গণমাধ্যমে একটা খবর খুব ছোট করে ছাপা হয়েছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর যারা ভাইরাল করেন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। আর তাই খবরটি নিয়ে বলার মতো আলোচনা হয়নি এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরটা খুব দ্রুতই নতুন খবরের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে। খবরটি ছিল ভিসাসংক্রান্ত। ইতালিতে ১১-২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জুনিয়র দাবায় অংশ নিতে ইচ্ছুক সাত কিশোর-কিশোরী দাবাড়ুকে ভিসা দেয়নি ইতালি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সদস্য ও বিশ্ব জুনিয়র দাবা দলের টিম লিডার ঢাকার ইতালি দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেছেন। তাতেও তারা রাজি হয়নি। যদিও পরবর্তী সময়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশস্থ ইতালি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ভিসা দিতে ইচ্ছুক হন কিন্তু ততদিনে টুর্নামেন্ট শুরু হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশী টিম আর ইতালি যেতে রাজি হয়নি। ইতালি শুরুতেই কেন ভিসা দেয়নি সে কারণ হিসেবে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন জানিয়েছে, ইতালি দূতাবাস দাবাড়ুদের দেশে ফিরে না আসার আশঙ্কায় ভিসা দেয়নি।

এ জায়গাটিই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রশ্ন হলো, ইতালি দূতাবাসের এ আশঙ্কা তৈরি হওয়ার জন্য আমাদের দিক থেকে কী কোনো দায় আছে কি না? স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ অন্তত একটা দশক বিশ্বের যে বিমান বন্দরে গিয়েছে মর্যাদা পেয়েছে। এমন অনেক অভিজ্ঞতার কথা শোনা যায় যে ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা ও জাপানের মতো অনেক দেশের ইমিগ্রেশন অফিসাররা বাংলাদেশীদের এয়ারপোর্টে বিশেষ খাতির করেছে। কেউ কেউ কলিগদের ডেকে বলেছেন, দেখো বাংলাদেশের মানুষ। কোথাও কোথাও এমনও হয়েছে বাংলাদেশ নামটা হয়তো ওই ইমিগ্রেশন অফিসার শোনেননি। তারপর যখন তাকে দেশটা চিনিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনি তখন শ্রদ্ধা ও সম্মান নিয়ে আগন্তুককে দেখেছেন। এতটা মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে যে দেশের মানুষের পথ চলা শুরু সেই দেশের মানুষকে এখন ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশ ভিসা দিতে গড়িমসি করে। ভাবা যায়! কী এমন ঘটল এরশাদের শাসনামলের মধ্য পর্যায় থেকে যে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টের মান মর্যাদা কমতে থাকল। বিদেশী বেড়াতে, ওয়ার্কশপ, সেমিনারে কিংবা ব্যবসায়িক কাজে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীদের আটকে দিতে লাগল। এজন্য কে দায়ী? সরকার? রাষ্ট্র? না জনগণ?

