বায়ু মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাতাস এখন জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বাতাস গ্রহণ করতে না পারলে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ঠিক একইভাবে বায়ুর বিশুদ্ধতা না থাকলে সেটাও মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করলে মানুষের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু হয় না, এটা ঠিক। কিন্তু মানুষ দ্রুতই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। বাতাসে যেসব ক্ষতিকর ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থ মিশে থাকে তা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এসব ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থের কারণে মানুষের ফুসফুস আক্রান্ত হয়। আর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাজধানী ঢাকার বাতাস এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়ছে। বিভিন্ন উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে বায়ুদূষণের হার বেড়ে যাচ্ছে, অপরিকল্পিত ইটভাটাও দায়ী। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অতিরিক্ত যানবাহন বায়ুদূষণের জন্য অন্যতম দায়ী। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন দপ্তরের আন্তঃসমন্বয়হীনতাও কম দায়ী নয়। নাগরিকরাও বায়ু বা অন্যান্য দূষণের হার বাড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে তাই দূষণ রোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন সংশোধন, পরিমার্জন করে সময়োপযোগী করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি নিরাপদ বায়ুর নিশ্চয়তা। ধুলার কারণে এ দূষণের মাত্রা ভয়াবহ। মাত্রাতিরিক্ত ইটভাটা, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও কল-কারখানার ধোঁয়ার কারণে ঢাকা শহরের প্রায় দেড় কোটি মানুষ এক অবিশ্বাস্য বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে বাস করছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এর প্রভাবে মৃত্যুবরণ করে থাকে। কম উন্নত দেশগুলোয় পাঁচ বছরের কম বয়সী ৯৮ শতাংশ শিশু দূষিত বায়ুর মধ্যে বেড়ে ওঠে। ফলে বিশ্বে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ। এর প্রভাবে প্রতি বছর ছয় লাখ শিশু মারা যায় বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রাজধানীর বায়ুদূষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী অতিরিক্ত যানবাহন। ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে তিন লাখের বেশি যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। নগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত অনেক গাড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। এছাড়া গাড়িতে ব্যবহারকারী ভেজাল ও নিম্নমানের জ্বালানিও দায়ী বায়ুদূষণে। অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত কালো ধোঁয়াও বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। এসব উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা, বিষাক্ত ক্ষতিকারক গ্যাস ও ভারী ধাতব কণা বাতাসে মিশে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত বায়ুদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। বায়ুদূষণে জড়িত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সর্বোপরি বায়ুদূষণের সব উৎস বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত করতে হবে। ইট প্রস্তুতের ধরন ও আগে-পরের বিষয় বা পদ্ধতি নিয়ে আগের ইট প্রস্তুত আইন-২০১৩ সংশোধন করা হয়েছে। ২০১৮ সালেও সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বড় চিন্তার জায়গা হলো নির্মাণকাজ। যে যেভাবে পারছে নির্মাণকাজ করছে। এজন্য যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যত্রতত্র ও ‘যে যেভাবে পারে’ নির্মাণকাজ থেকে বিরত থাকার জন্য প্রশাসনকে বা কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মুনাফার কথা না ভেবে মালিক, সমিতি বা ডেভেলপারদের দেশ ও ভবিষ্যতের দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। শুধু বিবেককে জাগ্রত করলেও সরকারের কঠোর তদারকি লাগবে না। অবশ্য এ ব্যাপারে মালিক-সরকারি কর্তৃপক্ষকেই বিবেক জাগ্রত করতে হবে। শুধু এক পক্ষকে বিবেক জাগ্রত করে বেশি দূর অগ্রগতি সম্ভব নয়। বাতাসে ক্ষতিকর এসব বস্তুকণা মিশছে মূলত যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পের জ্বালানি এবং কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর ফলে। বায়ুতে বেঁচে থাকা অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে কমিয়ে দিচ্ছে। এসবের জন্য দরকার সবুজায়ন। বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন থেকে বায়ুদূষণ বেশি হচ্ছে। এ বিষয়ে লেখালেখিও হচ্ছে প্রচুর। এখানেও একই অবস্থা। আইন আছে। কিন্তু ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বিভিন্ন কারণে। গণমাধ্যমকে বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের দুর্দিনে গণমাধ্যমের ইতিবাচক অনেক ভূমিকা থাকে। এ বিষয়েও উচ্চকিত দেশের গণমাধ্যম থেকে তা আমরা আশা করি। ভয়াবহতার অবস্থা তুলে ধরে সচেতনতার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে করণীয় কী কী তা তুলে ধরতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টিই পারে বিভিন্ন রকমের দূষণের ভয়াবহতা কমাতে। পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।

বায়ুদূষণ রোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তর ‘নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের পথে থাকলে শুধু এ প্রকল্প দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না। যেসব সুনির্দিষ্ট কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে সরকারকে সেসব দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে ৭০-৮০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতামত, জনগণকে সম্পৃক্ত করে সুপারিশমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করলে এ দেশের বায়ু দূষণমুক্ত হবেই হবে। এজন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশের সবচেয়ে মূল্যবান উপাদানটি হলো বায়ু, যে উপাদান ছাড়া আমরা বেঁচে থাকার কথা চিন্তাও করতে পারি না। সেই উপাদান আমাদের অসচেতনতার কারণে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সবাই জেনেও এমন সব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছি যার কারণে বায়ুদূষণের পরিমাণ যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি দূষণের কারণে ভোগান্তির পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।

ঢাকায় বায়ুদূষণ কমাতে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি মহামান্য হাইকোর্ট নয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রয়েছে। এছাড়া মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। ডাম্পিং স্টেশনের পাশাপাশি রাস্তার পাশে বর্জ্য পোড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি করপোরেশনকে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলার পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ সমস্যা হ্রাস করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মধ্যমেয়াদি কিছু কৌশল নিতে পারে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা যেতে পারে। এর মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার এবং রাস্তার ধুলো সংগ্রহের জন্য ম্যানুয়াল ঝাড়ুর পরিবর্তে সাকশন ট্রাক এবং ভ্যাকুয়াম সুইপিং ট্রাকের প্রচলন করতে পারে। এটি রাস্তার ধুলো থেকে বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ কমানোর জন্য পৃথক সাইকেল লেন অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হবে। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং ছাদবাগান বায়ুমান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ কমাতে ঘরের অভ্যন্তরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি, নিয়মনীতি প্রণয়ন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বাজেট বৃদ্ধিসহ পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার আগে সবাইকে একযোগে সমন্বিত, টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। এর জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একটি প্লাটফর্মে যুক্ত করে পৃথক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নির্মল বায়ু আইন ২০১৯-এর পরিবর্তে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি নিয়ে কাজ করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ইট প্রস্তুত ও ইটখোলা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনো ইটখোলার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আইনিভাবে বায়ুদূষণ প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে হবে। বায়ুদূষণের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং অন্যদের বায়ুদূষণের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। যানবাহনে ক্যাটালাইটিক কনভার্টর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ডিজেলের পরিবর্তে সিএনজি গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে পাবলিক পরিবহন ব্যবহারের প্রতি সবাইকে আগ্রহী করতে হবে। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন থেকে বায়ুদূষণ বেশি হচ্ছে। এ বিষয়ে লেখালেখিও হচ্ছে প্রচুর। এখানেও একই অবস্থা। আইন আছে। কিন্তু ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বিভিন্ন কারণে। গণমাধ্যমকে বেশি পরিমাণে এগিয়ে আসতে হবে। ভয়াবহতার অবস্থা তুলে ধরে সচেতনতার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে করণীয় কী কী তা তুলে ধরতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টিই পারে বিভিন্ন রকমের দূষণের ভয়াবহতা কমাতে। পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে বায়ুদূষণের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ফলে এ সমস্যা সমাধানে একটি সামগ্রিক চিন্তা ও পরিকল্পনা জরুরি। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কোনো উদ্যোগ নিতে না পারলে পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোয় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।