ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেকদিনের। তখন তিনি কেবিনেট ডিভিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন। আমি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, যেটা এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হিসেবে পরিচিত, সেখানে জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলাম। সে সময় তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, আমি ছিলাম অর্থনীতির। তিনি আমার চেয়ে দুই বা তিন বছরের জুনিয়র। যেহেতু তিনি ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র, আমি ছিলাম অর্থনীতির ছাত্র, তাই খুব একটা কথা বা দেখা হওয়ার সুযোগ সে সময়ে হয়নি।
আমাদের একসঙ্গে কাজ খুব একটা করা হয়নি। কেননা আমি বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তদানীন্তন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব থাকাকালে জাতিসংঘের যে আঞ্চলিক কমিশন ইউনাইটেড ন্যাশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকে (ইউএনএসক্যাপ) যোগদান করি, সেখান থেকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের হেড কোয়ার্টারে চলে যাই। পরে আবার ইউএনএসক্যাপে ম্যাক্রো ইকোনমিক পলিসি ডিভিশনের হেড হিসেবে ফিরে আসি। সে সময়েও তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুব একটা হয়নি। তবে আমি যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে মোটামুটি খবর রাখার চেষ্টা করি সে হিসেবে তার কর্মকাণ্ড আমি দেখেছি। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব। বাংলাদেশের অর্থনীতির নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন, সে সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম।
তিনি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ইন্টেলেকচুয়ালি খুব অ্যাকটিভ ছিলেন। তার প্রমাণ হচ্ছে তিনি কর্মজীবনে অনেকগুলো বই লিখেছেন। এখানে আমি আরেকটা কথা বলে রাখি তিনি যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, তবে পরবর্তী সময়ে কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। অর্থনীতি সম্পর্কে তার যে গভীর বিশ্লেষণ সেটা নীতিনির্ধারক এবং অন্য অর্থনীতিবিদদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। এ প্রসঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই, তার সর্বশেষ বই ২০২১ সালে বাংলাদেশের বাজেটের ওপর প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। দুটো বিষয়ের সম্পর্ক এবং একটা অন্যটিকে প্রভাবিত করে, এ বিষয়গুলো নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন, তিনি লিখেছেন। এটা খুবই প্রশংসনীয়।
অর্থনীতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি যে বিষয়গুলোর অবতারণা করেছেন, তার মধ্যে আমাদের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা, সরকারি অর্থ সময়মতো ব্যয় করতে না পারার অক্ষমতা, বছরের শেষের দিকে তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে কাজের মান বজায় রাখতে না পারা, বাংলাদেশ আবহাওয়ার দিক থেকে একটি ভঙ্গুর দেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো নিরসনের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, বাংলাদেশের বাজেটের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ ব্যয়ের ক্ষেত্র ইত্যাদি বিষয়ে তার বিশ্লেষণ খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রায়ই দেখা যায় আমাদের দেশের বাজেটে যে অংকগুলো দেখানো হয় সেখানে অনেক ইনঅ্যাকিউরেসি থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আমরা যে রাজস্ব আহরণ করব সেটা বাজেটে যতটুকু নির্ধারণ করা হয়, প্রত্যেক বছরেই আমরা তার চেয়ে কম আহরণ করতে পারি। এছাড়া জেন্ডার বাজেট, চাইল্ড বাজেট এ সম্পর্কে তার মন্তব্য আছে। গ্রাসরুট স্টেকহোল্ডারদের বাজেটে অংশীদারিত্ব খুব একটা নেই। এ সম্পর্কেও তার আলাদা চিন্তা ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল তিনি অর্থনীতির ওপর বেশকিছু বই লিখেছেন, যা বাংলায়। অর্থনীতির মতো বিষয়কেও যে পাঠকের সামনে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা যায়, তা আকবর আলি খান দেখিয়েছেন।
ইতিহাসের
ছাত্র হয়েও
তিনি অর্থনীতি
ভালো বুঝতেন,
সে সম্পর্কে
আমি আগেই
বলেছি যে তিনি পরবর্তী
সময়ে অর্থনীতিতে মাস্টার্স এবং পিএইচডি
করেছেন। অর্থনীতি
বিষয়টি খুবই
টেকনিক্যাল, কিন্তু
আমি দেখেছি
বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার সময়
আমার সঙ্গে
লাতিন আমেরিকা
এবং ভারত
থেকে কিছু
কিছু ছাত্র
ছিল যারা
ইঞ্জিনিয়ারিং পাস
করে সেখানে
অর্থনীতিতে ভর্তি
হয়েছিল। তাদের
মধ্যে অনেকে
বেশ ভালো
করেছে। কাজেই
অর্থনীতি এমন
একটি শাস্ত্রের নাম, যদি কেউ
মনোযোগ দিয়ে
লেখাপড়া করে
এবং বিভিন্ন
মত বিশ্লেষণ
করে তাহলে
এর থেকে
যে শিক্ষণীয়
বিষয়গুলো রয়েছে
সেগুলো শেখাটা
খুব একটা
কঠিন না।
আকবর আলি
খান এমন
জ্ঞানী ব্যক্তি
ছিলেন যে অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা নিয়েই অনেক কিছু
বুঝেছিলেন, যা মূলধারার অর্থনীতি
পড়েও অনেকে
বোঝেন না।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ড. আকবর আলি খান পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী ছিলেন। মৃত্যুর দুই-তিন দিন আগেও তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেছেন, নিয়েছেন পরীক্ষা। তার মৃত্যুতে জানাই গভীর শোক।
ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক










