স্থিতিশীল ক্রেডিট রেটিং এবং সংকট প্রশমনে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার আলোকে এটি বলা যায়, বাংলাদেশ ঋণ সংকটে পড়ার আপাতত সম্ভাবনা নেই। আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার ঠিক পরই গত ২৮ জুলাই নিউইয়র্কভিত্তিক খ্যাতিমান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডিসের ভাষ্য হলো—‘বাংলাদেশের ওপর ঋণের চাপ বাড়লেও ঋণ সংকটের ঝুঁকি কম।’ সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পতনের হাত থেকে উদ্ধারে বেইলআউট  চাওয়া হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনো ততটা খারাপ হয়নি। তাই অহেতুক ভয় আমলে নেয়ার ভিত্তি আপাতত নেই বললেই চলে। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি মনে করে  সরকারের এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় করণীয় যথা, সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা,  বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহ দেয়া এবং  অসুবিধাগ্রস্ত মানুষকে সমর্থন দেয়া। তাছাড়া অংশগ্রহণমূলক নীতি সমঝোতার জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক সহযোগী, সুশীল সমাজ, অর্থনীতি বিশেষজ্ঞসহ নানা পর্যায়ে আলোচনা করে দুই থেকে তিন বছরের একটি স্বল্পমেয়াদি কৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দেয় এ সংন্থাটি। বর্তমানে আর্থিক কাঠামোসহ সরকারের যে ব্যয় সক্ষমতা তা উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে যথেষ্ট নয়। যার ফলে সরকার অর্থ খুঁজছে, ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের দর বাড়িয়ে মানুষকে কষ্টে ফেলেছে, যা কাম্য নয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে যা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের চেয়ে কম। ট্রেডিং ইকোনমিকস ডটকমের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ৩০-৩১ শতাংশে এবং ভারত ও পাকিস্তানে তখন এ অনুপাত ২০১৩-২০ সাল নাগাদ ৬০-৭০ শতাংশের খানিক ওপরে পৌঁছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশে এ অনুপাত স্থিতিশীল এবং বাংলাদেশের গড় অনুপাত ভারতের চেয়ে অনেক কম। তার পরও সরকার বৈশ্বিক চাপের মধ্যে রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বেরিয়ে এসেছে। যেমন- ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইত্যাদি।

অর্থনৈতিক খাতের আরো একটি বিষফোঁড়া হলো খেলাপি ঋণ। এর কোনো সমাধান স্বল্পমেয়াদে সম্ভব হয়ে উঠছে না কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। এটা আর্থিক খাতের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। অর্থমন্ত্রীরা ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন, যার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ক্রমাগতভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি গত জুনে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী তার উত্তরে বলেন, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণ পাঁচটি যথা—এক. দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মবহির্ভূত অনেক চর্চা অব্যাহত থাকা; দুই. ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথাযথ ঋণগ্রহিতা নির্বাচনে ব্যর্থতা ; তিন. ঋণের বিপরীতে রাখা পর্যাপ্ত জামানত, একই সম্পদ একাধিক ব্যাংকে জামানত রাখা ও জামানত বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দেখানো; চার. গ্রাহকের সব দলিল সংগ্রহ ও সঠিক যাচাই না করা; পাঁচ. ঋণগ্রহিতার তহবিল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, প্রয়োজন  ও সামর্থ্যের  বিচার না করে অতিরিক্ত ঋণ দেয়া, সময় সময় ঋণসীমা বাড়ানো, ঋণ তফসিলকরণ ও পুনর্গঠন সুবিধা দেয়া ইত্যাদি। অর্থমন্ত্রী আরো বলেছেন, ঋণখেলাপি হলে আদায় ও বিতরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় জাতীয় আয়ে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ দেয়ার সংস্কৃতি ঋণখেলাপির যে অন্যতম কারণ, তা মন্ত্রী উল্লেখ করলে তার উল্লেখিত কারণগুলো আরো যথার্থ হতো।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঋণখেলাপি দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেয়ার কথা এলেই একটা বিভাজন সরকারের তরফ থেকে করা হয়, সেটি হলো ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। কিন্তু কে যে ইচ্ছাকৃত আর কে নয়, তার কোনো সুরাহা হয়নি। যদিও অর্থমন্ত্রী বাজেটেই ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নতুন এক দিক নিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখলেন গত বছরের ৮ জুলাই। লেখার শিরোনাম ছিল, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি একটা নেশা কেন? মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা নিয়ে ইদানীংকালের গবেষণার ফলের ওপর ভিত্তি করে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের বিষয় কিছু নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এর ওপর ভিত্তি করে নিওরো-ইকোনমিকস বলে, অর্থনীতির একটা নতুন ধারার গবেষণা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দেখা গেছে মানুষের ভাবাবেগ- যা মস্তিষ্কের সামনের অংশের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে- তা অনেক সময় পেছনের অংশের যুক্তিনির্ভর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে যুক্তিভিত্তিক বলে যে অনুমান করা হয়, বাস্তবে আবেগতাড়িত হয়ে মানুষ অনেক সময়ই তেমন আচরণ করে না। দেখা গেছে মানুষের ভাবাবেগ, যা মস্তিষ্কের সামনের অংশের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, তা অনেক সময়ই পেছনের অংশের যুক্তিনির্ভর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে যুক্তিভিত্তিক বলে যে অনুমান করা হয়, বাস্তবে আবেগতাড়িত হয়ে মানুষ অনেক সময়ই তেমন আচরণ করে না। আমাদের ব্যাংকিং খাতের ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা কেন বারবার একই কাজ করেন তার অন্তত একটা আংশিক উত্তর উপরোক্ত গবেষণা থেকে মিলতে পারে। তার অর্থ, এরই মধ্যে এভাবে আসক্ত হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ছাড়া শুধু আর্থিক খাতের সংস্কার দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান মিলবে না। তবে বৈধ পথে মুনাফা অর্জনের নেশা সফল উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় বড় বড় শিল্পপতিরা অগাধ ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন যে আরো মুনাফা অর্জনের নেশায় সর্বক্ষণ তাড়িত হন, বিগত শতাব্দীর বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুম্পিটার একে এক ধরনের জৈবিক তাড়না বলে অভিহিত করেছিলেন। আধুনিক নিউরো সায়েন্সের গবেষণা থেকে এখন এর আরো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া গেল।