আপনি হয়তো বলবেন, আমার তো কোনো দেশে যেতে সমস্যা হচ্ছে না। আমি তো ভিসা চাইলেই পাই। যারা ভিসা পায় না তারা খুঁজে দেখুক। আরেকজন হয়তো বলবেন, ভিসা পাওয়ার হাজারটা তরিকা আছে। এত ঝামেলা করার দরকার কি। কোনো একটা তরিকা বেছে নিলেই হলো! কিন্তু এর বাইরে বড়সংখ্যক একদল মানুষ আছে যারা ভিসা নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরও ইমিগ্রেশনে তাদের ////////////সবুজ পাসপোর্ট দেয়ার পর কুণ্ঠিত থাকেন। কেউ কেউ ফেরত পাঠানোর ভয়েও থাকেন। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে দি নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত কমনওয়েলথ রাইটার্স পুরস্কারজয়ী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও বিবাহসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক এবং লেখিকা তাহমিনা আনামের একটি লেখা পড়েছিলাম। যেখানে তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন: আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় আমার কাছে একটি ঝামেলাপূর্ণ পাসপোর্ট ছিল। এর একটি কারণ ছিল এটি সবুজ রঙের। যদিও এর কাভারে লেখা ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার সবুজ পাসপোর্ট আমাকে বিমানবন্দরে নার্ভাস করে রাখত; প্রতিবার ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে দেয়ার পর আমি তার তীক্ষ দৃষ্টি, আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা, আমি কতদিন থাকব, আমার কাছে অর্থকড়ি কেমন আছে—এ ধরনের প্রশ্নগুলোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতাম। আমার জন্য লাইনের পেছনের যারা তারা অধৈর্য হতো। আমি যখনই বিদেশে কোথাও বেড়াতে যেতাম আমার সঙ্গে একটা ফাইল থাকত। সেখানে আমার স্টুডেন্ট আইডি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, এমনকি কলেজের সার্টিফিকেট পর্যন্ত সঙ্গে রাখতাম। আর চাইলেই টিকিট কেটে আমি কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মনে আছে একবার ঢাকায় বার্সেলোনায় পারিবারিক ভ্রমণের জন্য ভিসা পেতে আমাকে সারারাত সাউথ আফ্রিকান, জর্ডানিয়ান, পাকিস্তানি ও ইন্দোনেশিয়ানদের সঙ্গে থাকতে হয়েছিল। আমরা একসঙ্গে সূর্যোদয় দেখেছিলাম।

তাহমিনা আনামের জন্ম ১৯৭৫ সালে। তাই তিনি সত্তরের দশকে ও আশির দশকের শুরুতেও বাংলাদেশী নাগরিক এবং পাসপোর্টের যে কদর ও সোনালি দিন সেটা তিনি দেখতে পাননি। তিনি যখন একা একা ভ্রমণ শুরু করেছেন বাংলাদেশী সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ততদিনে এ পাসপোর্ট ও বাংলাদেশ তার গুরুত্ব অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া দেশের যে ইমেজ ও সেই দেশের জনগণের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সেটা তখন বিশ্ব থেকে চলে গেছে। প্রশ্ন হলো, কেন চলে গেল? আমরা কি করেছি যা আমাদের প্রতি ভিনদেশীদের এমন অসন্তুষ্ট করেছে কিংবা আমরা তাদের শ্রদ্ধা হারিয়েছি। আমাদের দেশ ও দেশের পরিচয় পাসপোর্টের মান মর্যাদা আমরা কেন ধরে রাখতে পারলাম না? আমাদের বোধহয় সে কারণগুলো খুঁজে দেখা জরুরি। এ লেখার আগে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে কিছু কারণ জানতে পেরেছি।

প্রায় দুই দশক আগে ফ্রান্সে যাওয়ার প্রাক্কালে বাবামায়ের নাম বদলে দিয়ে এক লোক তার বোনের দুই বাচ্চাকে নিজেদের বাচ্চা হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল। আরো আগে আশির শেষ ও নব্বইয়ের দশকে জাপানে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বাংলাদেশী টাকায় ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে জাপানে স্ত্রীকে নেয়ার অনুমতি নেই কিংবা লুকিয়ে বসবাস করছেন—এমন ব্যক্তিদের স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে নিয়ে ‘অরিজিনাল’ স্বামীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। অতিসম্প্রতি ক্যাসিনো কেসের পর বেশ কয়েকজন ভুয়া কাগজপত্র ও খবর ছাপিয়ে জীবনের হুমকি দেখিয়ে কানাডা চলে গিয়েছেন। আবার সে সত্তরের দশক থেকেই বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গেই সত্য ও মিথ্যার মিশেলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বাংলাদেশীদের ইউরোপ ও কানাডায় আশ্রয় নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ধর্মকে ব্যবহার করেও কেউ কেউ বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন সুদূর অতীতে ও গত এক দশকে।

এ ধরনের ঘটনা শুনতে শুনতে যে কারো মনে প্রশ্ন আসবে এভাবে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে যারাই যেতে চেয়েছেন তারা সবাই কী যেতে পেরেছেন? উত্তর হলো পারেননি। আবার কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত দেশে যাওয়ার পর সেখানকার ইমিগ্রেশনের তদন্তে মিথ্যা বের হয়ে এসেছে। ঘটনাগুলো এখানেই শেষে হয়ে যায় না। এর রেশ থেকে যায়। আবার এমনও প্রচুর ঘটনা আছে, সরকারিভাবে সাংস্কৃতিক দলের সদস্য কিংবা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে বাংলাদেশী শিল্পী ও খেলোয়াড়রা আর ফিরে আসেনি কিংবা বিদেশে গিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন এমন ঘটনাও রয়েছে অনেক।

সব মিলিয়ে গত ৪০-৪৫ বছরে কয়েক লাখ বাংলাদেশী অবৈধপথে কিংবা ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে কিংবা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এশিয়ার উন্নত দেশসহ কানাডা, ইউরোপ ও আমেরিকায় গিয়েছেন। আজকে তাদের কারণে জেনুইন যারা তারাও ভিসা পেতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়ছেন।

অনেকেই বলেন পাসপোর্টের এই ইমেজ সংকট নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বেশির ভাগ বাংলাদেশীদের এবং সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু তারাও এমনটা হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে পারেন না। তবে যে যার মতো করে অনেক কারণের কথাই বলেন। আর সেগুলো কমবেশি যুক্তিপূর্ণও বটে। যেমন: কেউ কেউ বলেন যে বাংলাদেশী সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক পাসপোর্ট ও সুবিধা থাকায় তারা সাধারণ পাসপোর্টধারীদের মতো সমস্যাগুলোতে পরেন না। এমনকি তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের সাধারণ পাসপোর্টেও তদবির ও অন্যান্য পদ্ধতিতে সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।  ফলে একজন সরকারি কর্মকর্তা যতদিন পদে থাকেন ততদিন পর্যন্ত তারা সাধারণ জনগণের পাসপোর্ট সমস্যা নিয়ে ভাবেন না। এ একই কর্মকর্তা যখন অবসরে যান তখন তারা সাধারণ পাসপোর্টধারীদের মতোই সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু নিজেরা এমনকি বিদেশে দূতাবাসে ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট ও সুবিধা নিয়ে কাজ করার সময় কিংবা সচিবালয়ে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সময় বাংলাদেশী পাসপোর্টের ইমেজ বৃদ্ধি এবং বিদেশে বাংলাদেশীদের ভাবমূর্তি তৈরিতে সেই অর্থে কোনো পদক্ষেপ নেন না।

কেউ কেউ দাবি করেন বাংলাদেশে সবসময়ই সরকার আর জনগণ দুটি পক্ষ হিসেবে কাজ করেছে। জনগণ ও দেশের জন্য সরকার যেমন ভাবে না, তেমনি দেশ ও অন্যদের ভালোমন্দ নিয়ে জনগণ পর্যন্ত ভাবে না। সরকারি লোকজন আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ ভাব নিয়ে যেন চলছে। তার ওপর যে যেখান থেকে পারে করে নিক এমন একটা ভাবও সবার মধ্যে কাজ করে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। শুধু যখন নিজে ঠেকে যায় তখন অন্যদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে। তাতে কোনো পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ হয় না। যার ফল হলো দেশের স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী পর্যন্ত দাবা খেলতে বিদেশে যেতে পারে না। মন্দ মানুষদের জন্য ভালো মানুষরা বিপদে পড়ে। যথেষ্ট দেরি হলেও আমাদেরকে এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং পৃথিবীর যেকোনো অংশে কোন কিছু করার আগে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণটা মাথায় রাখতে হবে। উন্নত দেশগুলোর জনগণ সেটাই করে।