একটি দেশের চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষি অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও ক্রমে বৃদ্ধি পাওয়া নগরায়ণের ফলে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। এটা সত্য যে সভ্যতার বিকাশে অবকাঠামো নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনে যেন ঘাটতি না হয় সেটিও লক্ষ রাখতে হবে। সে সঙ্গে আবাদযোগ্য জমি যেন পুরোপুরি চাষাবাদের জন্য ব্যবহূত হয়, সেদিকেও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৬৫ হাজার একর। এর মধ্যে ২ কোটি ৮১ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ হয়। এছাড়া প্রায় ৬ লাখ ৭১ হাজার একর বা ৬ কোটি ৭১ লাখ শতক জমি আবাদযোগ্য হওয়ার পরও চাষাবাদের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না, যা মোট ভূমির প্রায় ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসন্ন খাদ্য সংকট মোকাবেলায় অপচয় হওয়া জমির বড় অংশে চাষাবাদ করা গেলে তা ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের এক ইঞ্চি জমিও উৎপাদনের বাইরে না রাখার বিষয়ে জোর দিচ্ছেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের এ রকম চিত্র সত্যিকার অর্থেই দুঃখজনক। জেলাভিত্তিক হিসাবে বান্দরবান, ফরিদপুর ও সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদযোগ্য জমির অপচয় হচ্ছে। জমি অপচয়ের শীর্ষ ১০ জেলার চারটিই সিলেট বিভাগের। বিভাগটিতে ৩১ লাখ ২২ হাজার একর ভূমির মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার একর আবাদযোগ্য জমি চাষের আওতায় আসেনি।

পরিসংখ্যানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট আবাদযোগ্য জমি অপচয়ে শীর্ষে রয়েছে বান্দরবান জেলা। জেলাটির মোট ভূমির পরিমাণ ১১ লাখ ৭ হাজার একর। এর মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার একর আবাদযোগ্য জমি অপচয় হচ্ছে, অর্থাৎ এসব জমি চাষের আওতায় আসছে না। আবাদযোগ্য ভূমি অপচয়ের দিক থেকে বান্দরবানের পরই সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থান। জেলার ৯ লাখ ২৬ হাজার একর জমির মধ্যে ৪৬ হাজার একর আবাদযোগ্য জমি চাষের আওতায় আসছে না। বান্দরবান ও সুনামগঞ্জের পর ফরিদপুর জেলায় ৫ লাখ ৭ হাজার একর জমির মধ্যে ৪৩ হাজার একর আবাদযোগ্য জমি অপচয় হচ্ছে। এর পরই শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে রয়েছে সিলেট, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ। এসব জেলার অনাবাদি জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় নেয়া গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

বান্দরবান জেলায় মূলত সমতল ভূমিতেই চাষাবাদ করা হয়। জেলাটিতে পাহাড়ি ভূমি বেশি হওয়ায় কিছু পাহাড়ি স্থানে জুমের ফসল, কফি, কাজুবাদাম, আনারসসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করা হয়। এর বাইরে বড় একটি অংশ আবাদের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী স্থানেরও একটি অংশ আবাদের বাইরে থাকছে। মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলা। হাওরের রাজধানীখ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলা সীমান্তবর্তী। বর্ষার মৌসুমে প্রায় সময় সীমান্ত এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটে। জেলা সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকার সীমান্তে অনেক আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি রয়েছে। এ জমির বড় অংশ পাহাড়ি ও নদীতীরবর্তী। এসব জমিতে সবজি, ফলমূলসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করা সম্ভব। এসব এলাকায় নতুন উদ্যোক্তারা আনারস, লেবু, ফুল ও ফলের চাষাবাদ করলে সফল হতে পারবেন। কিন্তু বন্যা, পাহাড়ি ঢলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির শঙ্কায় এসব জমিতে কৃষক ফসল চাষে আগ্রহী হন না। এদিকে ফরিদপুরে কয়েকটি উপজেলার মধ্য দিয়ে পদ্মা নদী বয়ে যাওয়ায় নদীর চরাঞ্চলের জমিগুলো চাষের আওতায় আসছে না। আবার নদীভাঙনের শঙ্কা মাথায় নিয়ে কৃষকও চাষ করতে চান না।

সিলেট বিভাগে প্রবাসীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের মালিকানাধীন জমিগুলো চাষে এক প্রকারের অনীহা রয়েছে। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাউকে চাষ করতে দেয়া হলে জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ার শঙ্কায় মূলত প্রবাসীরা অন্য কাউকে চাষ করতে দেন না। ফলে এসব আবাদি জমি অনাবাদি অবস্থায় পড়ে থাকে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে এসব জমিতে লাভজনক ও রফতানিযোগ্য ফসল চাষে আগ্রহী করতে প্রবাসী মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দেশে আবাদযোগ্য অনাবাদি জমির পরিমাণ কম নয়। এসব জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব কিন্তু নানা কারণে আনা যাচ্ছে না। সিলেটে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি থাকায় তারা নিজেদের জমি চাষ করেন না, কাউকে করতেও দেন না। এর বাইরে এখন খুলনাসহ উপকূলবর্তী অঞ্চলের প্রচুর মানুষ নিজের জমি ফেলে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এসব জমিও মালিকানা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টির শঙ্কায় অন্য কাউকে চাষ করতে দেয়া হয় না। আবার আবাদি জমির মালিকদের একটি অংশের পুরুষরা চাকরির জন্য অন্য শহরে থাকেন। বাড়ির নারীরা পরিবার দেখাশোনা করলেও জমিতে ফসল ফলানোর মতো কাজ তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব পরিবারের জমিও অনাবাদি থাকায় সার্বিকভাবে দেশ উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেশে অনাবাদি কৃষিজমির যে চিত্রটি দেখা যাচ্ছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। এক্ষেত্রে আসন্ন খাদ্য সংকটের ঝুঁকি আমাদের জন্য প্রতিনিয়ত সতর্কতার বাণী দিয়ে যাচ্ছে। সেহেতু এখন আসলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে যা যা করণীয় সেক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। এমনিতেই নানাবিধ অপরিকল্পনার ফলে ফসলি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। শিল্পায়ন ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে কৃষিজমি কমছে। এমন বাস্তবতায় নতুন করে যেন কৃষিজমি না কমে সেদিকে লক্ষ রাখার পাশাপাশি অনাবাদি জমি চাষের ব্যবস্থা করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে কৃষককে বিনামূল্যে বীজ প্রদানসহ কৃষক যেন প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা ও সহযোগিতা পায় সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রবাসী বা ভিন্ন জেলায় বসবাসরত জমির মালিকদের জমি আবাদ করার প্রয়োজনে সরকারিভাবে মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া যেসব এলাকায় জমি পানির নিচে থাকে, সেখানে জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাতের ফসল উদ্ভাবন, লবণাক্ত জমিতে লবণসহিষ্ণু জাত এবং বালি মাটির ক্ষেত্রে প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করতে হবে। মোটকথা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনাবাদি জমিগুলোয় আবাদ করা গেলে আমাদের দেশের খাদ্যভাণ্ডার আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে এবং আসন্ন সংকটের ঝুঁকিতে আমরা খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হব না, এ প্রত্যাশা করাই যায়।