বাংলাদেশে চার দশক ধরে ইসলামী ব্যাংক পরিচালিত হয়ে আসছে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশিকা ও কিছু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারের কোনো ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল টুলস নেই। এ কারণে এসএলআর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে নীতিছাড় দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয় প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অন্য ব্যাংকের চেয়ে ইসলামী ধারার ব্যাংক বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ ধারার ব্যাংকগুলো ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ধরনের উদার নীতির বড় দায় আছে বলে অভিযোগ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইসলামী ব্যাংকগুলোর একসময়ে তারল্য ছিল অনেক, কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্র ছিল সীমিত। তারাই আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তারল্য সহায়তা চাইছে। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো তা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের আপৎকালীন সুরক্ষা হিসেবে তেমন কোনো আর্থিক উপকরণ নেই। জটিলতায় পড়লে অর্থ পাওয়ার এবং অতিরিক্ত তারল্য ঝুঁকিহীন বিনিয়োগের উপকরণ না থাকা আজকের সংকটের পেছনের কারণ। বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নয়নে দ্রুতই ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন এবং শক্তিশালী শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা জরুরি।

ইসলামিক ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাহিদা ও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে এবং ইসলামিক ব্যাংকিং বাংলাদেশেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্রমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল। এ ব্যবস্থাটি এখন বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং শিল্পের ৩০ শতাংশেরও বেশি বাজারের অংশীদার। তবে এ ব্যবস্থার আরো বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসে এ ধারার ব্যাংকগুলো হোঁচট খেয়েছে। তারল্য উদ্বৃত্ত থেকে এখন তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য আইনের দুর্বলতার চেয়ে ব্যাংকগুলোয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী করছেন বেশি। তারা বলছেন, ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তন এবং একই পরিবার থেকে একাধিক পরিচালক ও একাধিক দফায় থাকার নিয়ম থেকেই সংকটের সূত্রপাত। এর সঙ্গে নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আইন প্রণয়ন তার অন্যতম। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়, স্বল্পমেয়াদে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিতপূর্বক সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না গ্রাহক আস্থা অর্জন করায় ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি ছিল উঁচু। এ কারণে প্রচলিত ধারার অনেক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং উইং চালু করেছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এসব ক্ষেত্রে ভাটা পড়বে, যা কাম্য নয়।

বাংলাদেশে ইসলামিক আর্থিক ব্যবস্থায় আর্থিক স্থায়িত্বের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির প্রচার ও প্রসার এবং উদ্ভাবনী উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাও হয়েছে শক্তিশালী, বিশেষ করে জনসাধারণের ব্যাপক চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকার থেকে সমর্থনের কারণে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সম্প্রতি তাদের (সুকুক বা ইসলামী বন্ড বিনিয়োগ) বিধি, ২০১৯ সংশোধন করেছে, যার ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে তারল্য পরিচালনা করার পাশাপাশি সুকুকভিত্তিক ইসলামী মূলধন বাজারকে অধিক সহায়তা করবে। এখন এগুলোর পরিচর্যা প্রয়োজন। 

ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়ার এক বছর আগে ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ চালু করেছিল থাইল্যান্ড। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকিং শুরু হয়েছিল। মালয়েশিয়ায় আগে আইন পাস হয়েছে, তারপর ইসলামী ব্যাংকিং শুরু হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ৪০ বছরেও ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে এলেও এখন পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত আইন চালু করা যায়নি। ২০১১ সালে অর্থবিষয়ক স্থায়ী কমিটির কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি খসড়া আইন চূড়ান্ত করে জমা দিয়েছিল, কিন্তু এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর তত্ত্বাবধানেও ঘাটতি আছে। এসব ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইসলামী ব্যাংকগুলো পরিচালনার নীতিমালা খুবই দুর্বল। ২০০৯ সালে জারি করা একটি নির্দেশিকার ওপর ভর করে এ ধারার ব্যাংকগুলো পরিচালিত হচ্ছে। পৃথক আইন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলেও সে কমিটির কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। ব্যাংকগুলো শরিয়াহ অনুসরণ করে কাজ করছে কিনা সেটি যাচাই করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ নেই। আবার পরিদর্শন ও তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। সময় এসেছে এসব বিষয়ে নজর দেয়ার ও সংস্কার করার।

ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো তারল্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেয়ে আসছিল বলে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। এতদিন এ খাতের প্রবৃদ্ধির কারণে বিষয়গুলো সেভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি, কিন্তু বর্তমান সংকটকালে বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের টুলস আছে। কিন্তু ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য সে অর্থে কোনো ফাইন্যান্সিয়াল টুলস নেই। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য এসএলআর সংরক্ষণে ছাড় দেয়া হয়েছিল। গত চার দশকে ইসলামী ধারার ব্যাংক নিয়ে কখনো বিতর্ক ওঠেনি। এ ধারার ব্যাংকগুলোর আমানত সবসময়ই উদ্বৃত্ত ছিল। অন্য ব্যাংকগুলোর আমানতের দরকার হলে তারা ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে আমানত নিয়েছে। এখন বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে ইসলামিক ফাইন্যান্স শিল্পকে মূলধারার অর্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি অর্জন করেছে। এটি অর্থের এক ধরনের ভিত্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে, যা অর্থের সঞ্চালন এবং দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সম্ভাব্য নির্দেশ করে। এছাড়া ইসলামিক ব্যাংকিং যখন বিশ্বব্যাপী দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে এ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এর জনপ্রিয়তার রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা অপ্রচলিত ঋণ হ্রাস করে, ফাটকা ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করে এবং সমাজের কল্যাণকে উৎসাহ দেয়, সম্পদ এবং ইকুইটিভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা সরবরাহ করে, তার পরও ইসলামিক ব্যাংকিং দেশে ও বিদেশে আরো টেকসই পরিচালনার জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থ বাজারের সমর্থনের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ইসলামিক ব্যাংকিং আইন প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিংসংক্রান্ত দক্ষ জনবল তৈরিতে জোর দিতে হবে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এক্ষেত্রে বেশ জোর দিয়েছে। বাংলাদেশও ইন্দোনেশিয়ার মডেল অনুসরণ করতে পারে।