বাংলাদেশ এখন একটা অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এই সরকার সংস্কারকাজ করার জন্য প্রাথমিকভাবে ছয়টি কমিশন গঠন করেছিল। আরো চারটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই, এই সরকার বিগত সব সরকারের মতোই শিক্ষা ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করেছে, অবহেলা করেছে। আমরা যারা শিক্ষার সাথে জড়িত, তাদের অন্তত এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল যে এই সরকার সংস্কারের ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু আমাদের আশাহত হতে হলো।

আমরা বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে দেখতে পাই, প্রায় সব সরকারই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলা করেছে অথবা এটা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেনি। ফলে আমরা আপাতদৃষ্টিতে কিছু কাঠামোগত উন্নতি করতে পারলেও জাতিগতভাবে, নীতিগতভাবে ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে মোটেও উন্নতি সাধন করতে পারিনি। আমরা যে সেটা করতে পারিনি তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে উচ্চ শিক্ষিত লোকদের দুর্নীতি। মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্নপদস্থ পিয়ন পর্যন্ত সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত, দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া।

একটু লক্ষ করলেই বুঝতে পারব আমাদের দেশের সরকারগুলো কাদের উন্নতি অথবা কোন বিভাগগুলোর সুযোগ-সুবিধার জন্য বেশি মনোযোগী হয়। সেগুলো হচ্ছে জনপ্রশাসন, পুলিশ, সামরিক বাহিনী ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এটা সহজেই অনুমেয় যে এ বিভাগগুলোই যেকোনো সরকারকে তার চেয়ার ধরে রাখার জন্য সহায়তা করে; এ বিভাগগুলো ছাড়া সরকার টিকে থাকতে পারবে না। জাতিগতভাবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা সবসময় এ ধরনের সরকারই পেয়েছি, যারা শুধু তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার রাজনীতি করেছে। তারা কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা করতে পারেনি। যদি কেউ কোনো দেশের উন্নতির জন্য কোনো গবেষণামূলক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে, তার ভেতর অবশ্যই শিক্ষার একটা অন্যতম প্রধান অবস্থান থাকবে। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম প্রাথমিক সংস্কারের জন্য যে কমিশনগুলো গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষার কোনো স্থান নেই। এটা আমার মতো যারা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত, যারা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তারা কেউ মেনে নিতে পারবেন না। একটা দেশকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে হলে প্রথমেই ওই দেশের যে ব্যবস্থাটাকে উন্নত করতে হবে, সেটা হচ্ছে শিক্ষা। যে জাতি এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে, সেই জাতি ততই তাড়াতাড়ি উন্নত হবে। আমরা সব উন্নত বিশ্ব যেমন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশগুলোর দিকে নজর দিলেই দেখতে পারব, তারা কীভাবে এতটা উন্নতি সাধন করেছে। তারা যেটা করেছে, তারা প্রথম থেকেই তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করেছে এবং সেই শিক্ষা থেকে গবেষণালব্ধ ফলই তাদেরকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

আমি ডেনমার্কে অবস্থিত আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেক্টর (এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানকে রেক্টর বলে) বলেছিলেন, ‘যদি কোনো অঞ্চল অথবা সমাজ পরিবর্তন করতে চাও, তাহলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ওখানে নির্মাণ করো আর ৫০ বছর অপেক্ষা করো।’ এর অর্থ, একটা জাতিকে পরিবর্তন করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষা। এ প্রসঙ্গে জাপানের উন্নতির পেছনের ইতিহাসটা একটু পর্যালোচনা করতে চাই, যেখান থেকে আমরা এর বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারব।

১৯৪৫ সালে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়। এ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রথম কয়েক দশক জাপান প্রধানত পরিচালিত হয়েছে আমেরিকার প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানের সংস্কার ও উন্নতির জন্য জাপান ১৯৫১ সালের মধ্যে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়। এজন্য জাপান তাদের নিজস্ব শিক্ষাবিদ এবং আমেরিকা থেকে আগত প্রায় ২৭ জন শিক্ষাবিদের যৌথ গবেষণা এবং কর্মতৎপরতার মাধ্যমে বেশকিছু শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করে ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে। এটা তারা কেন করেছে? কারণ জাপানের আমলা, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করে অনেকেই একমত হয়েছেন যে এ যুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে জাপানের মানবসম্পদের গুণগত মান আমেরিকার তুলনায় দুর্বল। আর যেহেতু মানবসম্পদের উন্নতির জন্য শিক্ষা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই, তাই তারা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করে কিছুটা আমেরিকান মডেলে সাজিয়ে সেটাকে বাস্তবায়ন করেছে। তারা আমেরিকান মডেলকে বাছাই করেছে, কারণ তারা মনে করেছে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মান আমেরিকার চেয়ে খারাপ, যেহেতু তাদের মানবসম্পদ আমেরিকার চেয়ে দুর্বল। তাছাড়া তখন আমেরিকার প্রভাবও বেশি ছিল।

