বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৯৭৪ সালে ছিল ২ টাকা। আর সোনার ভরি ছিল ১৯০ টাকা। চা শ্রমিকরা তখন চাইলেই মজুরির অর্থ জমিয়ে সোনার গহনা কিনতে পারতেন। সরকারি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের বেতনের হিসেবেও শ্রমিকদের মাসিক আয় তিন ভাগের এক ভাগ ছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের মূল বেতন ছিল ১৪৫ টাকা। শুধু তা-ই নয়, তখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৮২ ডলার বা ১ হাজার ৪৯৩ টাকা বিবেচনায়ও একজন চা শ্রমিকের বার্ষিক আয় যথেষ্ট ভালো ছিল।

কিন্তু ৪৮ বছর পর বাংলাদেশ যখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, তখন চা শ্রমিকদের জীবনের পুরো চিত্রটাই নেতিবাচকভাবে বদলে গেছে। কয়েকদিন আগেই চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ১২০ টাকা কিন্তু সোনার ভরি প্রায় ৮৫ হাজার টাকা। ১৯৭৪ সালে যেখানে চা শ্রমিকদের ৯৫ দিনের মজুরির সমান সোনার ভরির দাম ছিল; এখন সেটা হয়েছে ৭০৮ দিনের মজুরির সমান। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিকদের মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।  নতুন নির্ধারিত মজুরি ধরলে এটি ৫০০ দিনের মজুরির সমান। আবার প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের প্রারম্ভিক মূল বেতনের সঙ্গেও চা শ্রমিকের বেতনের পার্থক্য আগের তিন গুণ থেকে বেড়ে ১৮৩ গুণ হয়েছে। নতুন মজুরি হিসেবে সেটি ১২৯ গুণ।

সহজ কথায় চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে তারা যে বেঁচে আছে সেটাই বড় বিস্ময়কর ঘটনা। কিন্তু তাদের এ কষ্টকর ও অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে থাকা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে, সেটা দেখা ও তার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য চা বাগানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন, টি প্ল্যানটার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট কেউ-ই খুব বেশি চিন্তিত বলে মনে হয় না, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবদান রাখা চা শ্রমিকদের প্রতি চরম অবজ্ঞামূলক।

তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশের চা শ্রমিকরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যু্দ্ধ করে অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া চা শ্রমিকদের সংখ্যা ৬০৩ জন। আহতদের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কথাটা মনে রেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তান আমলে গঠিত চা বোর্ডের চেয়ারম্যানও ছিলেন। ফলে চা শ্রমিকদের ভালো-মন্দের বিষয়গুলো তিনি জানতেন এবং তাদের প্রতি তার বিশেষ নজর ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর চা শ্রমিকদের চেয়ে চা বাগান মালিকরাই যেন রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই আমরা দেখতে পাই, ২০১৬ সালে প্রণীত চা আইন এবং চা শিল্পের অগ্রগতির জন্য ২০১৭ সালে প্রণীত ‘পথ নকশা: বাংলাদেশের চা শিল্প’ নামের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা রাখা হলেও শুধু উপেক্ষিত হয়েছে চা শ্রমিকরা। এমনকি চা শিল্পের জন্য সরকারিভাবে প্রণীত অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ নথিতে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে ৬ নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘একজন শ্রমিক চা চয়ন মৌসুমে দৈনিক ১৩০ থেকে ১৭০ কেজি পর্যন্ত উত্তোলন করে থাকে। অর্থাৎ একজন শ্রমিক চা পাতা উত্তোলনের জন্য কর্মক্ষমতা ভেদে দৈনিক ৩২১-৪৪১ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করে থাকে।’

মালিক পক্ষ এ হিসাবই এতদিন দিয়েছে। মিডিয়ায় দেয়া তাদের বক্তব্য থেকে জানা যায় তারা বলেছেন, ‘চা শ্রমিকরা ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরির জন্য আন্দোলন করলেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতি শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৪২২ টাকা পেয়ে থাকেন এবং মাসিক প্রায় ১১ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।’

মালিক পক্ষের দেয়া এ বক্তব্য আজ থেকে পাঁচ বছর আগে সরকারি পরিকল্পনা নথিরই অনুরূপ হলেও এটা বিস্তৃত পরিসরে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানে আরো একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, সরকারি নথিতে যেভাবে দাবি করা হয়েছে একজন শ্রমিক দৈনিক ১৩০-১৭০ কেজি চা পাতা উত্তোলন করে—এ কথাটা কতটা সত্যি ও বাস্তবসম্মত সেটাও কিন্তু খতিয়ে দেখা দরকার।

তবে সেদিকে না গিয়েও আমরা যদি চা শিল্পের প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা এবং চা শ্রমিকদের প্রতি তার মমত্ববোধ বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৪ সালের দৈনিক মজুরির দিকে দৃষ্টি ফেরাই তাহলে সহজেই বলতে পারি বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্র চা বাগান নিয়ে জাতির পিতার স্বপ্ন এবং প্রত্যাশায় গুরুত্ব দিচ্ছে না।

আমরা জানি, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে উৎপাদিত চায়ের একক ও সুরক্ষিত পশ্চিম পাকিস্তানি বাজার হাতছাড়া হওয়ায় চায়ের নিলাম মূল্য উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে বঙ্গবন্ধুর সরকার বিকল্প রফতানি বাজার অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাঁচিয়ে রাখতে চা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় ১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত চা উৎপাদনকারীদের নগদ ভর্তুকি প্রদান করার পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ করে। এখানেই শেষ নয়, বঙ্গবন্ধু চা কারখানাগুলো পুনর্বাসনে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ থেকে ৩০ লাখ ভারতীয় মুদ্রা মূল্যের ঋণ নিয়ে চা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। বঙ্গবন্ধু চা বাগান মালিকদের ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা সংরক্ষণের অনুমতি প্রদান করেন। প্রশ্ন হলো এর বিনিময়ে আজ চার দশক পর আমরা দেখছি, স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে অবস্থা ফিরে আসছিল যে চা শ্রমিকদের জীবনে সেখানে নতুন করে শোষণের বিস্তার ঘটেছে, যা দিনে দিনে তাদের জীবনযাপন নাজুক করে তুলেছে।

বাংলাদেশে চা বাগান পত্তনের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ১৬৭ বছর আগে ব্রিটিশরা তাদের এজেন্ট বা দালাল (যারা আড়কাঠিয়া নামে পরিচিত) মাধ্যমে ভারত থেকে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও অল্পসংখ্যক খ্রিস্টানকে মানব পাচার করে ক্রীতদাস হিসেবে চা বাগানে কাজে বাধ্য করেছিল। যারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাগানের শ্রমিক হয়েছেন। তবে স্বাধীনতার পর চা বাগানে যে পরিবর্তনগুলো আসতে শুরু করেছিল সেটা নব্বইয়ের দশকে এসে গতি পেতে শুরু করে বিশেষ করে চা শ্রমিকদের সন্তান যারা বিভিন্ন চার্চ বা মিশন স্কুলগুলোয় লেখাপড়া করছিল তারা পরবর্তীতে খ্রিস্টান পাদ্রিদের পরিচালিত কলেজ এবং বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার মাধ্যমে এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করে। তারা এনজিওগুলোয় কাজ করার সুবাদে শিখে নেয় কীভাবে নেগোসিয়েশন করতে হবে কিংবা কীভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অ্যাডভোকেসি করতে হবে। তাদেরই অগ্রবর্তী একজন পিউস নানোয়ার। যিনি নটর ডেম কলেজে পড়ার মধ্য দিয়ে ২২ বছর আগে চা বাগান থেকে নিজেকে বের করতে পেরেছিলেন। এবং তারপর অন্যদের সংগঠিত করে চা শ্রমিকদের সন্তানদের উন্নত শিক্ষা ও স্ব-ইচ্ছায় পেশা বেছে নেয়ার পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছেন। তাদের পরিশ্রম ও অ্যাডভোকেসির ফলে এখন প্রতি বছর বিশেষ কোটায় সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চা শ্রমিকদের চারজন সন্তান এবং চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে চা শ্রমিকদের আটজন সন্তান বৃত্তি নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে ভর্তি হতে পারছে। এখন ২০ হাজারেরও বেশি চা শ্রমিক পরিবারে ৩০০-এর বেশি গ্র্যাজুয়েট আছে এবং অন্তত পাঁচজন ডাক্তার ও আটজন ইঞ্জিনিয়ার আছে,  যা ২০ বছর আগেও ভাবা যেত না। পিউস যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তখন তার এসএসসির রেজিস্ট্রেশন ফি পরিশোধের জন্য বাড়িতে পালা গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। এখনো যারা এসএসসি পরীক্ষা দেয়, তাদের আর বাড়িতে থাকা গরু কিংবা ছাগল বিক্রি করতে হয়, না হয় অন্যদের সহায়তা নিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি জোগাড় করতে হয়। পিউসের চা শ্রমিক বাবা কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছেন, এর মধ্যে তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে তার ছোট ভাই বাবার কাজটি নিয়েছেন। এটা করতে হচ্ছে তাদের বসতবাড়িটা রাখার জন্য। এটা আরেকটা বড় জায়গা। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই বাড়িতে বসবাস করলেও এ বাড়ি ও জমির মালিকানা তাদের নয়।

