সড়ক দুর্ঘটনা দেশে এক গুরুতর জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। চলমান করোনা মহামারীর মধ্যে এ যেন আরেক অতিমারী। শনিবারও চার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। গত জানুয়ারি মাসেই ৪২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৪ জন নিহত হওয়ার খবর মিলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে মৃত্যুহার বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও লক্ষণীভাবে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক মৃত্যুহার উচ্চ আয়ের দেশগুলোর দ্বিগুণ এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ নৈপুণ্য দেখানো অর্থনীতিগুলোর চেয়ে পাঁচ গুণের অধিক। আঞ্চলিক গড় বিবেচনায়ও দেশে সড়কে মৃত্যুহার বেশি। এসব তথ্য দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তার নাজুক চিত্রই তুলে ধরে।
গত দুই দশকে বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে সড়ক অবকাঠামো আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। পুরনো মহাসড়কগুলো সংস্কার-সম্প্রসারণের পাশাপাশি জেলা-উপজেলায় নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন সড়ক। এতে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তায় হতাশাজনক নৈপুণ্যে এ সাফল্য ক্রমেই নিষ্প্রভ হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, দেশে সড়ক নিরাপত্তা দিন দিন অবনতিশীল। এ অবস্থায় সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। এক্ষেত্রে অদক্ষ ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, অপরিকল্পিত গতিরোধক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই প্রধানত দায়ী। অথচ দুর্ঘটনা-পরবর্তী আশু কিছু পদক্ষেপ ছাড়া চিহ্নিত কারণগুলো নিরসনে পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ তেমন উদ্যোগ নেই। সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত মানুষের মৃত্যু ঘটবে, কারো কিছু করার নেই—সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর তত্পরতায় অনেক ক্ষেত্রে এমনটিই প্রতীয়মান। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্যের অবসান জরুরি।
নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনপূর্বক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ গত দশককে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্যদেশগুলো একমতও হয়েছিল। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা গেলেও দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখনো সড়ক দুর্ঘটনা ঊর্ধ্বমুখী। শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দুর্ঘটনা রোধ করা প্রয়োজন। গবেষণায় উঠে এসেছে, কর্মক্ষম মানুষই বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতির শিকার। সেদিক থেকে কর্মক্ষম একজন মানুষের মৃত্যু একই সঙ্গে কোনো কোনো পরিবারের জন্য আয় হারানো এবং জাতীয় আয়ে নেতিবাচক প্রভাবের কারণও বটে। এক হিসাব বলছে, ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনা হ্রাসের টার্গেট পরিপূরণ ৭ থেকে ২২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। এটি সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে আমলে নেয়া চাই।
দেশে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার প্রতিষ্ঠান অনেক। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থা এক্ষেত্রে নিয়োজিত। অথচ পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার কারণে এক্ষেত্রে সুফল মিলছে না। এ ধরনের সমন্বয়হীনতা দ্রুত দূর করা দরকার। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইনটির বেশির ভাগ ধারার প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি। বলতে গেলে আইন প্রয়োগের শিথিলতা, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা, চালক-মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে দিন দিন অনিরাপদ করে তুলছে বৈকি। এর সুষ্ঠু বিহিত এখন সময়ের দাবি। সত্য যে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। দেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এসব সুপারিশ ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময় এসেছে। শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নয়, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেবে দেখা উচিত। নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য সুপরিকল্পিত নকশা এবং এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে কাজ করাটা জরুরি। মহাসড়কগুলোয় ফিডার রোড দিয়ে কম গতির গাড়ি, মোটরবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা দরকার, যাতে দুর্ঘটনা হ্রাস পায়। আর মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার, মানুষজন রাস্তা পারাপার হয়—এমন স্থানগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোয় আজকাল আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সনাতনী কায়দায় চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। বাইরের অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নিয়ে দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবনী সমাধানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক-মহাসড়কে বাড়াতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি। অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো হলেও দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিনিয়োগ এখনো অনুল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংক এক্ষেত্রে নৈপুণ্য বাড়াতে বিনিয়োগের ওপর জোরারোপ করেছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) অর্থায়ন নিশ্চিত করা যেতে পারে। সর্বোপরি বাড়াতে হবে জনগণের সচেতনতা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পিত উদ্যোগে দেশে টেকসই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে প্রত্যাশা।