এখন আমাদের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক। পাঠকদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, বাংলাদেশের কোনো সরকার কী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এভাবে কখনো চিন্তা করেছে? এই যে আমাদের দেশের সাবেক পুলিশপ্রধান, শুনেছি সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করছেন। এতটা শিক্ষিত হওয়ার পরও তিনি যে এত দুর্নীতি করেছেন, এর পেছনের কারণ কী? এটা খুঁজতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে তিনি কি শুধু একাই এ ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, নাকি আরো অনেকে আছেন? উত্তর হচ্ছে ‘আছে’। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতিপরায়ণ। মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ব্যক্তি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, বিচারক, ব্যবসায়ী এমনকি রিকশাওয়ালারাও দুর্নীতি করেন। অনেকে হয়তো ভাবছেন রিকশাওয়ালা আবার দুর্নীতি করে কীভাবে? আমরা যখন কোনো ট্রেন বা বাস স্টেশন থেকে কোনো রিকশা বা সিএনজি ভাড়া করতে চাই, দেখবেন তারা কত বেশি ভাড়া আদায় করার চেষ্টা করছে। এটা অবশ্যই অনৈতিক, ওই ব্যক্তি তার সামর্থ্যের মধ্যেই তার সাধ্যমতো অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছে; সে কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেও একইভাবে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠত। আমি স্বীকার করছি কিছু ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু আমাদের সমাজের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ চিত্র দেখতে পারব। যেহেতু মোটাদাগে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতিপরায়ণ, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নের চালিকাশক্তি তথা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর অনেক বড় ধরনের সমস্যা আছে। আমাদের কাজ হচ্ছে, প্রথমে সেই সমস্যা কী সেটা খুঁজে বের করা, তারপর সেই সমস্যার সমাধান বের করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ কাজটা কে করবে? এটা অবশ্যই সরকার করবে। আর এজন্য সরকারের উচিত একটা শিক্ষা কমিশন গঠন করা, যার নেতৃত্ব দেবেন যারা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত, এ ধরনের ব্যক্তিরা।

আমার এ লেখার মূল বক্তব্য হলো বাংলাদেশের বর্তমান সরকারসহ বিগত কোনো সরকারই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণামূলক কোনো পরিকল্পনা করতে পারেনি। আর এজন্যই পুলিশ বাহিনীর দুর্নীতির জন্য পুলিশের সংস্কারের কমিশন গঠন হয়, আমলাদের দুর্নীতির জন্য জনপ্রশাসন কমিশন গঠন হয়। এটা মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা। এগুলো প্রমাণ করে সরকার বরাবরের মতোই সমস্যার মূলে প্রবেশ করতে পারেনি। আবার এর অর্থ এটাও নয়, ওই কমিশনগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রধান সমস্যা মানবসম্পদের নৈতিকতার অবক্ষয়, আর সেটা ঠিক করতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার (প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত) আমূল পরিবর্তন দরকার, যেখানে নৈতিক শিক্ষার অনেক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন একটা শিক্ষা কমিশন, আর এ কমিশনের কাজ হবে একটা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণামূলক পরিকল্পনা করা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Better late than never’। তাই যদিও প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার শিক্ষা কমিশন গঠন করেনি, আমি এ লেখার মাধ্যমে সরকারের প্রতি অনুরোধ করছি অতিসত্বর একটা ভালো শিক্ষা কমিশন গঠন করে তার কার্যক্রম শুরু করার জন্য। আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই, এটা ছাড়া অন্য যেকোনো পন্থা স্বল্পমেয়াদি কিছু উন্নতি সাধন করলেও বাংলাদেশ বিনির্মাণে দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যর্থ হবে।

ড. মো. আব্দুল আলীম: অধ্যাপক, ইসিই ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

(বর্তমানে শিক্ষাছুটিতে ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপে কর্মরত)