আমি ১৯৭০ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হই। স্বাভাবিকভাবেই এ বিভাগের স্বনামধন্য ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ শিক্ষকদের মুখে মিজানুর রহমান শেলী, রওনক জাহান, তালুকদার মুনিরুজ্জামানের গল্প শুনি আমরা। ষাটের দশকের শুরুতে তারা সবাই ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আমরা আবার ক্লাস শুরু করি। অধ্যাপক রওনক জাহান সম্ভবত ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী তখন আমাদের বিভাগীয় চেয়ারম্যান। আমরা আশপাশ থেকে শুনছি যে রওনক জাহান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করবেন। তিনি রাজ্জাক স্যারেরও খুব প্রিয়ভাজন মানুষ ছিলেন। রওনক জাহান আপা অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর পরই আমরা তার ক্লাস পাই। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসেছেন, শুরুতেই যেন শ্রদ্ধায় নত হয়ে জানাতে ইচ্ছে করে। ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ নামে তার বিখ্যাত বই সম্পর্কেও আমরা ততদিনে জেনে গেছি। এ বইটি খুলে আমার মনে হয়েছে, তিনি একজন অসাধারণ বড় মাপের গবেষক। তিনি যেভাবে গবেষণা চালিয়েছেন, ফুটনোট ও তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির ব্যর্থতা নিয়ে এর চেয়ে ভালো বই আর চোখে পড়েনি। রওনক আপার বইয়ের পাশাপাশি পাকিস্তান পলিটিকসের ওপর কে বি সাইদের বইগুলোও আমাকে তখন খুব আকৃষ্ট করেছিল।
রওনক আপা যেহেতু হার্ভার্ড থেকে ফিরেছেন, তাই দেখার আগে থেকেই তাকে নিয়ে আমাদের একধরনের ইমেজ তৈরি হয়। সম্ভবত তৃতীয় বর্ষে ছিলাম, তিনি আমাদের কম্পারেটিভ পলিটিকস পড়াতেন। মনে আছে খুব পরিশ্রম করে পড়াতেন আমাদের। তার শিক্ষাদানের মধ্যেই তার অসাধারণ মেধার প্রকাশ ছিল। আমি তখনো খুব একটা নিয়মিত ক্লাসে যেতাম না। কিছুদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরেছি, তখনো উদ্দামতা কাটেনি। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে রওনক আপার ক্লাসগুলো করা দরকার। মনে আছে, আমি তখন রওনক আপার ক্লাসটাই নিয়মিত করতাম। কারণ তার পড়ানোর ধরন আমার খুব ভালো লাগত। তাছাড়া অসাধারণ গবেষক হিসেবে তিনি আমাদের কাছে চমত্কারভাবে বিষয়বস্তুগুলো উপস্থাপন করতেন।
সম্ভবত ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের নারী সাংসদদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন, আমার সহপাঠীদের অনেকেই তার এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালেই আমি অনার্স শেষ করলাম। তবে আপার সঙ্গে খুব যে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল, তেমনটি বলা যাবে না। শিক্ষক-ছাত্রের দূরত্বটা বজায় ছিল।
রওনক আপার সঙ্গে আমার সখ্যতা তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কে, তিনি তখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর আমি সেখানে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট জোনস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করাও শুরু করি। ভর্তির অংশ হিসেবে আমি একটি প্রপোজাল তৈরি করি, যা তাকে দেখাতে নিয়ে যাই। রওনক আপা তা দেখে বললেন, ‘তুমি তো ভালোই লেখো, আমি খুশি হলাম যে আমার ছাত্ররা পড়াশোনার ব্যাপারে এখনো অনেক আগ্রহী।’ আমার পড়াশোনা এগোলেও ডিগ্রির কাজ আর শেষ করা হয়নি পেশাগত বাড়াবাড়ির কারণে।
এরপর অনেকবার তার নিউইয়র্কের বাড়িতে গিয়েছি। আমার স্ত্রীও গিয়েছেন। তিনি আমাদের যথেষ্ট স্নেহ করতেন। এভাবে ক্রমেই আপার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা গড়ে ওঠে। এছাড়া নিউইয়র্কে বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা সভায়ও তাকে পেয়েছি। তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছি সবসময়। আমি যেহেতু তার সরাসরি ছাত্র, তিনি বিভিন্ন সময় আমাকে তাই বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েও সহায়তা করেছেন।
