আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমৃদ্ধির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ক্রেতা সন্তুষ্টি ও গ্রাহক আনুগত্যের মধ্যে। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা নির্ধারণে গ্রাহকের আজীবন মূল্য (কাস্টমার লাইফটাইম ভ্যালু) একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের রূপরেখা এ সূচকের অবিরাম উত্থানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আর এ সাফল্যের রূপরেখাকে সুনিশ্চিত করার জন্যে কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে ক্রেতা অধিগ্রহণ খাতে খরচ কমানোর দিকে নজর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভাবনী ক্রেতা সম্পর্কের বিকাশ ঘটানোর জন্য নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে আসছে। প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মপন্থা অনুযায়ী বাজার নির্বাচন করে এবং সেই বাজারের নির্দিষ্ট গ্রাহকদের জন্য বিশেষ আর্থিক পরিষেবার পরিকল্পনা করে গ্রাহক অধিগ্রহণ করে। গ্রাহক অধিগ্রহণ খাতে খরচ এবং আজীবন মূল্যের সঠিক ভারসাম্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার পূর্বাভাস এবং বাজারে নিজের সুনাম বৃদ্ধি করতে পারে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের সমগ্র মধ্যবিত্তের ৫৪ শতাংশ এশিয়ায় বসবাস করে, যা আগামী ১০ বছরে আরো ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সমীক্ষা অনুরূপ অভিক্ষেপ জ্ঞাপন করেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমানের ২০ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণী ২০৩০ সালে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) স্থান অধিকার করবে।

নাগরিক জীবনে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গ্রাহকের সময়ের দাম অতি মূল্যবান আর তাই শহুরে গ্রাহকের ন্যূনতম প্রত্যাশা—স্থান, কাল, পাত্র নির্বিশেষে নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা। গ্রাহককে সুনিশ্চিতভাবে চিনতে শেখা, গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনের প্রেক্ষাপটে গ্রাহকভিত্তিক পরিষেবা গ্রাহক আনুগত্যের ভিত্তিপ্রস্তর।

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন শিল্পের বিকাশ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লেনদেন ও যোগাযোগ রক্ষার্থে বর্তমানের নবীন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডিজিটাল মাধ্যমেই অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। গ্রাহকের স্বাচ্ছন্দ্য সুনিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তির পরিকাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন সিস্টেমগুলোকে এক ছাতার মধ্যে নিয়ে এসে স্বয়ংক্রিয় অবিরাম তথ্য আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই একমাত্র গ্রাহকের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব।

সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রায় ৬১ শতাংশের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে তথ্যপ্রযুক্তির নীতিগত ভাবনা ও তার ব্যবহারিক সঠিক প্রয়োগের ওপর গ্রাহক অধিগ্রহণ ও পরবর্তী গ্রাহক পরিষেবাতে উৎসাহিত করছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী পদ্ধতি এবং তথ্য সংযুক্তিকরণ প্রকল্পে ২০১৮ সাল থেকে ইউরোপে অগ্রণী আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ওপেন ব্যাংকিং’ পরিকাঠামোর রীতিনীতি মেনে গ্রাহক পরিষেবার নীরব বিপ্লব এনে দিয়েছে। সরকারি ক্রেতা সুরক্ষার নিয়ম মেনে, ইচ্ছুক ক্রেতার তথ্যাদি বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে ক্রেতার জন্য উদ্ভাবনী পণ্য এবং পরিষেবা ক্রেতার দৈনন্দিন জীবনকে আরো আরামদায়ক করে তুলেছে। ওপেন ব্যাংকিং পরিকাঠামো, আর্থিক খাতে এক নতুন দিক খুলে দিয়েছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গ্রাহকভিত্তিক নতুন নতুন পরিষেবা চালু করছে।