মালিক পক্ষ নিলাম বাজারে চায়ের মূল্যবৃদ্ধি না হওয়ার যে পরিসংখ্যান দিয়ে চা শ্রমিকদের শোষণ অব্যাহত রাখতে চাচ্ছেন সেটা ‘কমনসেন্স’ দিয়েও বোঝা যায় এক ধরনের প্রতারণামূলক। কারণ ২০১২ সাল থেকেই চায়ের নিলাম বাজারে মূল্য কম এবং প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। তার পরও দেশের বড় বড় শিল্প গোষ্ঠী সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চা শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তারা নিশ্চয়ই কোনো রুগ্ণ শিল্পে বিনিয়োগ করেননি, কিন্তু দেশে যে বিশাল চায়ের বাজার তৈরি হয়েছে এবং ৫৪ শতাংশ উৎপাদন বেড়েছে এবং সর্বোপরি বিদেশ থেকে চা আমদানি করতে হচ্ছে সেটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

চা বাগানের মালিকরা মনে করেন, বর্তমানে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের যে নজিরবিহীন আন্দোলন হয়েছে সেটা সম্ভব হয়েছে চা শ্রমিকদের শিক্ষিত সন্তানদের কারণেই। তারা হয়তো এ বিষয়টি ঠিকই বুঝেছেন। এক সময়ের লেখাপড়া না জানা দরিদ্র ভিনদেশ থেকে আসা মানুষদের ক্রীতদাস হিসেবে ‘দাবিয়ে’ রাখা গেলেও একুশ শতকের এ সময়ে সেটা আর বেশি দিন সম্ভব হবে না সেটা ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। চা শ্রমিকদের সুশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা তাদের মা-বাবাসহ চা শ্রমিকদের একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে বদ্ধপরিকর।

আমি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, চা শ্রমিকদের শিক্ষিত সন্তানরা চা বাগানের মালিক হবে, সেদিন আর বেশি দূরে নয়। কেনিয়ার মডেলকে যদি বিবেচনায় নিই, তাহলে এটা আমরা আশা করতেই পারি, আগামী এক দশকের মধ্যে চা বাগানের চা শ্রমিকদের সন্তানরা তাদের নিজেদের বাগান পরিচর্যা করবে, যা ঘটবেই। তাকে মেনে নিয়ে সরকারের দিক থেকে প্রক্রিয়াটিকে ফ্যাসিলিটেট করাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এটা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ইমেজ বৃদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ।

 

মোহাম্মদ গোলাম নবী: উন্নয়নকর্মী

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা