাহিদা বাড়ার প্রধান কারণ বিশ্ববাজারে প্রধান পণ্যদ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। এটি কমিয়ে আনতে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বটে, তবে তদারকির অভাবে সেটি ততটা কার্যকর হচ্ছে না, বিষয়টি দুশ্চিন্তার।

অতিমারী থেকে উত্তরণের জন্য অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির দ্বারস্থ হয়েছিল, যা সে সময়ের জন্য ছিল একটি জুতসই পদক্ষেপ। টানা কয়েক বছর বাজারে অর্থের জোগান বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। তাই সরকার ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার চেষ্টা করছে। তবে এ নীতি বাজারে কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বিরাজমান মূল্যস্ফীতি বাজারে অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধির কারণে না যতটুকু, তার চেয়ে ঢের বেশি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিপর্যয়ের কারণে। প্রথমত, অতিমারীর প্রভাব এবং দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফল। আর মূল্যস্ফীতির প্রকোপটা জ্বালানি তেল ও খাদ্যসামগ্রীর মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমিয়ে কীভাবে দ্রব্যমূল্যকে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যায়, তার একটা দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত করলে চলবে না। সরকারের পক্ষেও অনেক কিছুই করা সম্ভব, পেট্রোপণ্যের ওপর শুল্ক কমানো, ন্যায্যমূল্যের দোকানের মাধ্যমে জনসাধারণকে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সরকার নির্ধারিত দামে দেয়া, সেচ ও মজুদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, মজুদদারি ও একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, এমন বহু কাজ মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। প্রত্যাশা থাকবে, সরকার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।