রওনক জাহান শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ, গবেষক হিসেবে তার চেয়েও বেশি। আমাদের সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দুজন শিক্ষককে দিকপাল হিসেবে আমরা মনে করতাম, তাদের একজন অধ্যাপক রওনক জাহান, অন্যজন অধ্যাপক তালুকদার মুনিরুজ্জামান। লেখালেখির পাশাপাশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজটি তারা করেছেন।
পাকিস্তানের ব্যর্থতা ও বাংলাদেশের জন্মের প্রেক্ষাপটটা যদি কেউ বুঝতে চান তাহলে রওনক আপার পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের চেয়ে ভালো বই এখনো আসেনি। তালুকদার মুনিরুজ্জামানের মিলিটারি উইথড্রঅল ফর পলিটিকস এবং সিকিউরিটি অব স্মলসিস্ট বই দুটিও অসাধারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে, লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে, জাতিসংঘের লাইব্রেরি ইত্যাদি জায়গায় এ বইগুলো আমি পেয়েছি। এখনো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বইগুলো ব্যবহূত হয়।
ঢাকায় ফিরে আসার পরও বিভিন্ন সময় আপার সঙ্গে দেখা হয়েছে। এখনো তাকে আমি আমার শিক্ষক হিসেবেই মনে করি, আর তিনি এতদিনে হয়তো আমাকে তার ছাত্রের চেয়ে আরেকটু বেশি আপন হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন।
কিছুদিন
আগে একটি
অনুষ্ঠানে বিদেশী
একজন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসম্পর্কিত আলাপকালে আমরা দুজনেই
খানিকটা উচ্চকণ্ঠে
কথা বলার
সময় রওনক
আপা আমাদের
মধ্যে এসে হাজির হন। তিনি ওই বিদেশী কূটনীতিককে আমার সম্পর্কে বলেন
যে, ‘ওকে আমি বহু বছর ধরে চিনি, বাংলাদেশে
যে কয়জন
ভালো কূটনীতিক
রয়েছে ও তাদের একজন
এবং ও যে কথাটা
বলছে সে কথাটি যে ঠিক এটাই
আমি তোমাকে
বলে দিতে
চাই।’ এরপর
কিন্তু ওই বিদেশী কূটনীতিক
আর কথা বাড়াননি। সে মুহূর্তে আমার
মনে হয়েছে,
প্রফেসর রওনক
জাহান আমাকে
শুধু তার ছাত্র হিসেবে
নয়, অত্যন্ত
স্নেহভাজন ও কাছের মানুষ
হিসেবেই দেখেন।
আমি মনে করি রওনক আপা এখনো তার মেধা ও শিক্ষক হিসেবে
তার যোগ্যতার
ক্রমবিকাশ ঘটিয়ে
চলেছেন। বিভিন্ন
জায়গায় তিনি
লিখছেন, বক্তব্য
রাখছেন। আমি বলব ষাটের
দশকে বাংলাদেশে
যে মেধার
স্ফুরণ ঘটেছিল,
অধ্যাপক রওনক
জাহান তাদের
একজন উত্কৃষ্ট
প্রতিনিধি। তিনি
আমাদের সমাজের
জন্য তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান
রেখেই চলেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল গণতন্ত্রকে সামনে রেখে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। তিনিও সমভাবে এ বিষয়গুলো ধারণ করেন। কিন্তু এখনো যেহেতু আমাদের স্বপ্নগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তাই তিনি আমাদের সে লক্ষ্য অর্জনের পথে যাওয়ার দিশারি হবেন এবং আমাদের সেই পথটা দেখাবেন। তার গুণমুগ্ধ ছাত্র হিসেবে আমি যদি তার দেখানো সে পথের সহযাত্রী হতে পারি বা তার পেছনে থাকতে পারি তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
শিক্ষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, একজন আদর্শ গবেষক হিসেবে আমি অধ্যাপক রওনক জাহানকে সামনের সারিতে রাখব। তার ছাত্ররা এখনো তাকে সেভাবেই সম্মান করেন। তাই বিআইডিএস ও বণিক বার্তার এ উদ্যোগকে আমি মহৎ উদ্যোগ হিসেবে মনে করব। কারণ একজন শিক্ষককে সম্মান জানানোর খুব বেশি উদ্যোগ সমাজে আমরা দেখি না। সেই জায়গায় এ উদ্যোগটি অনন্য। রওনক জাহানের মতো শিক্ষকেরা আদর্শের প্রতিভূ। তারা নৈতিকতার প্রদীপ। আজও নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাঠটা আমরা তাদের কাছ থেকেই শিখছি। তাই অধ্যাপক রওনক জাহানের মতো যে শিক্ষকরা আমাদের পথ দেখিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
এম হুমায়ূন কবীর: সাবেক রাষ্ট্রদূত










