কভিড-১৯ মহামারীর অর্থনৈতিক পরিণাম অপরিমেয় ও সর্বব্যাপ্ত। এর বড় শিকার দেশের এসএমই খাত। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গৃহীত অঘোষিত লকডাউনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এ খাত। অনানুষ্ঠানিক খাতটিতে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়োজিত। বলা চলে, দেশে মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় চালক এসএমই। কিন্তু লকডাউনের সময়ে এ খাতের অনেক কর্মীই কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন, তাদের জীবিকা সংকটে পড়েছিল। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার এসএমই খাতের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন। পুঁজিবাজার, জামানতবিহীন ঋণ কিংবা ক্ষুদ্রঋণ কোনোটিই এ শিল্পের জন্য সহজলভ্য নয়। কার্যকরী ও সম্প্রসারণমূলক পুঁজি লাভের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পকে উচ্চহারে সুদ ও লেনদেন খরচ পরিশোধ করতে হয়। দলিলপত্র পেশকরণের জটিল পদ্ধতি, ঋণ অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, জামানতের চাহিদা প্রভৃতি শর্তপূরণের কঠোরতার ফলে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পড়েন। গতকাল আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ প্রদানে আইন প্রণয়নের কথা বলেছেন। সরকার এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সত্য, কিন্তু তাতে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি। এজন্য ব্যাংকিং খাতের অনীহাকে দায়ী করা হচ্ছে।
সমস্যার মূল উৎস হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক। আইনগত ব্যবস্থা উভয় পক্ষের অধিকার ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে না। অধিকন্তু, তুলনামূলকভাবে দুর্বল আইনি প্রক্রিয়ার ফলে সব অধিকার কার্যকর হওয়াও নিশ্চিত নয়। ফলে এসএমই ঋণদাতাকে অতিরিক্ত দলিলাদি, নির্ভরযোগ্য জামিনদার, জামানত-সংবলিত ব্যয়বহুল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। এটা এক ধরনের বীমার কাজ করে, তবে অর্থায়নের খরচও বেড়ে যায়। তাছাড়া সরকারি সেক্টরে কিংবা করপোরেট গভর্ন্যান্স ব্যবস্থায় দুর্নীতি কিংবা স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য আইনের শাসনও তেমন শক্তিশালী নয়। আইনগত অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতির প্রতি প্রশ্রয় প্রদানের ফলে এসএমই ঋণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফার্ম এবং ঋণদাতা উভয় পক্ষের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় কী করণীয় তা নির্ধারণ করা দরকার। ঋণদাতাদের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়, এরূপ শর্তে ঋণ দেয়াটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের জন্য সহায়ক নয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণপ্রাপ্তিতে যে সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। একটি বিষয় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের চিন্তা করা প্রয়োজন, তা হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণের সুদের চেয়ে ঋণটাই প্রাধান্য পায়। উদ্যোক্তারা কত সুদে পেলেন, সেটা তাদের সমস্যা নয়। ঋণ পাওয়াটাই হচ্ছে সমস্যা। এতে কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখে এ খাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। নইলে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে বিকাশের ধারায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এসএমই খাত। এ খাতের উদ্যোক্তাদের আয় ও সঞ্চয় সীমিত হওয়ায় যেকোনো অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতাও কম। ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পঞ্চম স্থানে রয়েছে সিএসএমই খাত। আর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় বাংলাদেশের এই খাত বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় এই শিল্প খাত বাঁচাতে ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ দ্রুত বিতরণ করা এবং সত্যিকার অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ঋণবাজারে অধিকতর দক্ষতা আনার জন্য বড় রকমের সংস্কার প্রয়োজন। এ সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে আইনগত ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনের ওপর। দ্রুত ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে এমন একটি আইনি প্রতিষ্ঠান, যা নিরাপদ সম্পত্তির অধিকার এবং চুক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবায়ন। আর্থিক লেনদেনসহ বিশেষায়িত বিনিয়োগ এবং প্রবৃদ্ধির বিকাশের জন্য আইনগত নিশ্চয়তা হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। দ্রুত উন্নয়নশীল এবং বহু উন্নত দেশের মতো প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ অর্থায়ন পেতে হলে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক, ডিলার, জোগানদারসহ যেকোনো অর্থ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জ্ঞাত ও স্থিতিশীল মূল্যমানের জামানত গ্রহণ করতে আগ্রহী হওয়ার জন্য আধুনিক আইন উৎসাহিত করবে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ ইনভেন্টরি, গ্রহণযোগ্য হিসাব, বাণিজ্যিক পেপার প্রভৃতিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করার পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এ ধরনের পদক্ষেপ ঋণের বিপরীতে জমিকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা হ্রাস করবে বৈকি। কেবল যে জমি ও বিল্ডিং এসএমইর জন্য সহজলভ্য নয়, তা কিন্তু নয়; বন্ধক দেয়াটাও যথেষ্ট ব্যয়বহুল। অর্থবাজারে তথ্যপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য আইনগত ও সাংগঠনিক কাঠামো অতি গুরুত্বপূর্ণ। অতি উন্নত জামানত নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং ক্রেডিট রিপোর্টিং ব্যবস্থা এ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। ঋণ দেয়ার আগে ও পরে ঋণগ্রহীতাকে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ঋণদাতার তদারক করতে সুবিধা হবে।