এখন খেলাপি ঋণ আদায়ে কিছু বিষয় সুবিবেচনায় আনা প্রয়োজন। প্রথমত, ঋণ বিতরণ ও আদায়ে সমতা বিধান করা। ঋণ বিতরণ যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে হয় তাহলে আদায়ের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ ব্যাপারে ব্যাংকার গ্রাহকের নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যারা অসাধুতাকে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত করে তারা উভয়ই সমান দায়ী। এ ব্যাপারে প্রথমে ব্যাংকারদের সতর্ক হতে হবে এবং পরে গ্রাহককেও এ পথ অনুসরণ করতে হবে; দ্বিতীয়ত, দেশের ৩৯টি বেসরকারি ও চারটি সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সাধারণত আর্থিক বাজারের অংশ হিসেবে স্বল্পমেয়াদে গ্রহীতাদের ঋণের চাহিদা পূরণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এ ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে, যার বেশির ভাগ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ঋণ দেয়া এবং ঋণখেলাপি হওয়ার মতো একটি যাতনা বয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে তারল্য সংকট, মুনাফার ঘাটতি ও ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), বেসিক ব্যাংক, রাকাব ইত্যাদি রয়েছে, যারা সরকারি ব্যাংক হিসেবে সরকারের সাহায্যপুষ্ট হয়ে বেশি সময়ের অর্থায়নে অংশ নিতে পারে। এ অসংগতিগুলো দূূর করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের বৃহদাকার ঋণগুলোর স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না হওয়ায় অনেক অলাভজনক খাতেও ঋণ বিনিয়োগ হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ঋণ অনুমোদন হয়, যার বেশির ভাগ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায়, পরিণতি হয় খেলাপি ঋণ। এখন গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করলেও অন্তত ব্যাংকিংয়ের মতো সেবাধর্মী আর্থিক খাতটি রাজনীতি মুক্ত রাখা যায় না কেন? এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক হিসেবে তার সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান জরুরি।

চতুর্থত, ঋণ মওকুফ, ঋণের পুনঃতফসিলীকরণ, ঋণের অবলোপন এ বিষয়গুলো এখন খুব ক্ষতিকর ও অলাভজনক। ব্যাংকও ঢালাওভাবে সবাইকে সুযোগ দিতে পারে না কিংবা  ঢালাওভাবে বিবেচনায়ও আনতে পারে না। কিন্তু জায়গাটিতে ব্যাংকার কিংবা ব্যাংকিং সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা, প্রশাসনিক সমর্থন ইত্যাদি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, সরকার যদি সচেষ্ট হয় তবে সামাজিকভাবে এসব খেলাপি ঋণের মোকাবেলা করাও সম্ভব, আবার প্রশাসনিকভাবেও সম্ভব। এখন কোনটি ভালো হবে তা কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবে। তবে সমস্যার অবশ্যই একটা জুতসই সমাধান চাই ব্যাংক খাতের স্বার্থে।

 

ড. মিহির কুমার রায়: অধ্যাপক ও ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা