কোনো এক অলস অপরাহ্ন। ১৯৭৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন দুজন শিক্ষক। একজন নারী, আরেকজন পুরুষ। যেজন নারী তিনি পোশাকে-আশাকে ও ভাবগাম্ভীর্যে দৃশ্যমানভাবেই সম্মান, সমীহ করার মতো অবস্থানে। দেখতেও বেশ। ফর্সা, গোলগাল চেহারা। একটি শাড়ি পরনে তার। শাড়ির রঙচঙ বাহারি নয়। তবে অভিজাত। আর পুরুষজন দেখে মনে হয় তার সিনিয়র। কিন্তু তার অ্যাপ্রোচ জুনিয়রের মতো। অনেকটা ছাত্র যেমন থাকে অবনত শিক্ষকের কাছে। পরে দুজনেরই পরিচয় পেলাম। পুরুষজন যেহেতু সংশ্লিষ্ট নয়, তার নাম না হয় না-ই বললাম। ওই অভিজাত নারীর নাম ড. রওনক জাহান। আমি তারই স্বাক্ষরে সবে ভর্তি হয়েছি। তার কারণ তিনিই বিভাগীয় প্রধান। তবে বিভাগীয় প্রধানের পদবি পাল্টে গেছে তখন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী প্রথম বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন ড. রওনক জাহান। আগে কেবল ‘প্রফেসর’ পদবিধারীরাই হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হতেন। তার থাকত বিপুল ক্ষমতা। নতুন পদ্ধতিতে সহকারী অধ্যাপক পর্যন্ত সবাই পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান হতে পারবেন। ড. রওনক জাহান তখন সহযোগী অধ্যাপক। কিন্তু তিনি তার জ্ঞান-গরিমায় তখন অনেক অধ্যাপকের চেয়েও সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। পদবি পাল্টানোর ইতিবৃত্ত যা শুনেছি তা হলো ঔপনিবেশিক তথা ‘অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক’ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে এটিই ছিল সম্ভবত প্রথম উদার উপহার। নবাগত হিসেবে চারদিকে চোখ আমার। ঔত্সুক্য বটতলা, মধুর ক্যান্টিন ও হলকেন্দ্রিক। বিভাগীয় শিক্ষকের সবার নামধাম জানা হয়নি তখনো। কয়েকটি ক্লাস হয়েছে মাত্র। বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোনো কারণ ও সুযোগ ঘটেনি। ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা ইত্যাদি সেরে দেন প্রধান করণিক আনিস ভাই। আমাদের দৌড় ওই পর্যন্তই। বিভাগীয় পিয়ন নজরুল ভাই আমাদের প্রধান ভরসা। কাগজ জমা দিলেই অফিস স্বাক্ষর করিয়ে দেয়। দিনে দিনে সব শিক্ষক, বিশেষ করে ক্লাস নিচ্ছেন তাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটছে।

বিদ্যা-বুদ্ধির জগতে যতই এগোচ্ছি ততই আনন্দ ও শঙ্কায় ভুগছি। আনন্দ এই জন্য যে বড় বড় নামিদামি শিক্ষকদের নাম শুনছি। যাদের কাছে পড়তে পারব। আবার মনের শঙ্কা এই কারণে যে ওইসব বিদ্বজ্জন মহান শিক্ষকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব কিনা। যাদের নাম শুনছি তাদের শীর্ষে আছেন বিভাগীয় প্রধান ড. রওনক জাহান। তিনি সদ্য আমেরিকা ফেরত। তিনি পিএইচডি করেছেন পৃথিবী বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড থেকে ১৯৭০ সালে। তার পিএইচডির বিষয় ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির ব্যর্থতা। তার অভিসন্দর্ভটি ‘Pakistan: Failure in National Integration’ শিরোনামে ১৯৭২ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। ততদিনে তার অভিসন্দর্ভ বা গ্রন্থের Hypothesis কিংবা প্রস্তাব বাস্তবতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো হয়েছে। রওনক জাহানের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হওয়ায় তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে গোটা পৃথিবীর একাডেমিক জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সমসাময়িক বাস্তবতায় তিনি জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হন। গ্রন্থটি আমাদের পাঠ্য ছিল। আমি আমার গত ৪০ বছরের শিক্ষাজীবনে এ রকম সমৃদ্ধ গ্রন্থ খুব কমই দেখেছি। মজার কথা সম্ভবত তৃতীয় বর্ষে একটি সাময়িকী আমাকে বাংলাদেশের জাতি গঠন সমস্যা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে দেয়। আমি তার গ্রন্থটির ভূমিকা অংশ অনেকবার পড়ে তার ভিত্তিতে প্রবন্ধটি লিখি। বন্ধুরা শত প্রশংসা করে প্রবন্ধটির। আসলেই কৃতিত্ব তো আমার নয়। আমার মহান শিক্ষক ড. রওনক জাহানের। রওনক জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি একই বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আরেকটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে তিনি পিএইচডি সমাপন করেন। এ বছরই তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী পদে উন্নীত হন। ১৯৭৩-৭৫ পর্যন্ত তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে তিনি অসামান্য দক্ষতা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। আমি বিভাগীয় ছাত্র হিসেবে দেখতে পাই যে একের পর এক নামিদামি ব্যক্তিরা বিভাগে যোগদান করেন। এর মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান, প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ, প্রফেসর সরদার ফজলুল করিম, প্রফেসর সামশুল হুদা হারুন চৌধুরী ও এবিএম আবদুল লতিফ। আমি হিসাব-নিকাশ করে বলতে পারব না কখন কে যোগদান করেন। তবে অধিকাংশই ড. রওনক জাহানের কার্যকালেই সম্পাদন হয় বলে মনে হয়।