ইউরোপ থেকে শুরু হওয়া এই নীরব বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। দেশের সামগ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো, ক্রেতা সুরক্ষা আইন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপেন ব্যাংকিং অনুরূপ পরিকাঠামোর প্রস্তুতি সেই দেশের আর্থিক খাতের বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনুকূল পরিস্থিতিতে কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, ইসরায়েল ক্রেতা সন্তুষ্টিতে ওপেন ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার নিয়ে অগ্রসর ভূমিকা নিয়েছে। বাংলাদেশের বেশকিছু বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ‘ওপেন ব্যাংকিং’ পরিকাঠামো পরিকল্পনায় নিজেদের প্রস্তুত করছে। পরবর্তী পর্যায়ে গতানুগতিক ঋণ এবং আমানতের ব্যবসার মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে, এ পরিকাঠামোকে ব্যবহার করে গ্রাহক অধিগ্রহণ এবং গ্রাহক পরিষেবা প্রদানকারী হিসেবে এদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা যাবে।

অনুমোদিত প্রতিনিধি দ্বারা গ্রাহক অধিগ্রহণ ও অর্থপ্রেরণ, বিপদমুক্ত ঋণ পরিষেবা, খেলাপি গ্রাহক শনাক্তকরণ, শাখাহীন গ্রাহক পরিষেবা—এ প্রতিটি পদ্ধতিতে ওপেন ব্যাংকিং পরিকাঠামো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী, কর্মতত্পর এবং সাবলীল করে তুলতে সক্ষম। গ্রাহক তথ্য আদান-প্রদানে গড়ে ওঠা তথ্যভাণ্ডার এবং পরবর্তীকালে সেই তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতা অধিগ্রহণ এবং পরবর্তী পরিষেবা পদ্ধতিকে আরো কার্যোপযোগী করে তুলবে।

সরকারি নীতি ও অনুরূপ পরিবেশে বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সুলভ পণ্য পরিষেবায়, বাংলাদেশের গ্রামে ইন্টারনেটের অন্তর্ভুক্তি ব্যাংকিং পরিষেবায় জোয়ার এনে দিয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি পরিকল্পনা ও নাগরিক পরিষেবাকে ব্যাংকিং ডিজিটাল পরিকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মধ্যে সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির উন্নতির রূপরেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সুনিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ওপেন ব্যাংকিং পরিকাঠামো ও ক্রেতা সুরক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রকের নিয়মাবলি অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব ডিজিটাল পরিকাঠামো সংশোধনের ভাবনাকে ত্বরান্বিত করতে আগ্রহী হলে সামগ্রিকভাবে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য আরো মজবুতভাবে প্রস্তুত করতে পারবে।

ওপেন ব্যাংকিং পদ্ধতি অবলম্বন করে তথ্য আদান-প্রদান সুনিশ্চিত করতে ব্যাংকিং সিস্টেম সরলীকরণের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগের সাহায্যে গ্রাহক পোর্টাল স্থাপন করে গ্রাহককে পরিষেবা গ্রহণে স্বাবলম্বী করে গ্রাহক পরিষেবা খাতে খরচ কমানোর বিশেষ সুযোগ আছে। এ দুই প্রক্রিয়ার সার্বিক মেলবন্ধন ও সম্পাদনের জন্য ডেভ-অপসের মতন আধুনিক পদ্ধতির অবলম্বন ও তার সক্রিয় প্রয়োগের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিকাঠামোর উন্নয়নের রূপরেখার মাধ্যমে আর্থিক পরিষেবায় তত্পরতা, গতি ও নির্ভুলতা আনতে কৌশলগতভাবে এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার অবকাশ আছে।

কৌশলগত এ প্রতিটি পদক্ষেপ একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নেয়ার আগে চাই সুচিন্তিত সুষ্ঠু পরিকল্পনা। কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন সামগ্রিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে এ প্রতিটি পদক্ষেপের বাস্তবায়ন বাংলাদেশে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম, যা জাতীয় সমৃদ্ধিতে বিপুলভাবে অবদান রাখবে।

করোনা অতিমারীর পরবর্তী সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাজারে টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সমিতি এবং কার্যনির্বাহীমণ্ডলী বর্তমান পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনী পদ্ধতির রূপরেখা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আগামী দিনের সাফল্যের পথ সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের আর্থিক উন্নতি, স্বচ্ছতা এবং মানুষের মঙ্গল অবশ্যম্ভাবী—প্রয়োজন শুধু পরিচালকমণ্ডলীর বিশ্বাস ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুরূপ পরিবেশ।

(মতামত ব্যক্তিগত)

 

অভিজিৎ চক্রবর্তী: নির্বাহী পরিচালক

প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্স