সঠিক সময়ে চালানের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিতের জন্য স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতি চালু করা হয় ২০১৯ সালে। এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও অধিদপ্তর-পরিদপ্তর অর্থ বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ না করে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে রাজস্ব বা সেবা ফি বাবদ অর্থ জমা রাখছে। এটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির পরিপন্থী। সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতার কারণে ট্রেজারি চালানের অর্থ জমা প্রদানের প্রচলিত পদ্ধতি সহজীকরণ, গ্রাহক ভোগান্তি হ্রাস, ভুয়া চালান জমা ও রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা রোধ করা যাচ্ছে না, যা কাম্য নয়। এতে সরকার প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ একটি পরিপত্র জারি করেছে। এতে স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি সরকারের কোষাগারে রাজস্ব জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি আয়ের যথাযথ হিসাব ও বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের স্বার্থে অটোমেশনের বিকল্প নেই। যেসব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও বিধান করা আবশ্যক।
ট্রেজারি চালান নিয়ে জালিয়াতির বহু অভিযোগ রয়েছে। সিস্টেমের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই এ অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। মাঝে অভিযোগ ওঠে বেসরকারি ব্যাংকগুলো পাসপোর্টের ফি-সংক্রান্ত যে অর্থ সংগ্রহ করে, তা দু-তিন মাসেও সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয় না। এ অর্থ ব্যবহার করত ব্যাংক। ব্যাংকের এ প্রবণতা বন্ধে অর্থ বিভাগের নির্দেশনার বাস্তবায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাল চালান দাখিলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। কম রাজস্ব দিয়ে বেশি রাজস্ব জমা দেয়ার জাল দলিল তৈরি হচ্ছে। আবার মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক অফিসের সঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব সংগ্রহ বিষয়ক হিসাবে গরমিল থাকছে। এ অবস্থায় জালজালিয়াতি প্রতিরোধে দ্রুততার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় এ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এতে রাজস্ব সংগ্রহ সহজ হবে এবং সংগ্রহও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক সরকারের চালানের টাকা গ্রহণ করে আসছিল দীর্ঘদিন। আবার সোনালী ব্যাংকের সব শাখায় এটি গ্রহণ করা হতো না। এতে জনভোগান্তিও ছিল বেশি। সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার সফটওয়্যারের মাধ্যমে তফসিলি সব ব্যাংককে চালানের টাকা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। এখন স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতিতে ট্রেজারি চালানের যে অর্থ গ্রহণ করা হবে, তা পরবর্তী কর্মদিবসে সরকারের হিসাবে জমা হবে। সরকারের কোষাগারে অর্থ যথাসময়ে জমা না হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এতে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় চালান সিস্টেমের মাধ্যমে যথাসময়ে অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা হবে। সরকারকে ঋণও কম নিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রাজস্ব জমা দেয়ার জন্য অঞ্চলভিত্তিক স্বতন্ত্র ইউনিক নম্বর রয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক এ অর্থ সংগ্রহ করে কিন্তু সরাসরি সেটি জমা হয় এ নম্বরে। উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বিভিন্ন দেশেও সরকারি অর্থ জমা নেয়ার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রয়োগ হয়ে আসছে অনেক দিন থেকেই। বাংলাদেশে এটি অনেক দেরিতে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। দ্রুতই এটির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
‘স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতি’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। রাজস্ব জমা প্রদান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত সম্ভব হবে। স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক, হিসাবরক্ষণ অফিস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যেমন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সংগতি সাধনের ফলে সরকারের রাজস্ব জমা বাড়বে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের প্রদত্ত হিসাবের মধ্যকার পার্থক্য দূর হবে। সরকারি প্রাপ্তি সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য সরকারের আর্থিক অবস্থান ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। অনেক সময় ট্রেজারি চালান জালিয়াতি, এক চালানের নম্বর পরিবর্তন করে আবার জমা দেয়াসহ রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার মতো ঘটনা ঘটত। এটি বন্ধে স্বয়ংক্রিয় চালান পদ্ধতি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি এ বিধি পরিপালন না করে তাহলে ব্যক্তি খাতে এটির প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে তাই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নে উদাসীনতা ও তদারকির অবহেলার কারণে সুফল না মেলার উদাহরণ রয়েছে। এক্ষেত্রে যেন সেটি না হয়, তা নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হারে কমিশন প্রদান করা হবে বলে জানা গিয়েছিল। তাদের উৎসাহিত করতে দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।









