বিশ্বের
অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প হচ্ছে পর্যটন, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ শিল্প শুধু উন্নত দেশই নয়, বরং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য পর্যটন শিল্পের ভূমিকা অতুলনীয়। কভিড-১৯ মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরগুলোর মধ্যে পর্যটন অন্যতম। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব; যা একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়তা করবে বিধায় পর্যটন শিল্পকে আগের মতো পুনরায় উজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি।
সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বিনোদন বা শখের নেশায় মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করলেও বর্তমান কালে পর্যটন সারা বিশ্বে একটি অনন্য শিল্পে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে, যেসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম পথ হচ্ছে পর্যটন শিল্প। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভর করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র পথ হচ্ছে পর্যটন। পর্যটন শিল্প বিকাশের মাধ্যমে থাইল্যান্ড আজ অনেক উন্নত। পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। সপ্তম শতাব্দীতে প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বাংলাদেশে ভ্রমণে এসে আনন্দে উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘A
sleeping beauty emerging from mists and water’, অর্থাৎ কুয়াশা এবং পানি থেকে উন্মোচিত ঘুমন্ত সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের চারদিকে সবুজের মেলা পরিলক্ষিত হয়। শহর থেকে শুরু করে গ্রাম-গ্রামান্তর অরণী সর্বত্রই যেন পর্যটক আকর্ষণের স্থান।
১৯৮০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপন করা হয়। গত বছর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—গ্রামীণ উন্নয়নে পর্যটন। পর্যটন শিল্পের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে ইউএনডব্লিউটিও বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২১-কে একটি বিশেষ দিন হিসেবে মনোনীত করেছে, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন’ (Tourism for
Inclusive Growth), যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটনের সক্ষমতাকে তুলে ধরা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারণা, যেখানে সমাজের সবাই তার নিজ নিজ জায়গা থেকে উন্নয়নের ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় ও সামগ্রিক পর্যায়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন অন্য দেশের চেয়ে বেশি কিন্তু এক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের অবস্থার উন্নয়ন ঘটছে না, তাই এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেনি। সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি সমাজকে টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সমাজে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করে এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি করে। আরো স্পষ্টভাবে বলা যায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বলতে এমন বিষয়কে বোঝায়, যেখানে একটি দেশের প্রবৃদ্ধির সুফল সব বিভাগের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয় অথবা ন্যায্য ও ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন করা হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং পর্যটনের একটি উপস্থাপনায় ‘শ্রমজীবী মানুষের জন্য পর্যটন ধারণাটির বিকাশের রূপরেখা দেয়া হয়েছিল, যার উত্পত্তি ফ্রান্সে। এছাড়া ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন গ্রিস, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। কিছু দেশে বিদ্যমান ভোক্তা সমবায় ভ্রমণ সংস্থার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, এমনকি সমবায় থেকে উত্পত্তি জাপান ও কোরিয়ায় তাদের সদস্যদের জন্য সেবা প্রদানের জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতে সমবায় পর্যটন রয়েছে। এ ধরনের সমবায় জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে সমবায় পর্যটনকে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। ফলে একদিকে স্থানীয় লোকদের জন্য কর্মসংস্থান ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্যদিকে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। কিছু পর্যটন সমবায়ের সাফল্যের কাহিনী ইঙ্গিত দেয় যে ইউরোপীয় দৃশ্যপট বাংলাদেশে ছোট আকারে প্রতিলিপি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সফল মত্স্য সমবায়, যা মাছ উৎপাদনের জন্য বর্জ্য, জল ব্যবহার করেছে। সোসাইটি এখন একটি প্রকৃতি পার্ক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যা শহরের পর্যটক হট স্পট হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। পার্কটিতে আকর্ষণীয় নৌকা বাইচ সুবিধা রয়েছে এবং একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা হয়েছে, যা অসংখ্য পাখিকে আকর্ষণ করে। বিভিন্ন এলাকায় একদল মানুষ পর্যটন খাতে কাজ করার জন্য সমবায়ের মতো সমবায় পর্যটন গঠন করেছে। সমবায় পর্যটন প্রাথমিকভাবে কিছু সদস্য নিয়ে গঠিত হয়, যা গ্রামবাসীদের সংগঠিত করে একটি নতুন ব্যবসায়িক মডেল স্থাপন করা সম্ভব।
কভিড-১৯-পরবর্তী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা চাঙ্গা করতে ক্ষুদ্রঋণের চেয়েও অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সমবায় পর্যটন। সমবায়ভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হবে। পর্যটকরা এখন গ্রামমুখী। গ্রামের নান্দনিক সৌন্দর্য দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। উল্লেখ্য, গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা, চাষাবাদ, লোকসংগীত, গ্রামীণ জীবনধারা, সুজলা-সুফলা
শস্য-শ্যামলা গ্রামবাংলার, জীববৈচিত্র্য ও সবুজের সমারোহ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনের জন্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন, সমবায় পর্যটন উন্নয়ন ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পরের বছরগুলোয় এমনটিই ঘটেছিল, যেখানে অবহেলিত জনগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছিল যে সংকটের আগে এবং বিশেষ করে সংকটের পরে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা সুরক্ষিত ছিল। এসব দিকে বিবেচনা করে দেখা যায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের হাতিয়ার। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন শিল্প অনেক বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করেছে, যা একটি দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সহযোগিতা করেছে। পর্যটন এমন একটি শিল্প, যাকে যথাযথ সম্প্রসারণ এবং বহুল প্রচারের মাধ্যমে টেকসই শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, কর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটায়। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই পর্যটন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণের মধ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। তাছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণে গ্রামীণ পর্যটন, দায়িত্বশীল পর্যটন, টেকসই পর্যটন, কৃষি পর্যটন, কমিউনিটি বেজড পর্যটন, দরিদ্রবান্ধব পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উন্নয়ন, শিল্প উন্নয়ন, সামাজিক খাত উন্নয়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, পরিবেশ রক্ষা এবং আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা সম্ভব। তাছাড়া নানা পর্যটন কার্যক্রম যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
ড. সন্তোষ কুমার দেব: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