ড. রওনক জাহান পৃথিবীব্যাপী এতই খ্যাতি পেয়েছেন এবং এমন বড় বড় দায়িত্ব পালন করেছেন, যা অন্য কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিদ্বজ্জনমাত্রই সে বিষয়ে সম্ভবত অবগত। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সান্নিধ্য, ক্লাস এবং পরবর্তী যোগাযোগের কিছু কথা বলব। প্রফেসর রওনক জাহান প্রথম বর্ষে কোনো ক্লাস নেননি। দ্বিতীয় বর্ষেও না। তৃতীয় বর্ষে তিনি যে বিষয়টি পড়াতেন তার নাম ‘Comparative Politics’। বিষয়টি ছিল পাঠ্যসূচিতে নতুন সংযোজন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে এটি ছিল সে-বিষয়ক আলোচনা। বিশেষ করে ‘Approches to the study of politics’ আমাদের কাছে বেশ কঠিন মনে হতো। সেই কঠিন বিষয়টি তিনি যতটা সম্ভব সহজ-সরল ভাষায় আমাদের সামনে উপস্থাপন করতেন।

আমাদের ছাত্র অবস্থায়ই ড. রওনক জাহান বিদেশে চলে যান। পরবর্তীকালে তিনি বিশ্বজোড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ও পরামর্শক হিসেবে বিবিধ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি উইমেন ফর উইমেন নামে বাংলাদেশের নারী ও নারীবাদ-বিষয়ক প্রথম গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৩-১৯৮২ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নারী উন্নয়ন ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার পরামর্শ ও নির্দেশনা ছিল। ১৯৭৭ সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন নরওয়ের ক্রিস মিশেলসেন ইনস্টিটিউট, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি অন সাউথ এশিয়া ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এশিয়ান ডেভেলপমেন্টে। ১৯৮২-৮৪ সালে তিনি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (এপিডিসি) ‘ইন্ট্রেপ্রেশন অব উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচির সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৫-৮৯ সাল পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার গ্রামীণ নারী, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক ও নির্বাহী সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’, ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব এশিয়া সোসাইটি’ ও ‘আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা বা আইএলও’। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউদার্ন এশিয়ান ইনস্টিটিউটে সিনিয়র রিসার্চ স্কলার এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন ২০১০ সাল পর্যন্ত।

এর মধ্যে একেবারেই যে তিনি দেশে আসেননি বা দেশে কাজে আসেননি এ রকম নয়। ১৯৮৮ সালে আমি যখন পিএইচডি করার জন্য ভারতের জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদান করি তখন তার থেকে একটি প্রশংসাপত্র নিই। এর আগে শিক্ষা সমাপনীর পরও তার থেকে প্রশংসাপত্র নিই। প্রশংসাপত্র দুটো ছিল অতিসাধারণ। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে, অধ্যয়নে ও সম্পর্ক নির্ণয়ে আবেগ ও আধিক্য বর্জন করতেন। ২০০৪ সালে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিনিয়র ফুল ব্রাইট স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করি এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে প্লেসমেন্ট চাই তখনো তিনি পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়ে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেন। শিক্ষক হিসেবে আমি তার সান্নিধ্য চেয়েছি। বাসায় গিয়েছি কয়েকবার। তবে আমি তার একান্ত স্নেহভাজন, এ কথা বলার সাধ্য অর্জন করিনি। সবসময়ই মাতৃসুলভ মমত্ব দেখেছি। তার মাঝেও সম্মানজনক ও পরিচ্ছন্ন দূরত্ব বজায় ছিল। অনেক শিক্ষকই রাজনৈতিক ও নানা ব্যক্তিগত বিষয় দ্বারা তাড়িত হন। আমি তাকে দেখেছি নির্লিপ্ত একাডেমিক অ্যাপ্রোচে কাজ করতে।

প্রফেসর রওনক জাহান বাংলাদেশের গৌরব। তৃমাত্রিক গুণে তিনি গুণান্বিত। প্রথমত, তিনি সম্ভবত দেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অবদান রাখা শিক্ষকদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয়ত, তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় যেমন SIDA, WHO, UNDP, NORAD, Rockefeller Foundation-এর মতো সংগঠনে নির্বাহী ও পরামর্শকের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশী। তৃতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ। তার এ বর্ণাঢ্য অবদান দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও উন্নয়নকে আলোকিত করবে বলে আশা করা যায়। তিনি এখনো দ্বিধাহীন চিত্তে জাতির সেবায় নিয়োজিত। আমরা তার আরো দীর্ঘ, স্বচ্ছ ও সুন্দর জীবন কামনা করি। ‘যুগ যুগ জিও তুমি রওনক জাহান।’

 

ড. আবদুল লতিফ মাসুম: প্রফেসর (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়