সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি একটা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নীতি হাতিয়ার। এটি শুধু ভোগকে মসৃণ করে না, দারিদ্র্য ও অসমতা কমায় এবং সামষ্টিক চাহিদা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির গতিও ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে এটি একটা বড় নীতি প্রণোদনা। স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সাধারণত বিভিন্ন সংকট (যেমন বাজার ব্যর্থতা, বন্যা ও খরা এবং বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রয়োজন) ঘিরে আবর্তিত ও প্রবর্তিত হয়। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জিডিপির প্রায় ২-৩ শতাংশ ব্যয় করে এবং এসব কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩৫ শতাংশ নাগরিক রয়েছে। ২০১৫ সালের আগে এ কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য ছিল দরিদ্রদের জন্য ত্রাণ সম্প্রসারণ। বলতে গেলে ২০১৫ সাল ছিল বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটা ‘গেম চেঞ্জার’ বর্ষ। ওই বছরই জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস) প্রণয়ন ও অনুমোদন লাভ করে। আলোচ্য কৌশলে দরিদ্রদের ত্রাণ ব্যবস্থাটি পুরোপুরি পরিবর্তন করে সেটিতে জীবন চক্রভিত্তিক ঝুঁকির বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এনএসএসএসে নতুন কৌশল নিয়ে বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ সুগম করা হয়। নজর দেয়া হয় কর্মসূচি সংহতকরণ, বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গে সুফলভোগীদের আওতা সম্প্রসারণ, ডিজিটালাইজড সামাজিক ও সুফলভোগী নিবন্ধন এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা প্রণয়নে। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপও তৈরি করা হয়। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এনএসএমএসের সংস্কার অগ্রগতি বেশ ধীর।
এনএসএসএস অনুমোদনের প্রায় এক দশক পরও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এখনো ১০০টির বেশি কর্মসূচি রয়ে গিয়েছে। সেগুলোর বেশির ভাগই ক্ষুদ্র। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় ‘এক্সক্লুশন এরর’ আছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এটি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা না পৌঁছানোর বার্তা প্রদান করে। সেখানে আরো রয়ে গেছে বড় ধরনের ‘মিসিং মিডল’-এর সমস্যা। এর অর্থ হলো নাজুক ৫০-৬০ শতাংশ নাগরিকই সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসেনি। সরবরাহ (বাজেট বরাদ্দ) এবং চাহিদার (জীবনচক্রভিত্তিক গ্রুপগুলোর) মধ্যেও বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৪৯ শতাংশের কাভারেজ গ্যাপ (ব্যবধান) এবং ২৯ শতাংশের সম্পদের গ্যাপ (ব্যবধান) প্রকাশ পায়। কার্যক্রমটি জনমিতিক পরিবর্তন এবং দারিদ্র্যের নগরায়ণের সঙ্গে একীভূত হয়নি। ফলে এটা বার্তা দেয় যে প্রতি আটজন দরিদ্র পরিবারের একজন শিশু সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ নগর দরিদ্রের মাত্র ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা ভাতা লাভ করে। জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ বিনিয়োগের প্রাক্কলিত ব্যয়ের কার্যকারিতা মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য নেয়া কর্মসূচির প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে। কভিডের সময়ে বৈশ্বিক ব্যবস্থা শুধু নজিরবিহীনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, নতুন ধরনের নাজুকতার রেকর্ডও প্রত্যক্ষ করেছে, যা গতানুগতিক কর্মসূচি দিয়ে প্রতিকার করা যেত না। মহামারী সংকটের সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের উদ্ভব হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নেয়া সাময়িক মূল আয় সহায়তা (টিবিআই) একটা উদ্ভাবনী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ কর্মসূচি সাজানো হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতের নাজুক নারীদের লক্ষ্য করে।
বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি সময় নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে নাকি সংস্কারের দুর্বল প্রচেষ্টার স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে তার মধ্যে পছন্দ নির্ণয়ের ক্রসরোডে রয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটের বিপরীতে এ লেখায় বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এজেন্ডাকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে যেহেতু মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার চেষ্টা করছে, সেহেতু দেশটির সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যেখানে কেউ বাদ পড়বে না।
বাংলাদেশকে অবশ্যই এনএসএসএস নির্দেশিত অসমাপ্ত সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে কভিড-১৯ সংকট থেকে উদয় হওয়া নতুন বাস্তবতায় (নারী, শিশু, প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের ক্ষেত্রে) এনএসএসএসের পুরোপুরি বাস্তবায়নে শতভাগ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত নাও করতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাটি শক্তিশালী করার জন্যও কিছু বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া দরকার। এক. সুফলভোগী নিবন্ধনে গতিশীল ডিজিটাল ডাটা সিস্টেমের ওপর জোর দিতে হবে। দুই. ভৌগোলিক, জনমিতিক ও কমিউনিটিভিত্তিক টার্গেটিংয়ের ভিত্তিতে কাঙ্ক্ষিত সুফলভোগী নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন। তিন. সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল সমতার ওপর নজর দিয়ে জিটুপির কাভারেজ বাড়াতে হবে। চার. লিঙ্গ সংবেদনশীল এবং রূপান্তরমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে জেন্ডার মেইনস্ট্রমিং করা। পাঁচ, সোশ্যাল অ্যান্ড বেনিফিশিয়ারি রেজিস্ট্রি ব্যবহারের মাধ্যমে এমআইএস এবং ফলাফলভিত্তিক এমঅ্যান্ডই সিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে।
এই অ্যাপ্রোচের হলমার্ক হলো—এক. চারটি স্তম্ভ নিয়ে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অ্যাপ্রোচের কথা বলে; দুই. সামাজিক সহায়তা, সামাজিক বীমা ও শ্রমবাজার বিধিমালার মাধ্যমে এ কর্মসূচি বা উপকরণের (ইনস্ট্রুমেন্ট) বৈচিত্র্যায়নের পথ রচনা করে। তিন. এটি অনানুষ্ঠানিকতা বিবেচনায় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটায়। চার. এটি সেবা উন্নয়নের সুযোগ দেয়। পাঁচ. এটি ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণের পরিসর উন্মোচন করে। ছয়. কর্মসূচি উন্নয়ন, অর্থায়ন এবং সরবরাহে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে আর্থিক স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে।
এ নিবন্ধের সমাপ্তিমূলক পর্যবেক্ষণগুলো এ রকম—এক. বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হাতিয়ার। স্বাধীনতার পর থেকে ব্যবস্থাটি দারিদ্র্য ও উন্নয়নের সুফলবঞ্চিতদের ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। দুই. এনএসএসএসের অনুমোদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৫ সাল ছিল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের জন্য পরিবর্তনের বছর। তবে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের অগ্রগতি বেশ ধীর। তিন. কভিড-১৯ সৃষ্ট নতুন নাজুকতাগুলো প্রতিকারে নতুন উপকরণের প্রয়োজনে সামাজিক সুরক্ষায় নতুন ভিশন বা অ্যাপ্রোচ গ্রহণে এনএসএসএস পুনঃপর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চার. নতুন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যাতে কেউ বাদ না পড়ে। সেই মোতাবেক সামাজিক সুরক্ষার চার স্তম্ভ যথা— সামাজিক সহায়তা, সামাজিক বীমা, শ্রমবাজার নীতি, সামাজিক সেবার ভিত্তিতে নতুন ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থায়নের ভার সরকার ও ব্যক্তি খাতের মধ্যে সমন্বিতভাবে বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। পাঁচ. যেকোনো সংস্কারের জন্য মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমরা আশা করি যে বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকবে।
ড. বজলুল হক খোন্দকার: অর্থনীতিবিদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের চেয়ারম্যান










