সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হবে এবং যতদিন অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শিত না হবে ততদিন এ সুযোগ থাকবে, এমনকি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষও সে টাকার উৎস জানতে চাইবে না। এটা ঠিক যে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির গতি ফেরানোর জন্য অর্থমন্ত্রীর এ উদ্যোগ। তবে এ-সম্পর্কিত পূর্ব অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাপ্রদ ফল দেয়নি। বরং অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করার এমন উদার সুযোগে অসৎ ও দুর্নীতিবাজরাই লাভবান হবেন, বিপরীতে নিরুৎসাহিত হবেন নিয়মিত করদাতারা।
স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে বহুবার অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে ১৬-১৭ বার এ সুযোগ দেয়া হলেও কোনোবারই আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে শেয়ারবাজারে বা আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কিছু অর্থ প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে কোনোবারই এ অর্থের মালিকরা তাদের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ প্রদর্শন করার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেননি। ফলে এতবার সুযোগ দেয়া সত্ত্বেও দেশে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করার পরিমাণ খুবই নগণ্য এবং এ সুযোগ থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও কম হয়েছে।
প্রতি বছর বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে মূলত আয়কর ফাঁকি দানকারীদের বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়, তবে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হয়। ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বহু দেশেই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু তাদের পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের জবাবদিহিতার আওতামুক্ত রাখা হয় না। যেমনটা আমাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে অপ্রদর্শিত আয়ের মালিকরা ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। প্রশ্ন থেকে যায়, তাদের এভাবে কোনো ধরনের জবাবদিহিতার বাইরে রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত।
১৯৯৭ সালে ভারত ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম’ (ভিডিআইএস) জারি করে। ২০১৫ সালে ভারত ‘আনডিসক্লোজড ফরেন ইনকাম অ্যান্ড অ্যাসেটস ইমপজিশন অব ট্যাক্স অ্যাক্ট’ জারি করে। যেখানে তিন মাসের মতো এ সুযোগ রাখা হয়। কারণ জাল টাকার বিস্তার বা অন্য কোনো দুষ্কর্ম যেন না ঘটে, তার জন্য দুই কিংবা তিন মাসের অল্প ও নির্ধারিত সময় নির্ধারণ করা হয়। অথচ আমরা সুযোগটা দিচ্ছি বছরের পর বছর। তাছাড়া ১৯৯৭ সালে ভারতে ভিডিআইএসে করহার ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ছিল তখনকার করপোরেট করের চেয়েও বেশি। আর অন্যদের জন্য করহার ছিল ৩০ শতাংশ। তার মানে যারা অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করার সুযোগ নিয়েছে, তাদের তখনকার বিদ্যমান করহারের চেয়ে বেশি কর দিতে হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়মিত করদাতাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। এমনকি দেশটিতে ২০১৫ সালে ৩০ শতাংশ কর এবং ৩০ শতাংশ পেনাল্টি ধরে দেয়া হয়েছিল। কারণ এটা না থাকলে নিয়মিত করদাতার সঙ্গে যেমন সাংঘর্ষিক, তেমনি এ সুযোগ দেয়ায় দুষ্কৃতকারীরাও অপকর্মে প্রলুব্ধ হয়। