বাংলাদেশের কৃষি, বিশেষ করে ধানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল। বছরে প্রতি হেক্টরে গড়ে ২৮৬ কেজি সার ব্যবহার করা হয়। দেশের সারের বাজারও আমদানিনির্ভর, ১ দশমিক ২ মিলিয়ন টনেরও বেশি সার প্রতি বছর আমদানি হয়। রাশিয়া ও বেলারুশ বিশ্বের প্রধান সার রফতানিকারক দেশ। যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে লক্ষ্য করে রফতানি নিষেধাজ্ঞা এর বাজারগুলোর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করেছে। ফলে বাংলাদেশে সারের আমদানি ও মজুদ বাধাগ্রস্ত হয়েছে সময়ে সময়ে। এখনো চাহিদার তুলনায় সারের মজুদ কম। সামনে বোরো মৌসুম। দেশের চালের বড় অংশের জোগান আসে বোরো থেকে। ফলে বোরোর উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শঙ্কায় পড়বে। বোরোর আবাদ রাসায়নিক সার ও সেচের ওপর ব্যাপক মাত্রায় নির্ভরশীল। তাই বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কৃষকের কাছে উৎপাদন উপকরণ সঠিক সময়ে পৌঁছে দেয়া জরুরি। সারের মজুদস্বল্পতার সুযোগ নিয়ে সুযোগসন্ধানী কিছু ব্যবসায়ী অতি মুনাফা লাভের চেষ্টায় রত, তাদের নিবৃত্ত করতে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশে সারের আমদানির বড় একটা অংশ আসে রাশিয়া থেকে। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া থেকে সার আমদানি নানা সমস্যার মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার শুধু কানাডা থেকে বেশি দামে পটাশিয়াম কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যকে বেশি পরিমাণে ইউরিয়া সার দেয়ার কথা বললেও এখনো দেশগুলো ‘সবুজসংকেত’ দেয়নি। সব মিলিয়ে আগামী জানুয়ারির পর সারের সংকট তৈরি হলে ফসল উৎপাদন থেকে ভোক্তাপর্যায় পর্যন্ত সব স্তরে প্রভাব পড়বে। সারের সংকট দেখা দিলে এ খাতে দাম বাড়বে। এতে মানুষের ব্যয়ের বোঝা বাড়বে। সরকার সার ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিলে অন্যান্য খাতে ব্যয় সংকোচন বা সমন্বয় করতে হবে। এভাবে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের চাপ পড়বে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সাড়ে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। তবে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ২৫ লাখ টন প্রয়োজন। এর মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। চাহিদার বাকিটা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করা হয়। এবার উৎপাদন কম হওয়ায় প্রায় ২২ লাখ টন সার আমদানি করতে হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। টিএসপি সার প্রয়োজন হয় সাড়ে সাত লাখ টন। কিন্তু দেশে উৎপাদন হয় এক লাখ টন। বাকিটা মরক্কো, তিউনিসিয়া থেকে আমদানি করা হয়। ডিএপি সারের প্রয়োজন হয় সাড়ে ১৬ লাখ টন। তার মধ্যে সাড়ে ১৫ লাখ টন সার চীন ও জর্ডান থেকে আমদানি করা হয়। এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে আট লাখ টন, যার পুরোটাই বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা হয়।

নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া কোনো খাতেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না। সারের ক্ষেত্রেও নিজেদের চাহিদা মোতাবেক উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। কিন্তু চাহিদার অতি সামান্যই উৎপাদন করতে পারে বাংলাদেশ। সারের ক্ষেত্রে দেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। রাতারাতি দেশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। সেই পরিমাণ কাঁচামালও নেই। তবে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে। সরকার যেভাবে বস্ত্র ও অন্যান্য বেসরকারি শিল্প-কারখানায় গ্যাসের জোগান দিচ্ছে, সেভাবে বেসরকারিভাবে সার উৎপাদন শিল্পও বিকশিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয়ের বিষয়টি তো ‘ওপেন সিক্রেট’। বলা হয়, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানায় নয়দিনে যে পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়, তা দিয়ে পুরো দেশের একদিনের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। চারটি কারখানায় গড়ে এক টন ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য ৪৩ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ঘনফুট (এমসিএফ) গ্যাস প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই পরিমাণ সার উৎপাদনের জন্য ২৫ এমসিএফ গ্যাস ব্যবহূত হয়। এ অপচয়ের মূল কারণ কারখানার পুরনো যন্ত্রপাতি। স্যারের অপচয়ও কমিয়ে আনতে হবে। কৃষকরা যেন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ না করেন। মাটি পরীক্ষার বিষয়টি সহজপ্রাপ্য করে তুলতে হবে। সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষককে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের কৃষি বিভাগে দক্ষ জনবল রয়েছে। সংকটে হিসাবের বিকল্প নেই। অপচয় কমিয়ে না আনতে পারলে সংকট আরো ঘনীভূত হবে।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই করতে জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগের বিকল্প জৈব সার প্রয়োগকে উৎসাহিত বা বাধ্য করার কৌশল নেয়া যেতে পারে। এক টন জৈব সার থেকে ১২০-১৫০ ডলার মূল্যমান প্রাকৃতিক পণ্য স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে সহজে তৈরি ও প্রয়োগ সম্ভব। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারে পরিবেশের অনুকূল উপযোগ মূল্যায়ন করলে তার মূল্য ডলারে আরো বাড়বে। সেজন্য জৈব সারের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ বিশেষ করে পরিবহনে ভর্তুকি প্রচলন করা যেতে পারে। ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি থেকে কিছু বরাদ্দ করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশ জৈব সারে কৌশলগত প্রণোদনা দিচ্ছে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি জৈব সারে ভর্তুকি দিচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের দাম বাড়িয়ে এর ব্যবহার নিরৎসাহিত করা হচ্ছে, আবার অনেক দেশ রাসায়নিক সারে বিদ্যমান ভর্তুকি কমিয়ে এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। চীন গ্রিন এগ্রিকালচার বাস্তবায়নে ভর্তুকি দিচ্ছে। ভুটান তো অনেক আগেই সে ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশ জৈব সারের প্রাচুর্যপূর্ণ উৎসগুলো চিহ্নিত এবং তা জৈব সারে

রূপান্তর করে কৃষিজমিতে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারে।

কৃষি উপকরণের মূল্য কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য বিপুল ভর্তুকি দেয়া হয়, যাতে কৃষি উৎপাদন সচল থাকে। সরকার উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরে ভর্তুকি প্রদান করে আসছে। বৈশ্বিক সংকটে রাসায়নিক সারের দাম ঠিক রাখতে ভর্তুকির টাকার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ২৮ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। উল্লেখ্য, সরকার রাসায়নিক সারে গত ১০ বছরে প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্রমাগত ভর্তুকি বৃদ্ধি দেশের জন্য অবহনযোগ্য বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যার প্রতিফলন দেখা যায়, সারের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে ইউরিয়া সারের খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২১ টাকা করা হয়েছে। এতে দেশে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং মোট উৎপাদনও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এ আশঙ্কা আরো তীব্র করেছে। অতিরিক্ত মূল্যে সার কেনার ফলে ডলারে খরচ মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ বাড়ছে।

সরকার কৃষকের সব সংকট নিরসনে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। নিশ্চয়ই বিশ্ববাজারে সারের সংকট মাথায় রেখেই আগামী দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। আমরা যদি অপচয় কমিয়ে আনতে পারি, কৃষককে পরিমিত সার ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে পারি, তবে আমরা এগিয়ে থাকব অনেকখানি। এক্ষেত্রে প্রত্যেককেই নিজের জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। সবার আগে দেশের কথা ভাবতে হবে, ভাবতে হবে দেশের কৃষক ও কৃষির কথা। খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে উৎপাদন কোনোভাবেই কমানো যাবে না। কৃষকের মধ্যে কেন যেন একটি ভয় কাজ করছে যে তারা সার পাবেন না বা অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনতে হবে। এমন শঙ্কা থেকে তারা সার বিক্রির খবর পেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এটি সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। গত এক যুগে দেশে করোনার টিকাই হোক বা বয়স্ক ভাতাই হোক কোনো কিছুরই বিতরণ সুষ্ঠুভাবে হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। সার নিয়ে সামাজিক মনস্তত্ত্ব তাই আস্থাহীনতায় গড়িয়েছে। কিন্তু সার বিতরণ সুষ্ঠু না হলে ধানের ফলনে ঘাটতি হবে। সেটি কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। তাই সার দিয়ে কৃষকের ভোগান্তি লাঘবে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।