বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে রোববার তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে দীর্ঘকাল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। মাত্র এক যুগ আগে ব্রাজিলে বাংলাদেশের একটি দূতাবাস স্থাপন করা হয় এবং আবাসিক রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশেও ব্রাজিলের দূতাবাস রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। একে আরো বাড়িয়ে তুলতে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। তখন বাণিজ্য নানা ধরনের শুল্ক বাধার সম্মুখীন হবে। সেক্ষেত্রে এফটিএ সুবিধা দিবে। তাই উভয় দেশ এক্ষেত্রে দ্রুতই অগ্রসর হবে বলে প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ ব্রাজিলে পাট, তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস, স্টিক পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, জুতা, শিশুদের খেলনা, ম্যাট্রেস, চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদি পণ্য রফতানি করে। প্রতিটি পণ্যেরই ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সেখানে। বাংলাদেশ উদ্যোগী হলে এসব খাতে সহজেই বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব বলে জানা যাচ্ছে। এজন্য চাই দুই দেশের সক্রিয়তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ পণ্য আমদানি করে, সেগুলোর মধ্যে পরিমাণের দিক থেকে ব্রাজিলের অবস্থান সপ্তম। বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে গম, চিনি, ভোজ্যতেল, মাংস এবং নানা ধরনের শুকনো ফল ও মসলা আমদানি হয়। ব্রাজিলের বাজারে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একে ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যের বাজার আরো বাড়ানো যায় কিনা সে প্রচেষ্টা আরো জোরালো করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে জনগণ থেকে জনগণ এবং ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। ব্রাজিলের বাজারে বাংলাদেশের একটি রফতানিপণ্য হলো ফার্মাসিউটিক্যালস। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার কারণে ফার্মা আইটেমগুলো এখন কিছু সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে। ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষ যেন এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সে প্রচেষ্টাও চালাতে হবে। আমরা আশা করব, শিগগিরই ব্রাজিল সরকার কর্তৃক এক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কানাডা। এর বাইরে শীর্ষ ১৫ অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল। এক যুগ আগেও ব্রাজিলে খুব কম পরিমাণ পণ্য রফতানি হতো। রফতানি বাড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) থেকে ব্রাজিলে গিয়ে দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে। তার পর থেকে ধীরে ধীরে রফতানি বেড়েছে। এখান থেকে প্রতীয়মান হয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলে বাণিজ্য আরো বাড়ানো সম্ভব। এখন ব্রাজিল তৈরি পোশাকের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় বাজার। একে কাজে লাগাতে তাই আরো সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সফর ও আলোচনায়ও সুফল মিলতে পারে।

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে—এ চার দেশ হচ্ছে লাতিন আমেরিকার ‘মারকোসার’ নামের বাণিজ্য জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত জোটটির সহযোগী সদস্য হচ্ছে বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, একুয়েডর, গায়ানা, পেরু ও সুরিনাম। বাংলাদেশ প্রায় ছয় বছর ধরে মারকোসার জোটের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ লক্ষ্যে তিন বছর আগে বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল দেশগুলো ঘুরে আসে। তবে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। মারকোসারভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অন্য সব দেশ বাণিজ্য বাড়িয়েছে। আরো বাণিজ্যের জন্য তারা এফটিএ করেছে। পিছিয়ে শুধু বাংলাদেশ। মারকোসারভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভারত, মিসর, ইসরায়েল, মেক্সিকো, মরক্কো ও দক্ষিণ আফ্রিকা কাস্টমস ইউনিয়নের (এসএসিইউ) সঙ্গে এফটিএ রয়েছে। ইইউ সদস্য দেশগুলোর সঙ্গেও এখন মারকোসারের এফটিএ চূড়ান্ত হওয়ার পথে। সিঙ্গাপুর, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও কানাডার সঙ্গে মারকোসারভুক্ত দেশগুলোর এফটিএর আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি চলছে। এছাড়া চীনও মারকোসারভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ব্যাপক হারে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে আরো তত্পর হতে হবে।

ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ, এক উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি এবং দেশটি লাখ লাখ নাগরিককে দারিদ্র্যমুক্ত করতে কয়েক বছরে বড় ধরনের পদক্ষেপ চালিয়েছে। যদিও দেশটিতে ধনী ও গরিবের এখনো বিশাল ফারাক রয়ে গেছে। লাতিন আমেরিকার কেন্দ্রে থাকা ব্রাজিল বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন প্রান্ত হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে শুল্কের বিষয়টি সহজ করতে কর্তৃপক্ষ আলোচনায় আছে। আলোচনায় গতি আনতে হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের কম। দ্রুততার সঙ্গে এটি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখাবে। সে সময়ে শুল্কছাড়সহ অনেক সুবিধা কমে আসবে। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর করা জরুরি। ব্রাজিলের সঙ্গে আলোচনা চলছে, কিন্তু গতি আশানুরূপ নয়। এতে বাণিজ্য সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। 

মিশ্র সংস্কৃতির দেশ ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র। জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। এর আগে ফুটবলের জাদুকর পেলের মাতৃভূমি ব্রাজিলে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বন্ধুপ্রতিম দেশ ব্রাজিলে বাংলাদেশ নতুন বাণিজ্য পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। বাংলাদেশ ও ব্রাজিল একসঙ্গে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে পারে। ব্রাজিলিয়ান কৌশল, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও প্রণালি বাংলাদেশে প্রয়োগ করার মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, ব্রাজিলের সহযোগিতা বাংলাদেশকে কৃষি খাতে নতুন জমি ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদন চার গুণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতা কাটাতে এবং এমনকি কৃষিপণ্য রফতানি করতে পারবে। উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক ব্যবহার করে বাণিজ্য ও অর্থনীতি আরো গতিশীল করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে বলে প্রত্যাশা।