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার মাধ্যমে সেসব নাগরিককে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়, যারা সম্পদের হিসাব ঠিকমতো দেন না এবং আয়কর ফাঁকি দেন। অন্যদিকে যেসব নাগরিক সরকারের আইন মেনে ঠিকঠাকমতো কর দেন, তাদের প্রতি অবিচার করা হয়। বাংলাদেশের আয়কর আইনানুযায়ী আয়ের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। কিন্তু যারা কর ফাঁকি দিলেন, তারা ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করে নিতে পারবেন। এটি কাম্য নয়। অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ গ্রহণকারীদের কোনোভাবেই সম্পূর্ণ দায়মুক্তির কথা বলা হয়নি ভারতে। যেমনটা আমাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে এনবিআর ও সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষও তাদের টাকার উৎস জানতে চাইবে না। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
অনেকে মনে করেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া না হলে বিদেশে চলে যাবে। এটা কিছুটা ঠিক। করোনা কিন্তু কেবল স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আসেনি, বরং এটি বহু অনিয়ম, অবিচার বাধা দেয়ার জন্যও এসেছে। একটা প্রাকৃতিক সিস্টেমে সে এটা করছে। যেমন আমরা গত দেড় বছরে কী দেখছি। কেউ কিন্তু এখন অর্থ পাচার করতে পারছে না। কারণ যে দেশে নিয়ে যাবে, সেখানেও পরিস্থিতি খারাপ। এরপর হুন্ডির ব্যবসা নেই। যে পদ্ধতিতে অর্থ পাচার হয়, অর্থাৎ একটা প্রাকৃতিক নিয়মে কিন্তু অর্থ পাচার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই কালো টাকার মালিকদের পক্ষ থেকে প্রভাব খাটিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ঘোষিত হয়েছে। কেউ কালো টাকা যেভাবেই অর্জন করুক না কেন, সে যদি ব্যবহার করতে না পারে (দেশে কিংবা বিদেশে) তাহলে এ টাকা তার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। অতএব, রাষ্ট্রের ও অনড় মনোভাবে থাকলে প্রযোজ্য কর দিয়েই আলাদা বিনিয়োগ ইনসেনটিভ ঘোষণার সুযোগে সে সাড়া দেবেই।
এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রযোজ্য কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সেখানে জরিমানা দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। জরিমানা কথাটি খুব স্পষ্টভাবে ছিল। কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না, এমন কথা বলা হয়নি। সে সময় তিন মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এ সময়ের পর অভিযানে নামা হবে। এরপর যার কাছে যা পাওয়া যাবে, তার জন্য জেল-জরিমানার ঘোষণাও ছিল। তেমনটা হয়েছিলও। সামনে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা যদি বলা না হয় এবং ঢালাওভাবে দীর্ঘ সময় ও সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে এ সুযোগ গ্রহণে অনীহা তৈরি হবে। এখন এনবিআরকে আরো স্পষ্ট করতে হবে, যারা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করছেন, সেটি কোন সময়ের। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার উদ্দেশ্য দুটো। প্রথমত, কর আহরণ। কর দিয়ে অর্থটা অর্থনীতির মূল প্রবাহে আসবে। এটিই রাষ্ট্রের তাত্ক্ষণিক উদ্দেশ্য। এখানে যদি রাষ্ট্র ছাড় দেয়, তাহলে বিদ্যমান করদাতাদের সঙ্গে একটা নিরুৎসাহমূলক পদক্ষেপে যাবে। দ্বিতীয়ত, এ অর্থ অর্থনীতিতে এসে উৎপাদনমূলক খাতে ব্যবহূত হবে। এতদিন এ টাকাটা অপ্রদর্শিত চ্যানেলে ছিল, এখন আনুষ্ঠানিক ধারায় আনতে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। দুটো জায়গার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এক. পুঁজিবাজারে এবং দুই. রিয়েল এস্টেট মার্কেটে। সবই কিন্তু অতীত। তারা এরই মধ্যে জমিজমা কিনেছেন কিংবা পুঁজিবাজারে লগ্নি করেছেন। তার মানে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। সেই টাকা এখন রেগুলার করে লাভ কী? সুতরাং যে উদ্দেশ্যে কালো টাকা সাদা করতে চাইছি, সেটিতে সত্যিই রাষ্ট্রের উপকার হবে কিনা দেখা দরকার। বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ঠিক কত, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাতও কম। সম্পদ কর ব্যবস্থাপনার মধ্যেও গলদ বিদ্যমান। তাছাড়া করবিন্যাস-সংক্রান্ত অসংগতির সংশোধন জরুরি।









