দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক সুফল লাভের উপায় হিসেবে দেখে আসা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) উদীয়মান নতুন স্নায়ুযুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহূত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।

এশিয়া ভরকেন্দ্র নীতি, চীনকে নিয়ন্ত্রণ

২০০৯ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা মন্তব্য করেন, একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে শক্তিকে শূন্য সমষ্টির খেলা বানানোর প্রয়োজন নেই...মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। কিন্তু ওবামা অবিলম্বে ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র নীতি’র গতিপথ পরিবর্তন করেন, যা প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১১ সালের নভেম্বরে। ২০১২ সালে তার পুনর্নির্বাচনের পর চীনের প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রতিহত করার জন্য ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। 

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) দাবি করেছিলেন, টিপিপি তৈরি করা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে, যেমন মেধা সম্পদ সুরক্ষা (আইপি) ও মানবাধিকার। যদিও দাবি করা হয়, এর নীতিমালাগুলো মান্যকারী সবাইকেই এতে যোগদানের জন্য স্বাগত জানানো হবে, তবে চীন স্পষ্টতই টিপিপি নিয়ে আলোচনাকারী দেশগুলোর মধ্যে ছিল না।

চীনের সঙ্গে নব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওয়াশিংটনের জন্য গড়ে উঠেছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মার্কিন জোট। ২০১১ সালের অক্টোবরে মার্কিন কংগ্রেস কোরিয়া-ইউএস (কেওআরইউএস) এফটিএ অনুমোদন করেছে।

২০১৫ সালে চীনকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রভুক্ত করে টিপিপি সমাপ্ত করা হয়। ওবামা জোর দিয়ে বলেন, চীনের মতো দেশগুলো নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই টিপিপির মাধ্যমে একুশ শতকের বিধিমালা লিখবে।

টিপিপি প্রতিষ্ঠার মার্কিন উদ্দেশ্যই ছিল একটি ‘চীনবিরোধী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন জনমতের পরিবর্তিত অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে ওবামার একসময়ের অনুগত ভাইস প্রেসিডেন্ট, বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকে এ পর্যন্ত টিপিপিকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো পদক্ষেপ নেননি।

নিরাপত্তা জোট

‘একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপটে আমেরিকান সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বারা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আমাদের নীতিগুলো যাতে বিরাজমান থাকে এবং বিধিগুলো যাতে আমাদের অর্থনীতির উন্নতির জন্য প্রয়োগ করা হয় তা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই সমমনা মিত্রগোষ্ঠী ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে’—সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে উল্লেখিত।

তদনুসারে ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরে সুনামির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের সামুদ্রিক সহযোগিতার জন্য কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগের (কোয়াড) যাত্রা হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি চীনবিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

২০২০ সালের মধ্যেই এ চার দেশের নেতারা চীনের উত্থান নিয়ে তাদের উদ্বেগের জায়গা থেকে আরো সংঘবদ্ধ হয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে চারটি দেশের নৌবাহিনী একটি যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়, যা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম।

এদিকে শিনজো আবের অধীনে জাপান তার নিরাপত্তা নীতির আমূল পরিবর্তন এনেছে। শিনজো আবে মার্কিন-জাপান জোটের অভ্যন্তরে এবং তার বাইরে, বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ায় জাপান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভূমিকা, মিশন ও সক্ষমতা ব্যাপক প্রসারিত করেছেন।

এরই মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনা যথা সাম্প্রতিক জাপান-অস্ট্রেলিয়া পারস্পরিক প্রবেশসংক্রান্ত চুক্তি এবং আগের জাপান-ভারত অধিগ্রহণ এবং ক্রস সার্ভিসিং চুক্তির মাধ্যমেও ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা’ বর্ধিত ও সমৃদ্ধ করা হয়েছে।

এ অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তা পরিলেখ অকাস (অস্ট্রেলিয়া-ইউকে-ইউএসএ) জোটের মাধ্যমেও বেড়েছে। এর স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, যার মধ্যে ‘চীন কেন্দ্রীভূত’ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মুখ্য।

বিশ্ব আধিপত্য

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করছে, বিশেষ করে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। ইউএসটিআর অনুযায়ী ‘বাইডেন প্রশাসন তার সামগ্রিক কৌশল তৈরির অংশ হিসেবে চীনের প্রতি মার্কিন বাণিজ্য নীতির একটি সর্বাঙ্গীণ পর্যালোচনা করছে।’

চীনা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় সাম্প্রতিক সময়ে নেয়া বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের চেয়ে একটি সামগ্রিক কৌশল এবং আরো নিয়মানুগত পদ্ধতির প্রয়োজন হবে বলেও যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলগত নির্দেশিকায় জোর দেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তার স্থায়ী সুবিধাগুলো নবায়ন করতে হবে, সামরিক সক্ষমতা আধুনিকীকরণ এবং মার্কিন জোট ও অংশীদারত্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘চীন রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের জীবনের প্রতিটি দিককে পুনর্বিন্যাস করছে।’

প্রেসিডেন্ট বাইডেন জোর দিয়ে জানান, তার প্রশাসন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নিয়ম যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ঝুঁকে না পড়ে তা নিশ্চিত করবে। তারা বিদ্যমান বাণিজ্য নীতি জোরদার করবে এবং নতুন নিয়ম তৈরি করবে। এ এজেন্ডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে এবং তাদের চীন বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় জয়ী করবে।

তার প্রশাসন ট্রাম্প শাসনামলের সব বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে একটি কার্যক্রম ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ‘আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি’ আইন ২০০০ সাল থেকে যোগ্যতাসম্পন্ন আফ্রিকান দেশগুলোকে বর্ধিত মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে।

২০২১ সালের এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন নিশ্চিত করেছেন, ইউএস-কেনিয়া এফটিএ বা ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ আলোচনা আবার শুরু হবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ২০২০ সালে ট্রাম্পের নেয়া উদ্যোগ ইউএস-কেনিয়া এফটিএ চীনকে মোকাবেলা করতে মহাদেশে মার্কিন ‘পুরস্কার ও তিরস্কারের’ বাণিজ্য পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা নীতি প্রসারিত করতে সাহায্য করবে।

মার্কিন ‘মোনরো ডকট্রিন ব্যাকইয়ার্ড’ নীতি এরই মধ্যে ছয়টি মার্কিন এফটিএর মাধ্যমে ১২টি লাতিন আমেরিকান ও ক্যারিবীয় দেশকে জড়িত করেছে। গত ৮ জুন বাইডেন চীনকে মোকাবেলার একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত একটি শীর্ষ সম্মেলনে তার উদ্বোধনী বক্তৃতা সমালোচিত হয়েছিল চীনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে বাদ দেয়ার জন্য।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মার্কিন অংশীদারিত্বকে এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হচ্ছে। এমনকি এফটিএর মানসম্পন্ন শুল্ক সুবিধা না দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে সমমনা অংশীদারদের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে। যদিও প্রেসিডেন্ট বাইডেন ‘দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সমন্বিত নতুন পদ্ধতি’কে প্রশংসার সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছেন। এ প্রতিক্রিয়া থেকে ‘ক্ষীয়মাণ’ মার্কিন প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। এখন ট্রাম্পের টিপিপি থেকে বের হয়ে আসার পাঁচ বছর পর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ওবামার চীন কৌশলকে পুনরুজ্জীবিত করছেন বাইডেন। আত্মতৃপ্তির জায়গা থেকে তিনিও প্রেসিডেন্ট ওবামার মতো টিপিপি নিয়ে গর্ব করে বলেছেন, আমরা নতুন নিয়ম লিখছি।

 

আনিস চৌধুরী: অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির খণ্ডকালীন অধ্যাপক

জোমো কোয়ামে সুন্দরম: মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক সাবেক সহকারী মহাসচিব