গত তিন বছরে প্রাণঘাতী ভাইরাস কভিড-১৯ সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারীর প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, শিল্প-উত্পাদনসহ গোটা অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশের শ্রমজীবী মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের আয়-উপার্জন কমে যাওয়া, শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ার ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন কাটে চরম ঝুঁকিতে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি, যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এসব পরিস্থিতির বড় শিকার প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের জন্য একটি বড় শ্রমবাজার হলেও সেখানে এমনিতেই নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন, আসছেন। যারা আছেন তারাও এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ও বিরূপ পরিস্থিতিতে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিপ্রত্যাশী শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোয় শ্রমজীবী মানুষ আরো গভীরভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা, কিন্তু দেশের শ্রমবাজারে শ্রমিকের জীবন ধারণ ও বাঁচার মতো মজুরি এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এরই মধ্যে ১০টি কর্মক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে, আরো ১১টি কর্মক্ষেত্রের জন্য সুপারিশ প্রক্রিয়া চলমান। তবে শ্রম আইনকে সংশোধন করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একে শ্রমিকের জন্য যুগোপযোগী করার যে প্রয়োজনীয়তা ছিল, শ্রম আইনের সর্বশেষ সংশোধনীতে সে আশা-আকাঙ্ক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি।
দেশের সংবিধান ও আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার সর্বক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা দরকার, কেননা কার্যকর শ্রম সম্পর্ক বাস্তবায়নের এটিই একমাত্র উপায়। কেবল সংগঠিত শ্রমিকই পারে তার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বিবিধ-বাধা ও বিধি-নিষেধের বেড়াজাল এবং চাকরিচ্যুতির ভয়ে ইউনিয়ন ও সদস্যসংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। ভীতিহীন এবং বাধামুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উপায় না থাকলে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে না। একই দেশে কর্মরত শ্রমিকের জন্য শ্রম আইন ও ইপিজেড শ্রম আইন নামে পৃথক দুটি আইন থাকার কারণে মূলত শ্রমিকদের সংগঠিতকরণে বৈষম্যের বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ইপিজেড শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়নের বদলে শ্রমিক কল্যাণ সমিতিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রম আইন নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরে এবং তাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে বাধা অপসারণের প্রতিশ্রুতি দেয় ঠিকই কিন্তু দেখা গিয়েছে, সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকের বাধা রয়েই যায়। ট্রেড ইউনিয়ন করলে শ্রমিকের চাকরিচ্যুত হওয়ার যে শঙ্কা রয়েছে তা দূর করতে না পারলে শ্রমিকের সংঘবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়।
দেশের রফতানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পোশাক শিল্পের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ট্রেড ইউনিয়নের এক দশকের আন্দোলনে ২০১৮ সালে এ খাতে সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা মজুরি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত মজুরি কাঠামোর কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এতে দেখা যায় কোনো কোনো গ্রেডে শ্রমিকদের মূল মজুরি কমে গিয়েছে। মূল মজুরির ভিত্তিতেই যেহেতু শ্রমিকরা ওভারটাইমের টাকা পান, সুতরাং মূল মজুরি কমার কারণে শ্রমিকের ওভারটাইম যদি কমে যায় তাহলে সেটি তারা কীভাবে গ্রহণ করবেন? তাছাড়া যেকোনো আইনি কাঠামো বা মজুরি কাঠামোতেও এমনটা কখনো হওয়ার কথা না যে শ্রমিকের প্রাপ্য সুবিধা কমে যাবে। তবে বাস্তবে সেটিই হয়েছে। এক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সেটি শ্লথ গতিসম্পন্ন হয়ে গিয়েছে।
করোনাকালীন সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রায়াত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ও কর্মরত ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিককে অবসর প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। এসব পাটকল বন্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকারি পাটকল যুগের অবসান ঘটে আর স্থায়ী শ্রমিকরা চাকরি হারান। গৌরবময় পাট শিল্পের এ পরিস্থিতি সমগ্র দেশবাসীকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে। একসময় বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ছিল পাট। এ শিল্পের ছিল গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পাট শিল্পের ট্রেড ইউনিয়ন ছিল দেশের অন্যতম শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন। এ শিল্পের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রের অধিকারের সংগ্রাম জড়িত থাকার কারণে দেশের কোনো মানুষই এ শিল্পের ক্ষতি মেনে নিতে পারে না।