দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আশঙ্কাজনক জায়গায়। রফতানির তুলনায় আমদানি প্রায় দ্বিগুণ। আমদানি বিল মেটাতে ডলারের চাহিদা ক্রমেই বাড়তে থাকায় পড়ছে টাকার দামও। জাতীয় অর্থনীতির গভীর অসুখ ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। রোববার আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাণিজ্য ঘাটতি আশঙ্কাজনক। ক্রমবর্ধমান এ ঘাটতি যদি জিডিপির ৪ শতাংশ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটবে। বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে মূলত আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া। সে তুলনায় রফতানি বাড়েনি, যদিও আগের চেয়ে বেড়েছে গত অর্থবছর। কিন্তু বৈশ্বিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার বিনিময় হার বেড়ে গিয়েছে। এ কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়েছে টাকার অংকেও। অন্যদিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়েনি। আমদানি ব্যয় কমিয়ে এনে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিন্তু তার বড় প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এলসি খোলা কঠিন হলেও উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসের সিট ফাঁকা থাকছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে নেয়া উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাব্য উৎস সন্ধানে আরো সক্রিয় হতে হবে।

সরকার এরই মধ্যে কিছু নীতি গ্রহণ করেছে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে, যেমন নতুন গাড়ি ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বিলাসপণ্যের আমদানিতে লাগাম টেনে ধরতে জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্য আমদানি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এর পরও আমদানি কমছে না। সাধারণভাবে অর্থনীতিতে আমদানি বাড়াকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়ে থাকে। বলা হয়, আমদানি বাড়লে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এতদিন বিশেষজ্ঞরাও সেটা বলে এসেছেন। কিন্তু এখন অসহনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ৫০ শতাংশ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা দেশের অর্থনীতির নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কথা সত্য, শিল্প খাতের বিকাশ ঘটাতে হলে আমদানি বাড়বে। আমদানি বাড়লে রফতানিও বাড়তে হবে। কিন্তু দেশে আমদানি যে হারে বাড়ছে, ওই হারে রফতানি বাড়ছে না। এমনকি আমদানির বিকল্প শিল্প পণ্যের উৎপাদনও যে খুব বেশি বাড়ছে তা বলা যাবে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। স্বল্পোন্নত দেশে বাণিজ্য ঘাটতি থাকবে। তার একটি সহনীয় মাত্রা থাকতে হবে। কিন্তু দেশে বেশি মাত্রায় এ ঘাটতি বাড়ছে। ডলারের যে সংকট এর নেপথ্যেও বাণিজ্য ঘাটতির ভূমিকা রয়েছে। নেপাল, থাইল্যান্ডে ঘাটতি বেশি হলেও ওইসব দেশ রেমিট্যান্স ও পর্যটন খাত দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশ আগে রেমিট্যান্স দিয়ে ঘাটতি মেটাতে পেরেছে। ফলে ডলারের বড় সংকট হয়নি, কিন্তু এখন পারছে না। আর পর্যটন বা অন্য খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে খুবই কম।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন। তারা সুদের হার বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তাতেও খুব একটা সুফল মিলছে না। দেশগুলো রফতানি ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাড়তি জোর দিয়েছে। তার পরও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের বৃদ্ধি। কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে পুনরুদ্ধার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। দ্রুতগতিতে বেড়েছে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। বিধিনিষেধ শিথিলের পর তৈরি হয় তুমুল ভোক্তা চাহিদা। পাশাপাশি সরকারের দেয়া বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা বাড়িয়ে দিয়েছে ভোক্তা ব্যয়। এ অবস্থায় চাহিদা মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে। ফলে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হারে পতন অব্যাহত। অস্থিতিশীল রয়ে গিয়েছে জ্বালানির বাজারও। ফলে আমদানিতে আরো বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে জাপানকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতি মাসে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ভেঙে চলেছে। বাংলাদেশকে তাই আগে থেকেই সজাগ থাকতে হবে।

বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সীমিতসংখ্যক দেশ ও সামান্য কিছু পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর হয়ে রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০০ পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি পণ্য থেকে আসে মোট রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি। তৈরি পোশাক শিল্প পুরোপুরি আমদানীকৃত কাঁচামালনির্ভর। ফলে এ খাত জাতীয় অর্থনীতিতে মাত্র ৬০-৬৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে। অথচ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য বেশি পরিমাণে রফতানি করা গেলে এ খাতের আয় যেমন বাড়ত, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক মূল্য সংযোজন হতে পারত।

বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি বাজারগুলো হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, চীন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশের অর্থনীতি রফতানিনির্ভর। এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলে দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানসহ সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে রফতানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে করণীয় নির্ধারণসহ পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রফতানি পণ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়ই। অনেক বাধা-বিপত্তির কারণে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে রফতানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরো নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রফতানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

আগামীতে রফতানি বৃদ্ধি উদ্যোগের পাশাপাশি আমদানি ব্যয় কমানোর চেষ্টা করতে হবে। সরকার অবশ্য এক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি রফতানি নিষিদ্ধ পণ্য তালিকা ১২ থেকে ২৬টিতে উন্নীত করা হয়েছে। ১২৩টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ২৭ ধরনের তুলনামূলক স্বল্প প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ৭৫ থেকে শতভাগ এলসি মার্জিন আরোপ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে অপ্রয়োজনীয় বিলাসপণ্য আমদানি কিছুটা হলেও কমে আসবে। মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেকেই মনে করছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার হচ্ছে। মার্কিন ডলারের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে এটাও একটি কারণ। বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। আগামী বছরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় নির্বাচনের সময় অর্থ পাচার বেড়ে যায়, বিগত সময়ে দেখা গিয়েছে। তাই এ ব্যাপারে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আরো সতর্ক থাকতে হবে।