সেলফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সেবার মানে গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মোবাইলের ভয়েস কল ও ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, নেটওয়ার্ক সমস্যা, ভয়েস কলের নিম্নমান, কলড্রপ, রিচার্জের মেয়াদ কমানো-বাড়ানো, জরুরি সেবার নম্বরে কল ধরায় অহেতুক বিলম্ব, অযথা প্রমোশনাল কল প্রভৃতি ক্ষেত্রে গ্রাহকের পকেট থেকে চার্জ কাটা অনেকটা যেন আবর্তনিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ফলে অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের অসন্তুষ্টি বেড়েই চলেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেলফোনের গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে অপারেটরদের মুনাফা। বাড়তি রাজস্বও পাচ্ছে সরকার। কিন্তু সেবার মানে অবনতি ঘটছে, যা কাম্য নয়।
বাংলাদেশে সেলফোনের বিপ্লব সম্ভব হয়েছে মূলত সেলফোনের প্রসারে বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছার কারণে। উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার কারণে এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ, গ্রাহক উদ্বুদ্ধকরণে মোবাইল অপারেটরদের সিম ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি। সর্বোপরি সেলফোন সেবা সর্বসাধারণের যোগাযোগের সহজতর মাধ্যম হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে এবং এ সেবার মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে অন্যান্য সেবা, যেমন টাকার লেনদেন, ই-কমার্স, ই-কৃষি, অ্যাপসভিত্তিক নানা রকমের সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠা ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সব মিলিয়ে এই শিল্পের প্রসার দ্রুত ঘটছে। এ পরিবর্তনগুলো এত দ্রুত হয়েছে যে এ খাতের নীতিনির্ধারক এমনকি বিনিয়োগকারীরাও মানুষের চাহিদা পূরণেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে, অবকাঠামোগত সুবিধাগুলোর বিষয়ে সেভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। ফলে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
গ্রাহকসেবার অসন্তুষ্টি দূর করতে বিটিআরসি মানসম্মত সেবা তথা কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। আশা করা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়ন হলে সেবার মানে লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে। তবে তাতেও গুড়ে বালি। সেবার মান তো বাড়েইনি; বরং চলমান সংকটে এটি আরো নিম্নগামী। সেটি নেটওয়ার্ক সমস্যা ও ডাটার সেবার মান উভয় দিক থেকে। অপারেটররা অবশ্য এজন্য মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং নিজেদের প্রস্তুতিহীনতাকে দায়ী করছেন। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে চাহিদা বাড়বে, তা কারো অজানা নয়। কাজেই অপারেটরগুলোর প্রয়োজন ছিল সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া। সেবার মান বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। দরকার ছিল বাড়তি চাপের মধ্যেও যাতে সেবার মান ধরে রাখা যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় তরঙ্গ কেনা। অথচ মূলত মুনাফার বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে তরঙ্গ কেনার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি তারা। নেয়নি ন্যূনতম কোনো প্রস্তুতিও। সুতরাং নিম্নগামী ডাটাসেবা এবং গ্রাহকের অসন্তুষ্টির দায় তারা কোনোভাবে এড়াতে পারে না। একথাও সত্য, বিটিআরসিকেও ছাড় দিতে হতো। ডাটার মূল্য কমিয়ে অপারেটরদের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ আটকে রাখা মোটেই যৌক্তিক হয়নি। ফলে বর্তমানে সেবার মান খারাপ হওয়ার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসিও এড়াতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুতই সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডাটার গতি বাড়াতে স্বল্পমূল্যে অধিক তরঙ্গ বরাদ্দ প্রদান। একই সঙ্গে তদারকিও জোরদার করতে হবে, যাতে এর সুবিধা গ্রাহকরা পান।
সেলফোন অপারেটরদের সেবার মান নিয়ন্ত্রণে ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ (কিউওএস) গাইডলাইন বা নীতিমালা রয়েছে কিন্তু এনটিটিএন অপারেটরদের সেবার মান নির্ধারণে এমন কিছু নেই। সম্প্রতি সংশোধিত আইএলডিটিএস নীতিমালায়ও এনটিটিএন অপারেটরদের কিউওএস নিয়েও কোনো মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি। সেবা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের সেবার মানদণ্ড যদি অনির্ধারিত থেকে যায়, তাহলে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষে শতভাগ মানসম্পন্ন সেবা কী করে নিশ্চিত করা সম্ভব—এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়নের স্বার্থে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের একটি সামগ্রিক সংস্কার অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার এ খাতকে এগিয়ে নিতে নিঃসন্দেহে অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে, তবে আরো কিছু ক্ষেত্রে সরকার যদি তার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে তাহলে সেবার মান নিয়ে যেসব প্রশ্ন এখন রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এজন্য বেতার তরঙ্গ, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কসহ টেলিযোগাযোগ খাতের সেবার মান সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সংস্কারের কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ৫জি এবং নিত্যনতুন প্রযুক্তির বিষয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ সংস্কারগুলো করতে হবে। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা উন্নত মোবাইল সেবা চাই, সেই সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
সেলফোন ইন্টারনেটের গতিতে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৩৫তম। প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই তরঙ্গ পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। মানে হলো, এ দেশে তরঙ্গের বিপরীতে গ্রাহক বেশি; যা সেবার মান কমিয়ে দেয়। যেমন বাংলাদেশে প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের বিপরীতে গ্রাহক ১২ লাখ ৯০ হাজারের মতো। পাকিস্তানে তা ১২ লাখ ৩০ হাজার, মিয়ানমারে ৪ লাখ, থাইল্যান্ডে ২ লাখ ৮০ হাজার। বিদ্যমান বাস্তবতায় বিনা মূল্যে তরঙ্গ চাওয়ার চেয়ে দুই পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক কোনো পদক্ষেপ নেয়া দরকার। মূল্যছাড় দিয়ে তরঙ্গ দিলে সরকারের কোষাগারেও কিছু অর্থ যাবে। সেবার মান দুভাবে উন্নত করা যায়, টাওয়ার বসিয়ে অথবা তরঙ্গ বাড়িয়ে। দুটোই আপাতত সম্ভব নয়। সরকার বলছে, নিলাম ছাড়া তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া যাবে না। আবার দাম কমাতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। এমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলে সেবার মান দ্রুত বাড়ানো যাবে না। দুর্যোগকালীন অবস্থা মোকাবেলায় নিয়ম শিথিল করে হলেও ডাটা সেবার মান বাড়াতে হবে।
সেলফোন অপারেটরদের সেবার মানসংক্রান্ত নীতিমালায় কল সাকসেস রেট ৯৭ শতাংশ অথবা তার বেশি হওয়া, কলড্রপ ২ শতাংশের কম থাকা এবং কল সেটআপ টাইম সাত সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে থ্রিজি ডাটার ন্যূনতম গতি ২ এমবিপিএস এবং ফোরজি ডাটার গতি ন্যূনতম ৭ এমবিপিএসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আশার কথা, এই নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে যাচাই শুরু হয়েছে। এই ড্রাইভ টেস্ট চলবে ছয় মাস। ড্রাইভ টেস্টের ফলাফলে কোনো ব্যত্যয় থাকলে অপারেটরদের তা জানানো হবে এবং সেবার মান উন্নত হয়েছে কিনা, তা পরবর্তী সময়ে যাচাই করা হবে। সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও তদারকি জোরদার করা ছাড়া এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না, এটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে।










