সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটির স্বজাত উদ্ঘাটন একান্ত জরুরি। যখন মিডিওক্রিটির জঞ্জালে ছেয়ে গিয়েছে আমাদের শিল্পাঙ্গন, যখন উপরিগত আর প্রায় সারশূন্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দাবিতে মুখরিত হয় আমাদের বিদ্যাঙ্গন, যখন শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে না ছুটে সংখ্যাধিক্যের নেশায় মেতে ওঠে পুরো সমাজ, তখন খাঁটি সৃজনশীলতার খোঁজ যে আমাদের করতেই হবে। প্রতীচ্য যে এ অভিশাপগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত সে কথা বলব না। তবে সেখানে প্রকৃত সৃজনশীলতা চর্চার আঙিনাটি তৈরি হয়েছে ও তা সংরক্ষিত হয়েছে কমপক্ষে কয়েক শতাব্দী। আমাদের সমাজে প্রতিযোগিতার দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে সৃজনশীলতা প্রায় হারিয়ে যেতে ধরেছে। এভাবে চলতে থাকলে আরেকজন রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কিংবা জগদীশ চন্দ্রের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে।

সৃজনশীলতার সংজ্ঞা দিয়েছেন হালের কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট মার্গারেট বোডেন। তিনি তার The Creative Mind: Myths and Mechanisms (২০০৪) গ্রন্থে একে ব্যাখ্যা করছেন এভাবে—যেকোনো চিন্তা বা শিল্পকর্ম তখনি সৃজনশীল হয়, যখন তা সম্পূর্ণ নতুন, উৎসাহ-উদ্গারী ও প্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। সৃজনশীলতার চিহ্নিতকরণে বোডেনের তিনটি রূপকে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ক্রিয়েটিভিটি হতে পারে (১) এক্সপ্লোরেটোরি বা অনুসন্ধানমূলক, (২) কম্বিন্যাটোরিয়াল বা সমন্বয়-সূচক ও (৩) ট্রান্সফরমেশনাল বা যুগান্তকারী। ধ্রুপদী গবেষণা কিংবা শিল্পসৃষ্টি অনুসন্ধানমূলক সৃজনশীলতার পথ অনুসরণ করে; অর্থাৎ এযাবত যা আবিষ্কৃত হয়েছে বা সৃষ্টি করা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে নতুন ধারণা বা শিল্পের জন্ম দেয়া। এ ধরনের সৃষ্টি সাধারণত ইনক্রিমেন্টাল হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। অন্যদিকে একাধিক জ্ঞান বা সৃষ্টি ক্ষেত্রের যখন সমন্বয় ঘটে তখন নতুন ধারণা বা শিল্পের জন্ম হয়। এ কম্বিন্যাটোরিয়াল সৃষ্টিতে বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এমনকি শিল্পের (যেমন নতুন ধারার চিত্রকর্ম কিংবা সংগীত) জাগরণ হয়ে চলেছে নিত্য। তৃতীয় ধারার সৃজনশীলতা যুগান্তকারী; অর্থাৎ একটি ‘স্পার্ক অব জিনিয়াসই’ কেবল এহেন সৃষ্টির জন্ম দিতে পারে। এভাবেই হয়তো লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট কিংবা বাঁধা হয়েছে মোত্জাটের জুপিটার সিম্ফোনি কিংবা চিত্রিত হয়েছে পিকাসোর গুয়ের্নিকা। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন সৃজনশীলতার উত্কর্ষে ইন্ধন জোগাব আমরা? সরকার এখন বাংলাদেশে গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে, যা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সৃজনশীল গবেষণা ক্ষেত্র তৈরির জন্য এর চরিত্রকে বুঝতে হবে।