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এসে দেখা যায়, দেশের শ্রমবাজারে অস্থায়ী শ্রমিক এবং শ্রমিক আউটসোর্স করার প্রবণতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে যোগাযোগ, সেবা খাত ও বিভিন্ন সরকারি খাতে। দেশের শ্রম খাতের বড় একটি অংশই যেখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক, সেখানে আউটসোর্সিং এবং অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের এ প্রবণতা বাড়তে থাকলে খুব স্বাভাবিকভাবেই হুমকির মুখে পড়বে তাদের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার অধিকার। এ কথা ঠিক, বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে পরিবর্তিত হচ্ছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যার বড় প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং এ প্রতিযোগিতায় নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। তবে যে কারণে সৃষ্টি হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের, সেই রোবটিক্স ও অটোমেশনের কারণে একদিকে যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে শ্রমিক, অন্যদিকে নতুন কর্মদিগন্তও খুলে যাবে। তাই প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়নের। শ্রমবাজারের জন্য দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ। আর এ বিষয়ে সরকার ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এ ভূমিকা পালনে দেশের জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলোকে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের সহযোগিতা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এখন থেকেই এগিয়ে আসার প্রয়োজন।
গত এক দশকে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। সুতরাং শ্রমবাজার সংকোচন যে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এতে সন্দেহ নেই। বিষয়টিকে মোকাবেলা করতে সরকারকে কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সময়োপযোগী এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
করোনাকালীন ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনপূর্ব ঘটনাপ্রবাহের কারণে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও এ সময়ের মধ্যে তারা বিভিন্ন প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রচার, প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও সেবা কার্যক্রম ভার্চুয়াল ও হাইব্রিড উপস্থিতির মাধ্যমে অব্যাহত রেখেছে। শ্রম ইস্যুতে বিভিন্ন ওয়েবিনারের আয়োজন করে নীতিনির্ধারক, মালিক পক্ষ, ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজের সুপারিশ গ্রহণ করে তা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বিল্স অ্যাডভোকেসি ও লবি জোরদার করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেটওয়ার্কের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করে গিয়েছে।
কভিড ও কভিড-পরবর্তী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর গবেষণা ও তথ্যসেবা কার্যক্রমের পরিধি বেশ এগিয়েছে, যার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিল্সসহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নসহায়ক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ। গবেষণার মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতিমালার পর্যালোচনা ও ট্রেড ইউনিয়নের কৌশল প্রণয়ন, বিদেশফেরত নারী অভিবাসীদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থানে কভিড-১৯-এর প্রভাব, করোনা মহামারীর বাস্তবতায় শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা, করোনা মহামারীর বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের চাকরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা, বাংলাদেশের সামুদ্রিক মত্স্যজীবীদের সেক্টরভিত্তিক মানবাধিকারবিষয়ক প্রভাব নিরূপণ, পাট শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনা, যৌথ দরকষাকষি চুক্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আগামী দিনে শ্রমজীবী মানুষ ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে রয়েছে অনেক সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রবাসের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। শ্রমিকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের শ্রমবাজারে এরই মধ্যে এ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবাসে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকদের শ্রম অধিকার রক্ষায় জোরালোভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
২০২৬ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রয়োজন জাতীয় ন্যূনতম মজুরিকে একটি যথার্থ মানে উন্নীত করা, সরকারি ও বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য ঘুচিয়ে আনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এছাড়া কর্মসংস্থানের সুযোগ ও নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, শোভন কর্মক্ষেত্র নিশ্চিতকরণসহ অস্থায়ী কাজ দূরীকরণের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে। সব ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়া এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে শ্রমজীবী মানুষের জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
লেখক: শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলেস উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত










