তৈরি পোশাক দেশের সর্ববৃহৎ রফতানিমুখী খাত। বিগত কয়েক দশক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরি পোশাক শিল্প প্রথম স্থান দখল করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশে এখন তৈরি পোশাক শিল্পের বিকল্প কোনো খাত তৈরি হয়নি। চামড়া, চা, পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানিতে ভূমিকা রাখলেও তৈরি পোশাকের বিকল্প খাত হয়ে উঠতে পারেনি। বাজার বৈচিত্র্যকরণেও তৈরি পোশাক শিল্প বেশ খানিকটা এগিয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ১১টি বাজারে বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কানাডা, ডেনমার্ক ও জাপান। দেশের পোশাক খাতের জন্য খবরটি নিঃসন্দেহে উৎসাহজনক। সুযোগ রয়েছে বিলিয়ন ডলারে আরো নতুন বাজার সৃষ্টির। প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টা। নতুন বাজারে পোশাক রফতানি বাড়লেও এখনো চারটি দেশে ৫০ শতাংশের রফতানি গন্তব্য। সম্ভাবনাময় বাজার নিয়ে আরো গবেষণা এবং রফতানি বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘিরে কিছু শঙ্কাও তৈরি হয়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অন্যতম। সংকট কিছু সুযোগও তৈরি করছে। এক্ষেত্রে প্রচলিত গন্তব্যের বাইরে নতুন নতুন বাজারে রফতানি বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

তৈরি পোশাক খাতের সার্বিক রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন বাজারও সৃষ্টি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়ে আসছে আগে থেকেই। হালে তুরস্ক, জাপান, চীন, ভারত, রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে নতুন বাজার সৃষ্টি হওয়া নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। নতুন বাজারে ভালো করছে বাংলাদেশ, তবে নতুন বাজারে রফতানিকারকরা উচ্চ শুল্কহার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও শুল্ক-প্রক্রিয়াগত জটিলতাসহ বেশকিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, পণ্য পরিবহনেও ঘটছে অহেতুক বিলম্ব। ক্রেতা সবসময়ই চায় আমদানি করা পণ্যটি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় যাতে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারেও শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, সেজন্য কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্বের ১ নম্বর তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ চীন নানা কারণে শ্রমঘন এ শিল্প থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। এ অবস্থায় ভারত, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের মতো জনবহুল দেশগুলোয় তৈরি পোশাকের যে বিপুল চাহিদা আছে, তার সীমিত অংশের জোগান দিতে পারলেও বাংলাদেশের পক্ষে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের পোশাকের সম্ভাবনাময় রফতানি গন্তব্য অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, সুইডেন, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া উল্লেখযোগ্য। এসব দেশে পোশাক রফতানি বেড়েছে, সুযোগ রয়েছে আরো। শুধু তা-ই নয়, দেশের পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যও। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) মধ্যপ্রাচ্যের একটি ধনী দেশ। এ দেশে মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ৪৩ হাজার মার্কিন ডলারের অধিক। সৌদি আরবে মাথাপিছু আয় ২০ হাজার ১১০ ডলার। কুয়েতে মাথাপিছু আয় ৩২ হাজার ৩৭৩ ডলার, কাতারে ৫০ হাজার ৮০৫, বাহরাইনে ২৩ হাজার ৪৪৩, ওমানে ১৫ হাজার ১২৭ ডলার। উল্লেখিত মাথাপিছু অধিক আয়সম্পন্ন দেশগুলোয় তৈরি পোশাক শিল্পের বেশ চাহিদা রয়েছে। তাও দামি পোশাকের চাহিদা। মাথাপিছু আয়ই বলে দিচ্ছে, উপসাগরীয় সহযোগী সংস্থার (জিসিসি) তালিকাভুক্ত এ ছয়টি তেলসমৃদ্ধ দেশে তৈরি পোশাকের বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু বাজারটিতে বাংলাদেশের হিস্যা একেবারেই কম। জিসিসিভুক্ত দেশগুলো ২০২০-২১ অর্থবছরে অন্তত ১ হাজার কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। বাংলাদেশী মূল্যে তার পরিমাণ হচ্ছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। সেখানে বাংলাদেশ রফতানি করেছে মাত্র ৩৬ কোটি ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের বাজার সাধারণত দামি পোশাকের। মূলত চীন, ভারত ও পাকিস্তান থেকে ইউএই ও সৌদি আরবে তুলনামূলক সস্তা পোশাক রফতানি হয়। সৌদি আরবে অনেক বাংলাদেশী থাকেন, তাদের প্রয়োজনে আমাদের পোশাক রফতানি। প্রকৃত সৌদি নাগরিকদের জন্য এখনো আমাদের পোশাক রফতানি খুবই সীমিত। তাছাড়া রফতানির বড় অংশ স্টকলট পণ্য। জিসিসির বাজার খুবই সম্ভাবনাময়। দীর্ঘ ৫০ বছরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় পোশাক রফতানির কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশের রফতানি ভালো থাকার কারণে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা ওই দেশগুলোয় বিপণনের কোনো বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করেননি। এখন সময় এসেছে, চিন্তা করার। বিশ্বের অন্যান্য বাজারের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে জিসিসিভুক্ত দেশের পণ্য কিছুটা ভিন্ন। এখানে জোব্বা আল খাল্লার মতো পোশাক বেশি চলে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে কী ধরনের পোশাক পণ্যের চাহিদা রয়েছে, সেটি আমদের খুঁজে বের করতে হবে এবং নতুন করে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

লক্ষণীয়, পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও আয়ের হিসাবে প্রথমে থাকা চীনের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান ব্যাপক। আবার এ খাতে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করছে তৃতীয় অবস্থানে থাকা এশিয়ার আরেক দেশ ভিয়েতনাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানি প্রবৃদ্ধি এখন যে তৈরি পোশাকের পণ্যগুলোয় রয়েছে, সেখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাছাড়া অন্যান্য দেশে যেসব পণ্য উৎপাদিত হয়, সেসব পণ্যের সক্ষমতা যদি আমাদেরও তৈরি হয়, তাহলে সে পণ্যের ক্রেতারাও বাংলাদেশে আসবে বলে ধারণা তাদের। এক্ষেত্রে অবশ্যই উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আশার কথা, বাংলাদেশের বেশকিছু তৈরি পোশাক কারখানার উদ্যোক্তা এখন ফ্যাশনেবল ও দামি পোশাকের বাজার ধরার চেষ্টা করছেন। আবার নতুন অনেক কারখানাই গড়ে উঠছে, শুধু এ ধরনের পোশাক তৈরির জন্য। এ ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ বেগবান হলে দেশ লাভবান হবে।

পোশাকের দাম কেমন হবে তা নির্ভর করে কাপড়ের ধরন আর ডিজাইনের ওপর। যেমন একটি সাধারণ পোলো শার্ট রফতানি করলে যেখানে ৩ ডলার পাওয়া যায়, সেখানে সুতা, কাপড়ের মান ভিন্ন হলে কিংবা বাড়তি এমব্রয়ডারি, প্রিন্টিং, ওয়াশযুক্ত হলে পাওয়া যেতে পারে ৮ ডলার। তুলা ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা, মাশরুমসহ নানা জৈব উপাদান থেকেও এখন সুতা তৈরি হয়। সেগুলো দিয়ে তৈরি কাপড়ের পোশাকের দাম হয় বেশি। আবার সাধারণ শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্টের তুলনায় বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর ইউনিফর্মধর্মী পোশাকও বেশি দাম দিয়ে কেনেন ক্রেতারা। এর বাইরে আছে স্পোর্টস আর অ্যাথলেটিক আইটেমও। স্যুট-ব্লেজারধর্মী পোশাকেও কয়েক গুণ বেশি দাম পাওয়া যায়, বিশ্বে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোশাকেও তার ছোঁয়া লাগছে। যুক্ত হচ্ছে সেন্সর, ডিভাইস বহন করা যায় এমন সুবিধা। থ্রিডি প্রিন্টারসহ আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যেও এখন পোশাক তৈরি হয়। এমন ‘স্মার্ট পোশাকের’ বাজারও দিন দিন বাড়ছে। এসব চাহিদাসম্পন্ন উচ্চমূল্যের পণ্যবাজার ধরার জন্য আমাদের অবশ্যই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য প্রতিনিয়ত বাজার গবেষণার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে।

প্রচলিত ও অপ্রচলিত দুই ধরনের বাজারেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির সম্ভাবনা বিপুল। নতুন বাজার যেমন ব্রাজিল, রাশিয়া এগুলোর পেছনে যদি দৌড়াতে হয় তাহলে অর্থনৈতিক কূটনীতির দরকার আছে। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে সমন্বয়ের মাধ্যমে। জিসিসিই জোটভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি ভালো বাজার হতে পারে। এসব দেশে আমাদের তৈরি পোশাকের ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের ওই দেশে অনেকবার বাণিজ্যিক ভ্রমণ করতে হবে। বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলরদের এজন্য কাজ করতে হবে। তাদের দৈনিক কাজের মধ্যে তৈরি পোশাক বাণিজ্য করার জন্য একটা  অংশ সময় ব্যয় করতে হবে। ওইসব দেশে পোশাকের নিয়মিত প্রদর্শনী করতে হবে। বিদেশে দেশের তৈরি পোশাকের নিয়মিত মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। নতুন বাজার সৃষ্টির জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এসব দেশে রফতানি বৃদ্ধির জন্য তথা নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সরকার ১০ শতাংশ হারে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের একটি স্কিম চালু করতে পারে। তাতে উৎসাহী হয়ে তৈরি পোশাকের রফতানি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত প্রসার লাভ করবে। দেশে ছোট-বড় তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সব কারখানা নিজে নিজে রফতানি আদেশ গ্রহণ করতে পারে না। অন্যের ওপর নির্ভর করে অধিকাংশ পোশাক শিল্প রফতানি আদেশ গ্রহণ করে থাকে। তাতে লাভের সঙ্গের একটি কমিশন পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। এ কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করে সরাসরি রফতানি আদেশ লাভের জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠান ইপিবি ভূমিকা পালন করতে পারে। এজন্য ইপিবি তার বাণিজ্যিক শাখাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। দেশভিত্তিক সব দেশের কূটনৈতিক অফিসকে বাণিজ্যিক অফিসে রূপান্তর ঘটাতে হবে।