আমার মতে, বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য একটি সুস্থ ও সৎ ভাবনাক্ষেত্র তৈরি আবশ্যক। এজন্যই প্রথমেই বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বের নামি জার্নালে দেশব্যাপী একসেস থাকা প্রয়োজন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এমনটি করা হয়েছে। এতে করে হালের বৈজ্ঞানিক স্থিতি সম্পর্কে দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছুক ছাত্র ও গবেষকরা অবগত হতে পারবেন। অনুসন্ধানমূলক সৃজনশীলতার প্রথম ধাপের দিকে এগুবে দেশ। দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রিভিউর সংস্কৃতি বিনির্মাণ একান্ত জরুরি। বিষয়-বিশেষজ্ঞদের রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট যথাযথ মূল্যমান অর্জন করতে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, গবেষণায় জাতীয় অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে, যাতে করে সমন্বয়-সূচক কম্বিন্যাটোরিয়াল সৃষ্টির পথ সুগম হয়। কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ক্ষেত্রই নয়, শিল্প ক্ষেত্রেও সৃজনশীলতার মৌলিক সুরকে গেঁথে দিতে হবে। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শিতা অর্জনকে উৎসাহ দিতে হবে। যে গায়ক সেই নায়ক কিংবা চিত্রকর হয়ে আবির্ভূত হবে, এ ধারণার অবসান প্রয়োজন। দেশ যেন আজ বহু প্রতিভাসম্পন্ন মেকি দ্য ভিঞ্চিতে ভরে গিয়েছে। মনে রাখতে হবে, যেকোনো বিষয়ে পারফেকশন আনা সমাজের মেরুদণ্ডে স্থাপিত হওয়া চাই। ভুলেভরা বই, অসংলগ্নভাবে আঁকা চিত্রকর্ম, দামি ক্যামেরায় তোলা মিডিওকার স্থিরচিত্র কিংবা প্রায় চিন্তাশূন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের অবসান অতি আবশ্যক। গুণগত উত্কর্ষই যেন হয় আমাদের ব্রত। তবেই আরেকজন নজরুল কিংবা আরেকজন জয়নুল অথবা আরেকজন জীবনানন্দকে লালন করবে সমাজ।

শৈল্পিক সৃজনশীলতায় উৎসাহ দিতে গিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য ভুলকে তাড়া করে ফিরি আমরা। এটি ধরে নেয়া হয় যে যারা শিল্পীমনের, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আবশ্যকতা নেই। প্রথাগত শিক্ষা ও পেশার দিকে ঝোঁকার মানেই হচ্ছে সৃজনশীলতার মৃত্যু ঘটল। তাই শৈল্পিক সৃজনশীলতায় প্রণোদনা দিতে গেলে নতুন প্রজন্মকে প্রথাগত পথ ছেড়ে তথাকথিত ‘মুক্তচিন্তা’য় নিমগ্ন হতে হবে। পাঠ্যপুস্তককে পাশ কাটিয়ে মন দিতে হবে প্রতীচ্য আর প্রাচ্যের স্বল্পশ্রুত বইয়ের পাতায়। এ ধারা একান্তই ভ্রান্ত। এ কথা মানছি, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে পড়াশোনা করা একান্ত আবশ্যক। তবে পাঠ্যকে বাদ দিয়ে এ অর্জন সম্ভব বলে বোধ হয় না। আমি স্বীকার করছি বহু মনীষী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার বাইরে থেকে মহান সৃজনশীলতার নজির রেখেছেন। তবে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রগতির কথা বলা হচ্ছে, অনন্যসাধারণ প্রতিভার কথা নয়। প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই পরিমার্জন আনতে হবে, যাতে বই পড়ায় উৎসাহ পায় আমাদের তরুণরা। ঢাকার রাজপথে, আন্তঃনগর রেলে কিংবা স্টিমারে বা ফেরিতে ক’জন পাঠক চোখে পড়ে? বইয়ের প্রকাশনা সংস্থাগুলো কেন হাঁপিয়ে উঠছে বাংলাদেশে? একজন সংগীতে অনার্স পাঠগ্রহণকারী ছাত্রের জানতে হবে মৌলিক গণিত ও কম্পিউটার কৌশল।

