চলমান গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ঠিক রাখতে ভোলার কূপ থেকে গ্যাস সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) আকারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই সিএনজি করে গ্যাস আনা শুরু হবে বলে জানা যাচ্ছে। ভোলার গ্যাস পাওয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে শিল্প-কারখানাকে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দেশে প্রথমবারের মতো কোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরাসরি সিএনজি করে গ্যাস নিয়ে যাওয়া। ভোলায় গ্যাসের মজুদ রয়েছে দেড় থেকে দুই টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট) গ্যাস। বর্তমানে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট; কিন্তু সেখানকার শিল্প ও আবাসিক মিলিয়ে গড়ে দৈনিক ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। বাকি গ্যাস সেখানে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে গ্যাস আনা কঠিন ও ব্যয়বহুল। তবে সিএনজি আকারে এ গ্যাস এনে শিল্পে দেয়া গেলে তা শিল্প খাতে বড় ভূমিকা রাখবে বৈকি। এক্ষেত্রে কিছু কারিগরি জটিলতা রয়েছে। দ্রুতই তা কাটিয়ে গ্যাস পরিবহনপূর্বক শিল্পে তা সরবরাহ করা প্রয়োজন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভোলার গ্যাস এলএনজির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত এবং তা শিল্পে সরবরাহে পেট্রোবাংলা আরো সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।
দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন। গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ডলার সংকটে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানিও করতে পারছে না সরকার। ফলে শিল্পের গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস এনে সরবরাহের উদ্যোগ গ্যাস সংকটের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং। এতে তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন আরো কমে গিয়েছে। রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, শিপমেন্ট স্থগিত হওয়ায় গত মাসে কমেছে রফতানি আয়। আগামী মাসেও রফতানি আয় কমবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন উদ্যোক্তারা। এতে ছোট ও মাঝারি ধরনের কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি সংশ্লিষ্টদের। করোনা অতিমারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ডিজেল ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ও। এতে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। রফতানি আয় বাড়াতে শিল্প-কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে স্থানীয় উৎসই একমাত্র ভরসার জায়গা। ভোলার গ্যাসক্ষেত্র সম্ভাবনাময়। দ্বীপ জেলা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস এনে তা সরবরাহ ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে এলএনজি রূপান্তরের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তা শিল্পে সরবরাহ করা গেলে অর্থনীতি গতিশীল হবে বৈকি। তবে দ্রুতই পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রত্যাশা থাকবে, পেট্রোবাংলা দ্রুতই উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ দেবে। ঢাকা থেকে ভোলার দূরত্ব ১৯০ কিলোমিটার। সেখান থেকে শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ড আরো অন্তত ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে। দ্বীপ জেলা ভোলায় ১৯৯৫ সালে গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হয়। তবে সেখানে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ছোটখাটো দু-একটি কারখানা ছাড়া গ্যাস ব্যবহারের তেমন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। এতে একদিকে ভোলায় প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের মূল ভূখণ্ডে অনেক শিল্প-কারখানা গ্যাসের সংকটের মধ্যে আছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ সময়েও পেট্রোবাংলা ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার তেমন কোনো চেষ্টা করেনি।
পোশাক ও বস্ত্র খাতের চেয়েও গ্যাস সংকটে বেশি ভুগছে সিরামিক কারখানা। সম্প্রতি সিরামিক কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টাকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি সিরামিক শিল্প গ্যাসনির্ভর হলেও ইস্পাত শিল্পে সবচেয়ে বেশি দরকার হয় বিদ্যুৎ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এ খাতটিরও উৎপাদন এখন ব্যাহত হচ্ছে। যেসব ইস্পাত কারখানা গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তারা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপাকে। গ্যাসের সংকট ইদানীং আরো তীব্র হয়েছে। এতে তারা উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশের নিচে উৎপাদন করছে। এদিকে গ্যাস সংকটের সমাধান চেয়ে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, এত দিন সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে গাজীপুর, শ্রীপুর ও ভালুকা শিল্পাঞ্চলে কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ মোটামুটি ভালো ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সংকট তীব্র হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পর্যায়ক্রমে বস্ত্রকলগুলো রুগ্ণ হয়ে পড়বে।
সন্দেহ নেই ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস এনে শিল্পে সরবরাহ করা বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয়। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর এখন একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। কমিটি একেবারেই প্রাথমিক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে এবং কিছু সুপারিশও করছে। তার মধ্যে পলিসি নির্ধারণ ও বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে। মার্কেটিং পলিসি নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। যারা সিএনজি আকারে গ্যাস আনতে চায়, তারা কোন কোন শর্তে বা কী প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসবে, এসব বিষয়ও ভাবা হচ্ছে। ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস আনতে হলে কী ধরনের পরিবহন বা সিএনজি ট্রেইলার ব্যবহার করা যায়, কী প্রক্রিয়ায় আনা যাবে, কী কনটেইনার ব্যবহার করা হবে, সেটি নিরাপদ কিনা এমনকি প্রতি কিউবিক মিটার গ্যাস ভোলা থেকে এনে শিল্পে সরবরাহ পর্যন্ত খরচ কত পড়বে—সব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ভোলা থেকে গ্যাস আনতে হলে বিশাল নৌপথ ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে। সেখান থেকে এ গ্যাস বড় কনটেইনারবাহী ট্রাকে করে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাবে। ফলে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি থাকলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে আশার কথা হলো, দেশীয় কয়েকটি কোম্পানি এ কাজটি করার আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্যয় বিশ্লেষণপূর্বক পেট্রোবাংলা স্বল্পমেয়াদের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাতের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো তাদের উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। বাংলাদেশের প্রায় সব বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র যথেষ্ট পুরনো হয়ে পড়ায় সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। সাধারণভাবে একটি গ্যাস ক্ষেত্রের স্বাভাবিক জীবনে প্রাথমিক অবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে একপর্যায়ে উৎপাদন চূড়ায় পৌঁছে এবং তার পর থেকে উৎপাদন কমে একসময় জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে ‘ওয়াটার আউট’ হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যেমন ২০১৬ সালে দেশের বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র তিতাসের দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা সর্বোচ্চ অবস্থায় ছিল দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট, বর্তমানে তা ৪১ কোটি ঘনফুট। একইভাবে উৎপাদন কমছে হবিগঞ্জ, কৈলাসটিলা, বাখরাবাদ ও রশিদপুরে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে, যা দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের ৫১ শতাংশ। তবে এটি আর কতদিন সার্ভিস দিতে পারবে সেটি বড় প্রশ্ন। তাই সর্বশক্তি দিয়ে গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে নতুন নতুন কূপ খনন দরকার। কারণ ভূতাত্ত্বিক বিবেচনায় ব-দ্বীপ গঠিত এ দেশটির গ্যাস সম্ভাবনাকে অতি উজ্জ্বল বলে বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন। যার প্রমাণ মেলে ২০১২ সালে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার তার সমুদ্র এলাকায় জোরালো অনুসন্ধানের মাধ্যমে বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমায় সে তুলনায় অনুসন্ধান করেনি বললেই চলে। সে কারণেই দেশে এ গ্যাস সংকট। বিশ্বব্যাপী গ্যাস-তেল অনুসন্ধান কার্যকলাপের বিবেচনায় বাংলাদেশ ন্যূনতম অনুসন্ধানকৃত এলাকা হিসেবে বিবেচিত। তাই বাংলাদেশকে অবিলম্বে গ্যাস অনুসন্ধানে দেশব্যাপী জোরালো কার্যক্রম গ্রহণ করে নিজস্ব গ্যাস তুলতে হবে।










