বিশ্বের অন্যান্য দেশের
মতো বাংলাদেশও
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের
কারণে জ্বালানির
আন্তর্জাতিক বাজার
অস্থির হয়ে ওঠায় মূল্যস্ফীতিও বেড়ে উঠছে। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর
পাশাপাশি কৃষি-শিল্পের উৎপাদনে
মারাত্মক প্রভাব
পড়েছে। বাংলাদেশে
ক্রমাগত জ্বালানি
চাহিদা বাড়ায়
ব্রুনাই এ খাতে বাংলাদেশকে
সহযোগিতা করবে বলে অঙ্গীকার
করেছে। দুই পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি রফতানিতে নতুন পথ বের করার জন্য একমত পোষণ করে, বিশেষ
করে বাংলাদেশে
এলএনজি এবং অন্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রফতানিতে সহযোগিতার
বিষয়ে একমত প্রকাশ করা হয়। ইতিবাচক
এ উদ্যোগকে
বাস্তবে রূপ দিতে আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে ব্রুনাই
থেকে জ্বালানি
আমদানির ফিজিবিলিটি
স্টাডি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আগ্রহ
ও ব্রুনাইয়ের
সম্মতি মিলেছে,
এখন প্রয়োজনীয়
পেপার ওয়ার্ক
ও মাঠ পর্যায়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাই আয়তনে পাশের দেশগুলোর চেয়ে অনেক ছোট। তবে মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মানের বিচারে দেশটির অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর কারণ দেশটির জ্বালানি সম্পদ। ব্রুনাইয়ের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি জ্বালানি তেল ও গ্যাস। অধিকন্তু দেশটির জনসংখ্যা কম। ফলে সেখানকার নাগরিকরা ওই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের তুলনায় উন্নত জীবনমান উপভোগ করে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ অবদান তেল ও গ্যাসসংশ্লিষ্ট শিল্পের। মোট রফতানি আয়ের ৯৫ ভাগের বেশি অংশই আসে জ্বালানি পণ্য দুটি রফতানির মাধ্যমে। ১৮৯৯ সালে দেশটির রাজধানী ব্রুনোই টাউনের কাছে প্রথম তেলক্ষেত্র আবিষ্কার হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে বিভিন্ন স্থানে তেলের মজুদ আবিষ্কার হয়। ১৯৩২ সালে তেল রফতানি শুরু করে তারা। ২০১৬ সালে তেল উৎপাদনকারী দেশের জোট ওপেক প্লাসে যুক্ত হয় ব্রুনাই। ব্রুনাইয়ের শীর্ষ তেল উৎপাদক সংস্থা ব্রুনাই শেল পেট্রোলিয়াম দেশটির ৯০ শতাংশের বেশি জ্বালানি পণ্যটি উৎপাদন করে। সে দেশের সরকার ও রয়্যাল ডাচ গ্রুপ অব কোম্পানিজের যৌথ উদ্যোগে এ সংস্থা পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে ব্রুনাইয়ের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল জাপান। তবে নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো দেশটির জ্বালানি পণ্যটির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে। ব্রুনাইয়ের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ২০২২ সালের জুনে দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল এবং কেমিক্যাল রফতানি হয়েছে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক কেমিক্যাল দ্রব্য সেখানকার প্রধান রফতানি পণ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের ২০২২ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, দিনে ৮৫ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ব্রুনাইয়ের। তবে ওপেক প্লাসের ২৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ব্রুনাই সবচেয়ে কম পরিমাণ তেল উৎপাদন করে। দেশটির মজুদে তেল রয়েছে ১১০ কোটি ব্যারেল। ব্রুনাই প্রতি বছরে যে পরিমাণ তেল ব্যবহার করে, তার ১৮৮ গুণ তাদের মজুদে রয়েছে। অর্থাৎ রফতানি বন্ধ করলে মজুদে থাকা তেল দিয়ে (বর্তমান হিসাব অনুযায়ী) দেশটি ১৮৮ বছর চলতে পারবে। এটি বাংলাদেশের জন্য সুযোগও বটে। বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহে ব্রুনাইয়ের সম্মত হওয়াকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
ব্রুনাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আশির দশকে শুরু হয়। তবে ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রফতানির হার ছিল খুবই সামান্য। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৪-৮৫ সালে প্রথমবার ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি শুরু হয়। এরপর ২০১২-১৩ পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই দেশটিতে পণ্য রফতানি হয়। তবে অর্থের পরিমাণ হিসাবে সেই সংখ্যাটা ছিল খুবই কম। ২০১৩ সাল থেকে সেখানে নিয়মিত পণ্য রফতানি শুরু করে বাংলাদেশ, যার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায় ২০১৮ সালে। শুরুর দিকে ব্রুনাইয়ে চাসহ আরো কিছু পণ্য রফতানি করত বাংলাদেশ। তবে বর্তমানে এগুলো ছাড়াও কল-কারখানার যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য, লবণ, কাগজ, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য রফতানি করা হয়। ব্রুনাই আশির দশকে বাংলাদেশে পণ্য রফতানি করা শুরু করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় মূলত ২০১৯ সালে। ওই বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রুনাই সফরে গিয়ে কয়েকটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার মধ্যে কৃষি ও মত্স্য, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি, সাংস্কৃতিক ও শিল্পসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা হয়। সে বছর থেকেই ব্রুনাই বাংলাদেশে পণ্য রফতানি বৃদ্ধি করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে আরো পণ্য রফতানির। ব্রুনাইয়ের রাষ্ট্রপতির আলোচ্য সফর এক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখতে হবে। কারণ এবারই প্রথম দেশটির কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশ সফরে এলেন।
অর্থনীতিতে ঝুঁকি কমিয়ে আনতে বাজার বহুমুখীকরণের কথা বলা হয়ে থাকে। জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ জরুরি। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হলো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নতুন চুক্তি করতে আগ্রহী নয়। ব্রুনাই তেলসমৃদ্ধ দেশ এবং দেশটির রিজার্ভের পরিমাণও ভালো। বাংলাদেশ সেখান থেকে সুলভে তেল ও গ্যাস আনতে পারলে আর্থিক চাপও কমবে। কিন্তু তার আগে ব্রুনাইয়ের তেল বাংলাদেশে পরিশোধন করা যায় কিনা। ব্রুনাই ওপেক প্লাস দেশের সদস্য, তারা বাংলাদেশে তেল রফতানির অনুমতি দেবে কিনা, দিলেও কত পরিমাণ, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। জ্বালানির বাজারটি অন্য আট-দশটি বাজারের মতো কাজ করে না। এখানে যেমন জোট আছে, তেমনি আছে দেশের বিষয়। ব্রুনাই থেকে জাহাজে করে তেল ও গ্যাস আমদানি করে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে এবং কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হবে ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সৌদি আরব বা আরব আমিরাত থেকে ব্রুনাইয়ের অবস্থান বাংলাদেশের কাছাকাছি। ফলে জ্বালানি পরিবহনে ব্যয় হবে কম। উভয় দেশ উইন উইন সিচুয়েশনে উপনীত হলে তেল আমদানি করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ব্রুনাইয়ের আগ্রহ থাকতেই পরবর্তী কাজগুলো এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের একটি সমস্যা হলো ব্রুনাইয়ের সরকারপ্রধান চলে যাওয়ার পর বিষয়টি আবার ঝিমিয়ে যাবে, যা অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে। এবার যেন তেমনটি না ঘটে, সেদিকে দৃষ্টি থাকা চাই।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সে তুলনায় দেশের মাথাপিছু জ্বালানি পরিভোগের পরিমাণ এখনো কম। অনেক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে, মানুষের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে। ফলে মানুষের জ্বালানি ক্রয়ের পরিমাণও বাড়বে। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি তেল ও গ্যাসনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে ওঠায় বিদ্যুতে লোডশেডিংও বাড়ছে। তাছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। সবকিছুর পেছনে রয়েছে অতিমূল্যের জ্বালানি। ব্রুনাই থেকে সস্তায় জ্বালানি মিললে সরকার ও মানুষের চাপ কিছুটা হলেও কমবে। তাই ব্রুনাইয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।