এখানে স্মরণ করছি মহান সুরগ্রষ্টা Johann Sebastian Bach-কে। তিনি সতের শতকে গাণিতিক ছকে সুর রচনা করতেন। Bach-কে প্রথম কম্পিউটার Coder হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। প্রতীচ্যে, সুর সৃষ্টির প্রশিক্ষণে Bach-এর সৃষ্ট প্রতিসাম্য (বা Symmetry) ও গাণিতিক শৃঙ্খলার lesson দেয়া হয়। মানব মস্তিষ্ক সুরে প্যাটার্ন চিহ্নিত করতে পারে। তাই মহান কালজয়ী সুর হয় সুবিন্যস্ত আর তাই সুশ্রাব্য। বিখ্যাত গণিতজ্ঞ Leibniz বলছেন: “Music is the pleasure the human mind experiences from counting without being aware that it is counting.” যেমন প্রতীচ্যের সংগীত ক্লাসে রেনেসাঁকালীন স্টাইল Polyphony উপস্থাপন করা হয় সুরের গাণিতিক ফর্মকে ব্যাখ্যা করতে। এ স্টাইলে একটি খণ্ড সুর তিনটি লয়ে বাজানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ যদি আদি লয়ী হয় অন্য লয়দুটো 2x ও 1/2x এ বাজানো হয়; অর্থাৎ আদি লয়ের দ্বিগুণ কিংবা অর্ধগতিতে। এহেন প্যাটার্ন মানবমস্তিষ্ক চিহ্নিত করতে পারে এবং পুনর্বার লয় পরিবর্তন করে, একটি খণ্ড সুর থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পোজিশন রূপ নিতে পারে। সংগীতের ছাত্রকে যে তাই জানতে হবে গণিত আর গণিতের ছাত্রকে সাহিত্য। সামগ্রিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে আরেকজন সলিল চৌধুরী, যামিনী রায় আর জগদীশচন্দ্র বসুর পুনর্জন্ম দিতে।   

আমরা বৈজ্ঞানিক প্রগতির এমন একটি যুগে বাস করছি যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে কিনা সে প্রশ্ন উঠছে। যন্ত্র কি সৃজনশীল হতে পারে? যদি কবিগুরুর সব সাহিত্যকর্ম স্ট্রিং ডাটা হিসেবে কিংবা পিকাসোর সব চিত্রকর্ম পিক্সেলেটেড ডাটা হিসেবে কম্পিউটারকে শেখানো যায় তবে কি যন্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে নতুন রবীন্দ্র সাহিত্য কিংবা আনকোরা নতুন পিকাসোর শিল্পকর্ম সৃজন করতে সমর্থ হবে? এ প্রশ্নগুলো ছুড়ছেন গণিতবিদ Marcus Du Sautoy তার The Creativity Code গ্রন্থে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Sautoy গাণিতিক অ্যালগোরিদমের ভিত্তিতে এর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলছেন, যন্ত্রকে প্রশিক্ষণ বা ট্রেইন করতে হলে উপাত্তের ব্যবহার অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ যন্ত্র যদি উপাত্ত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয় তবে সে উপাত্তের ভিত্তিতে, অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে নতুন উপাত্ত তৈরি করতে সক্ষম হবে। এভাবে অনুসন্ধানমূলক কিংবা সমন্বয়সূচক সৃজনশীল সৃষ্টি যন্ত্রের পক্ষে করা তাই অসম্ভব নয়। তবে একেবারে আনকোরা নতুন যে তথ্য বা উপাত্ত যন্ত্রের জানা নেই, তার উদ্ভাবন কিংবা যুগান্তকারী কোনো নতুন আবিষ্কার করার ক্ষমতা যন্ত্রের আছে কিনা সে বিষয়ে Sauto সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, কেবল গুণী মানুষের পক্ষেই ট্রান্সফরমেশনাল উদ্ভাবন বা সৃষ্টি সম্ভব তার স্পার্ক অব জিনিয়াস-প্রয়োগ করার মাঝ দিয়ে।

আজ তাই শুদ্ধাচারী মানুষ গড়ার কাজে মন দেয়া চাই। মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে, যাতে আগামীর কুশলী যন্ত্রের কাছে পরাভূত না হই আমরা। আমরা এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করি যেখানে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী তার সব সৃজনশীলতাকে প্রয়োগ করে একটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা নেবে। সমাজ এমন নিখুঁত চেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করবে। তবে সে শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রটিতে থাকা চাই একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে অঙ্কনশৈলী আর সারগামের পাশাপাশি স্থাপন করা হবে গণিত আর পদার্থবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর। স্পার্ক অব জিনিয়াস জোর করে আসে না, তবে এ স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলনের জন্য যথাযথ পরিবেশ তো তৈরি হওয়া চাই! 

 

ড. নাভিদ সালেহ: অধ্যাপক, পরিবেশ প্রকৌশল অনুষদ  ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন, যুক্তরাষ্ট্র