স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বিকাশ ও সম্প্রসারণ ঘটেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার। দেশজুড়ে অসংখ্য সড়ক-মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি এবং সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সড়ক-মহাসড়ক নিত্য দুর্ভোগের কারণে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সড়ক এবং মহাসড়কের গুণগত মানসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আটটি মহাসড়কের সঙ্গিন অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে, যা সওজের অধীনে থাকা এইচডিএমের জরিপকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে মহাসড়কের মান ধরে রাখা বা সঠিক সময়ে মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। এতে মহাসড়কের মানেরও অবনতি ঘটছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। অন্যান্য খাতের মতো যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের উন্নয়নেও কাজ হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো মানসম্পন্ন না হওয়ায় বাণিজ্য ও অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে, কিন্তু সেগুলো থেকে প্রাপ্ত উপযোগ যৌক্তিক পর্যায়ে উপনীতি হতে পারছে না। এর পেছনে রয়েছে সড়কের মানসংক্রান্ত পরিপূর্ণ প্রতিবেদনের অভাব। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে বাণিজ্য ও মানুষ চলাচল কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। সন্দেহ নেই, দেশ উন্নত হলে বৈদেশিক বাণিজ্য বা আমদানি-রফতানি এখনকার চেয়ে বাড়বে, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও পণ্য চলাচল বাড়বে। সেজন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী।
উন্নত ও টেকসই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনির্মাণে পরিকল্পনাগত ত্রুটি রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অতীতে বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়ক ছিল প্রধানত দুই লেনের। প্রয়োজনের বিশেষ তাগিদে কিছু সড়ক-মহাসড়ক ও তাদের অংশবিশেষ চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। অথচ দেশ যখন উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছবে তখন চার লেন কমই কাজে আসবে। প্রয়োজন হবে অন্তত আট লেনের। চাইলেই সব সড়ক-মহাসড়ক বহু লেনে উন্নীত করা সম্ভব নয়। এজন্য সময় ও অর্থ দুই-ই প্রয়োজন। পরিকল্পনায় থাকলে ধীরে ধীরে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এদিকে সরকারি সড়ক-পরিকল্পকদের দৃষ্টি দেয়া দরকার। কীভাবে উন্নত ও টেকসই সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করা যায় সেটাও সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো সাধারণভাবে নিম্নমানের, ভঙ্গুর এবং স্বল্পায়ু। এর কারণ নিম্নমাণের সামগ্রী ব্যবহার। কি নির্মাণে, কি সংস্কারে—কোথাও উন্নত মানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার অল্প দিনের মধ্যেই এর বিভিন্ন অংশে ভেঙেচুরে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। যান চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। এটা একটা নজির এবং এ ধরনের নজির প্রায় সারা দেশেই দৃশ্যমান।
দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, নিম্নমানসম্পন্ন বা ভেজাল নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার এবং নিকৃষ্টতম বিটুমিনে ঢালাইয়ের ফলে সড়ক-মহাসড়কের এ ভগ্নদশা হয়েছে।
সওজের সংস্কার ও পুনর্বাসন চাহিদা জরিপটি প্রায়োগিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ জরিপের আলোকেই ঠিক করা হয় পরবর্তী বছর বা বছরগুলোয় সড়কে কী পরিমাণ সংস্কার ও পুনর্বাসনকাজ করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ এ জরিপ পরিচালনার জন্য সওজ অধিদপ্তরের আলাদা একটি বিভাগ রয়েছে। যদিও মাঠপর্যায়ে সার্কেল অফিসগুলোই মূলত এ জরিপ পরিচালনা করে এবং জরিপের তথ্যগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাইও করা হয় না। ফলে যে ধরনের তথ্য উঠে এলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরাপদ হবে, সে ধরনের তথ্যই কিন্তু জরিপগুলোয় উঠে আসছে। আমরা অতীতেও দেখেছি, এইচডিএমের জরিপের সঙ্গে বাস্তব হিসাবের মিল থাকে না। অর্থাৎ যতটা রাস্তা ভালো বা খারাপ রয়েছে বলা হয়, বাস্তবে তার চেয়ে খারাপ সড়কের পরিমাণই বেশি থাকতে দেখা যায়। এইচডিএমের জরিপের কাজ করা হয় নভেম্বর থেকে মার্চে। বর্ষার পরে সংস্কার করার পর মানের দিক দিয়ে সড়কের অবস্থা যখন তুলনামূলক ভালো থাকে, তখনই জরিপটি করা হয়। এটা যদি বর্ষার পর পরই অর্থাৎ জুন-জুলাইয়ের দিকে শুরু করা যেত, তাহলে সড়কের সঠিক অবস্থাটি তুলে ধরা যেত।
বিশ্বের মধ্যে সড়ক নির্মাণব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। অথচ এখানে সড়কের স্থায়িত্বকাল তুলনামূলক কম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সড়ক বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাংকের যোগাযোগ অবকাঠামো সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতে। তাহলে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে এত ব্যয় কেন এবং ব্যয়িত অর্থ যাচ্ছে কোথায়? কারোই অজানা নেই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা যোগসাজশ করে নির্ধারিত নির্মাণ ব্যয়ের বেশির ভাগ অর্থ লুটপাট করছে। এটা কেবল অনুমানের বিষয় নয়। বাস্তব প্রমাণও আছে অনেক। ঠিকাদারদের ব্যাপারে কথা আছে। সরকারি দলের লোকরাই সাধারণত ঠিকাদারি পেয়ে থাকে, তা তাদের অভিজ্ঞতা থাক বা না থাক। না থাকলে ঠিকাদারি হস্তান্তর হয়ে যায়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। কাজ ঠিকমতো হয় না। কম দামের নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহূত হয়। তত্ত্বাবধান বা তদারকির ব্যবস্থাও নেই। ফলে হচ্ছে যাচ্ছেতাই, চলছে হরিলুটের উৎসব। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, কাজের মান নিয়ে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দায় এড়াতে পারবে না। শুধু এ কথা বললেই হবে না, তাদের দায়বদ্ধ করতে হবে, জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ক’দিন আগেই টেকসই সড়ক নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গ্রামীণ সড়কও এমনভাবে টেকসই করতে বলেছেন, যাতে বড় বড় পণ্যবাহী যানবাহন ওইসব সড়ক দিয়ে চলাচল করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় কোন দেশের সক্ষমতা কেমন, তা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর গুণগত মানের ওপরও নির্ভরশীল। সেই ডব্লিউইএফের প্রতিবেদন বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মান খারাপ। বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক ও সেতু নির্মাণ ব্যয় সবচেয়ে বেশি। অথচ অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা সঙ্গিন। একটি সড়ক নির্মাণ করার পর কোনো রকম মেরামত ছাড়াই তা টানা ১৫ বছর ভালো থাকবে, এটা ধরে নিয়েই সড়কের নকশা ও নির্মাণকাজ করার রীতি। অথচ নির্মাণের পর এক বছর না পেরোতেই সড়ক-মহাসড়কের স্থানে স্থানে ভেঙে যায়, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। ফলে বছর না ঘুরতেই সেগুলো মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। মেরামতের কাজও ভালোভাবে করা হয় না। তাই সেগুলো টেকসই হয় না। মেরামতের কাজ লেগেই থাকে আর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামত নিয়ে বিপুল অংকের অর্থের অপচয় একটা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। মানসম্পন্ন সড়কের অভাবে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে উঠছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দেশে মেগা প্রজেক্ট হোক, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত হোক, তা সবারই প্রত্যাশা। তবে এসব প্রকল্প যথাযথ নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই করার বিষয়টি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও নির্মাণাধীন সড়ক-মহাসড়ক কতটা স্বস্তি দিচ্ছে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনপূর্বক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ গত দশককে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছিল। কিছু দেশ উন্নতি করলেও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এক্ষেত্রে যেসব অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে, সেগুলো যথাযথ ও মানসম্পন্নভাবে হচ্ছে কিনা, তা গুরুত্বসহকারে নিয়মিত তদারক করা দরকার। প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবনী উপায়ের সন্নিবেশ ঘটিয়ে সড়ক নিরাপত্তা ও স্বস্তি বাড়াতে হবে।
সড়কের মান ধরে রাখা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত জরিপ ও তদারকি জরুরি। এক্ষেত্রে ত্রুটি ও সমস্যা চিহ্নিত করতে দেরি হলে ক্রমে সেটি বড় আকার ধারণ করে। এতে পরবর্তী মেরামত কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয় ও ভোগান্তি বেড়ে ওঠে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় সড়কে সমস্যা দেখা মাত্রই সেটি চিহ্নিত করে তা মেরামতের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে তাদের সড়ক ও মহাসড়ক টেকসই হয় অনেক বছর। ত্রুটি চিহ্নিত করে তা জানানোর কাজটি সওজের এইচডিএম সার্কেলের। এক্ষেত্রে তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে না। জরিপের সময়কাল নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যে প্রশ্ন তুলেছেন তা আমলে নেয়া বাঞ্ছনীয়। ত্রুটি বা দুর্বলতা লুকিয়ে রাখার কোনো প্রবণতা থেকে জরিপটি করা হলে তা হবে মারাত্মক ভুল। প্রত্যাশা থাকবে, সড়ক-মহাসড়কের গুণগত মান ধরে রাখা এবং তা উন্নয়নসংক্রান্ত জরিপটির ত্রুটি দূর করে একে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সওজ উদ্যোগী হবে।










