বিশ্বজুড়ে চলমান উচ্চমূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও খাদ্য ঘাটতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। কভিড ১৯ মহামারীর অসম অভিঘাতের সঙ্গে যোগ হওয়া আজকের বহুমুখী সংকট এরই মধ্যে উন্নয়নে নাটকীয় অধোগতি সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বাড়িয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়।

ইতিবাচক বিষয় হলো, কভিড-১৯ সংকট শিল্প খাতে নজিরবিহীন পরিবর্তনের সূচনা করেছে, বিশেষ করে বড় ডিজিটাল অনুষঙ্গ থাকা শিল্পগুলোয়। এ ডিজিটাল বিপ্লব উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোয় আর্থিক সেবার অভিগম্যতা ও ব্যবহার বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। সহজতর করেছে মানুষের আর্থিক লেনদেন, ঋণ দেয়া-নেয়া, পরিশোধ ও সঞ্চয়।

এসব পরিবর্তন সুন্দরভাবে উঠে আসে গ্লোবাল ফিনডেক্স ডাটাবেজের সর্বশেষ সংস্করণে। এ প্রকাশনায় ২০২১ সালজুড়ে আর্থিক সেবা ব্যবহারকারী ১২৩টি অর্থনীতির ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর চালানো জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপের তথ্যানুযায়ী, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোয় ব্যাংক, ক্রেডিট ইউনিয়ন, ক্ষুদ্র ঋণ কিংবা মোবাইল সেবা প্রতিষ্ঠানে ৭১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির এখন আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাব আছে, এক দশক আগে ওই ডাটাবেজের প্রথম সংস্করণের সময়ে যা ছিল ৪২ শতাংশ। তদুপরি আলোচ্য অর্থনীতিতে হিসাব থাকা নারী-পুরুষের ব্যবধানের অংশও প্রথমবারের মতো কমেছে। এটি আগের ৯ থেকে ৬ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে এসেছে।

এ ডিজিটাল বিপ্লব কর্মীদের মজুরি-বেতন গ্রহণ, পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রবাসী আয় পাঠানো এবং পণ্য ও সেবার অর্থ পরিশোধ সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করে তোলে। মোবাইল হিসাবগুলো বিপুল পরিমাণ ছোট ছোট আর্থিক লেনদেন ভালোভাবে সামাল দিতে পারে। এটা গ্রাহকদের আর্থিক সেবার অভিগম্যতা নিশ্চিত এবং সংকট ভালোভাবে মোকাবেলার জন্য সঞ্চয় করতে মানুষকে প্রভূত সাহায্য করে। ব্যক্তিক হিসাবগুলো এমনকি নারীদেরও অধিক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং নিজস্ব অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়।

উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পন্ন করা বা গ্রহণে প্রাপ্তবয়স্কদের অংশ ২০১৪ সালে ৩৫ থেকে ২০২১ সালে ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। সাব-সাহারান এলাকায় ৩৯ শতাংশ মোবাইল আর্থিক হিসাবধারীই এখন তাদের হিসাবকে অর্থ সঞ্চয়ে ব্যবহার করে। আবার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষই কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর প্রথমবারের মতো উপযোগ বিল (ইউটিলিটি বিল) মোবাইলের মতো ডিজিটাল হিসাবের মাধ্যমে পরিশোধ করেছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিজিটাল বিপ্লব একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। কারণ এটা স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করে, যেহেতু সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে বাজেট থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ সহজেই নাগরিকের কাছে পৌঁছানো যায়। সরাসরিভাবে সুফলভোগীদের মোবাইল ফোনে অর্থ হস্তান্তরের মাধ্যমে সরকারের সামাজিক কর্মসূচি এখন অযাচিত বিলম্ব, অনিয়ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি কমাতে পারে। এভাবে কভিডকালে উন্নয়নশীল দেশের লাখ লাখ মানুষ সরকার থেকে নগদ সহায়তা নিয়েছে, যা জীবিকার ওপর কভিডের অভিঘাত থেকে তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিতে কাজে লেগেছে। বিশেষ করে বিরাজমান অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার বাস্তবতায় এসব উৎসাহব্যঞ্জক প্রবণতাগুলোর পরিচর্যা করা আবশ্যক। চলমান গোলযোগসৃষ্ট উন্নয়ন বাধাগুলো প্রশমনে সামনে অর্থ ব্যবস্থায় মানুষের প্রবেশগম্যতা বাড়ানো, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কমানো, আর্থিক হিসাবগুলোর মাধ্যমে মজুরি ও সামাজিক সহায়তার অর্থ হস্তান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকার ও ব্যক্তি খাত এ রূপান্তর আরো সম্প্রসারণে সাহায্য করতে পারে। এক. তাদের একটা অনুকূল পরিচালন ও নীতি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। উদাহারণস্বরূপ ব্যবস্থার আন্তঃপরিচালনক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে লেনদেনের সুযোগ করে দেয়। অর্থ ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতার উন্নতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেয়ে মোবাইল ফোন সেবা ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে। সস্তা ও কার্যকর ফোন এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের লভ্যতা ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পূর্বশর্ত। নিরাপদ ও ন্যায্য চর্চাগুলো লালনে গ্রাহক সুরক্ষা ও স্থিতিশীল বিধিমালাও প্রয়োজন, যা আর্থিক ব্যবস্থায় গ্রাহকের আস্থা প্রতিষ্ঠা করে।

ডিজিটাল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যাচাইযোগ্য পরিচয়ের ঘাটতি অন্যতম কারণ কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনো আর্থিক সেবার বাইরে রয়ে গেছে। ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে আনুষ্ঠানিক পরিচয়সংক্রান্ত নথি ও আর্থিক হিসাবে দূরবর্তী জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারি শনাক্তকরণ কর্মসূচি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি একযোগে কাজ করতে পারে। যেমন ভারত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তায় যথাযথ মনোযোগ দেয় এমন এক সফল বায়োমেট্রিক সর্বজনীন আইডি সিস্টেম চালু করেছে, যেটাকে বলা হয় আধার কার্ড। এ ধরনের অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।

পেমেন্টের ডিজিটালাইজেশন উন্নয়ন আরেকটি উচ্চ প্রাধিকারের ক্ষেত্র হওয়া উচিত। ২০২১ সালের গ্লোবাল ফিনডেক্সের তথ্যে দেখা যায়, সরকার থেকে নগদ সহায়তা গ্রহণের লক্ষ্যে উন্নয়নশীল অর্থনীতির ৮৬৫ মিলিয়ন হিসাবধারী ব্যাংকে বা সমধর্মী প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রথম হিসাব খুলেছেন। এটা পরিবারগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্যের পাশাপাশি ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম বিনির্মাণেও সহায়তা করেছে। কেননা সরকারি নগদ সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিরা পেমেন্ট করা এবং অন্য সেবা পেতেও তাদের হিসাবকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সরকারের ডিজিটাল পেমেন্ট এভাবে বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক রেজিস্টার সংহতকরণ এবং ঘাটতি ও অধিক্রমণ চিহ্নিত করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

ডিজিটাল পেমেন্ট আরো বিস্তৃত ও সাশ্রয়ী হলে ব্যক্তি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের কর্মী ও সরবরাহকারীদের বৈদ্যুতিনভাবে অর্থ পরিশোধ করবে এবং করা উচিতও। কমপ্লায়েন্স অতিরিক্ত বোঝাময় না করা ছাড়াই ডিজিটাল বিপ্লব আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ ঘটায়। সরকারের কঠোর বাজেট ঘাটতির এ সময়ে কর ফাঁকি রোধ করার মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সরকারের রাজস্ব ভিত্তি বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।

চূড়ান্ত ও শেষোক্ত প্রাধিকার হওয়া উচিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই আনুপাতিকভাবে কম সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থার প্রবেশগম্যতায় লৈঙ্গিক ব্যবধান অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে, তবে এখনো নিঃশেষ হয়নি। ব্যক্তিগত পরিচয়ের ফর্ম কিংবা মোবাইল ফোনের ঘাটতিতে দরিদ্রদের পাশাপাশি নারীরাও ব্যাংক শাখা থেকে অনেক দূরে থেকে যায়। সেক্ষেত্রে তাদের জন্য একটি আর্থিক হিসাব খোলা ও ব্যবহারে বাড়তি সমর্থন প্রয়োজন। আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচিগুলো, বিশেষ করে পিয়ার টু পিয়ার লার্নিংও (যেমন নারীদের আন্তঃসহায়তার গ্রুপগুলোর মতো) বেশ জরুরি।

ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বিশ্বব্যাংক দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যেহেতু সরকার মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতে বিধিমালা প্রণয়ন, ই-গভর্নমেন্ট প্লাটফর্ম গড়ে তোলা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে আগ্রহী, সেহেতু বিভিন্ন দেশের প্রতি সমর্থন প্রদান অব্যাহত রাখব আমরা। এখনো কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকা কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের সংযুক্ত করতে সৃজনশীল উপায় খুঁজে বের করতে হবে। অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি অন্তর্ভুক্তির সুফল কাজে লাগাতে হবে।

[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

ডেভিড ম্যালপাস: প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির