কৃষি আমাদের দেশের মানুষের আদি পেশা। আজকে যারা শহরে বসবাস করে, তাদের অধিকাংশেরই কৃষিতে কম-বেশি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। শহরের কর্মযজ্ঞের ব্যাপ্তি ও বৃদ্ধির বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার দূরত্ব বেড়েছে। পৃথিবীর বহু দেশে শহরকেন্দ্রিক কৃষি গড়ে উঠলেও বাংলাদেশে এখনো তা হয়নি। ফলে গ্রাম থেকে আসা কৃষিপণ্যে শহরবাসীর নির্ভরশীলতা প্রায় শতভাগ। শহরের আওতা ও আয়তন দুটোই বেড়েছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের জোর কমে এবং অতীত সংস্কৃতিতে মনোনিবেশ করার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। অনেকের ধারণা সেখান থেকেই ছাদ কৃষির উদ্ভব। পৃথিবীর বহু দেশে অর্নামেন্টাল গাছপালা দিয়ে বাসার আঙিনা সাজানো বহুদিনের প্রচলন হলেও আমাদের দেশে তা আসে বহু পরে। ব্যাকইয়ার্ড গার্ডেনিং এখন বহুল ব্যবহূত শব্দ। ছাদ কৃষি তার বাণিজ্যিক সংস্করণ বললে অত্যুক্তি হবে না।
কিছু সাংসারিক চাহিদা পূরণ আর কিছু মনের চাহিদা পূরণ ছাদ বাগান করার প্রধান উদ্দেশ্য। হাত-পা গুটিয়ে একবারে বসে না থেকে আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম করার একটি সুযোগ ছাদ বাগান। প্রায় শতভাগ মানুষের মনে একটি প্রত্যাশা থাকে একটি বাড়ি, যেখানে চারদিকে একটু ফুলফলের বাগান, ছোট্ট একটি পুকুর এবং একটু খোলা বসার জায়গা থাকবে, যেখানে অবসর সময় বসে আলাপচারিতা করা যাবে স্বাচ্ছন্দ্যে। বিশ্বব্যাপী মানুষের এ প্রবৃত্তি বোধহয় প্রায় একই রকম। ট্রেনিং প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে চীনের ন্যানজিংয়ে ৪৫০ বছরের একটি বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চীনের ঐতিহ্য দেখানোর জন্য, যা প্রমাণ করে বিশ্বব্যাপী মানুষের আদি বাসনার যথেষ্ট সর্বজনীনতা রয়েছে।
শুধু অর্থনৈতিক বিচারে ছাদ কৃষি লাভজনক নয়, একথা সত্য। ছাদ কৃষিতে সাফল্য পেতে হলে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে ফুল, ফলমূল, শাকসবজি উৎপাদন করতে হবে। ছাদের স্থায়িত্বের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে খেয়াল করতে হবে। ছাদের ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রকৌশলী ও কৃষিবিদদের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমন্বয় রাখার প্রয়োজন হবে। উচ্চ ভবনের ছাদে বাগান, বিষয়টি মাথায় রেখে ছাদ বাগান করতে হবে। কোন ধরনের ফুল, ফলমূল, শাকসবজি ছাদে ভালো হবে তারও ধারণা থাকতে হবে। অতিমাত্রায় বড় হয়ে যায় এমন গাছপালা লাগানো উচিত হবে না। ছাদ বাগানে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে এমনভাবে দুষ্প্রাপ্য পানি ব্যবহার করা উচিত, যাতে ভূগর্ভস্থ পানিতে কম চাপ পড়ে। বাসার অন্যান্য কাজে ব্যবহূত পানি বা ছাদে সংরক্ষণ করা বৃষ্টির পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা গেলে ছাদ বাগান শহরের পরিবেশ রক্ষায় নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।
এফএও এবং আমাদের এক গবেষণায় দেখা যায়, ছাদ বাগানের বিভিন্ন উপকরণ প্রস্তুত ও সরবরাহে এবং অগ্র-পশ্চাৎ সংযোগে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। অপেক্ষাকৃত ধনী, কর্মব্যস্ত ও কর্মহীন এবং বয়স্ক মানুষের কিছুটা শৌখিন কাজের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি আনায় এবং সময়-অসময় নিজের বাগান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজি, ফলমূল তুলে এনে রান্না করে খাওয়া এবং প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনদের মাঝে বিতরণ করার যে নির্মল আনন্দ, তার অর্থনৈতিক মূল্য সাধারণ বেনিফিট-কস্ট দ্বারা নিরূপণ করা সত্যিই দুরূহ।
আর্থিক, আনন্দদায়ক ও পুষ্টির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে মধ্যবয়সী ও শিক্ষিত নারী, অপেক্ষাকৃত ধনী এবং শৌখিন ব্যক্তিরাই ছাদ বাগান বেশি করে থাকেন। মূলত অব্যবহূত এবং ফেলে রাখা জায়গায়ই ছাদ বাগান করা হয়। ভালো মানের ছাদ বাগান করতে হলে বিভিন্ন ধরনের ফুল, শাকসবজি এবং ফলমূল বিষয়ে ধারণা বা জ্ঞান রাখার প্রয়োজন হয় এবং ওইসব গাছের চারা কোথায় পাওয়া যায়, সে বিষয়েও জানা দরকার হয়। দরকার হয় টব, ভালো মানের মাটি, জৈব সার এবং রাসায়নিক সারের। মাটির বিকল্প কোকোপিটও ছাদ বাগানে ব্যবহার হচ্ছে। উল্লিখিত কার্যক্রম পরিচালনায় তৈরি হচ্ছে মানুষের জীবিকার উৎস।
ছাদ বাগান বিষয়ে একটি সুন্দর ও মানসম্মত গাইড বা ম্যানুয়েল থাকলে সবার জন্য উপকারী পদক্ষেপ হবে। তবে ছাদ বাগান বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার যে ছাদকে যেন জঙ্গল করে ফেলা না হয় বা জনবহুল শহুরে জীবনে ছাদে একটু হাঁটাচলার সামান্য সুযোগটিও যেন আমরা নষ্ট করে না ফেলি, সেদিকে খেয়াল রাখা খুবই জরুরি। একজনের ছাদ বাগান কোনোভাবেই যেন অন্যের বসবাসের কোনো অসুবিধার কারণ না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বৃষ্টির পানি এবং ভূ-উপরস্থ পানি ব্যবহার করে ছাদ বাগান সম্প্রসারণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জায়গার স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতেও ছাদ বাগান করার সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় কৃষিনীতিতে ছাদ বাগানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং এফএও ছাদ বাগানের সম্ভব্যতা যাচাই ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে। শহর কৃষির সার্বিক উন্নয়নে ওই পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ছাদ বাগানের পরিকল্পিত সম্প্রসারণের মাধ্যমে শহরের পরিবেশগত বিপর্যয় কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। ভবিষ্যতে কৃষিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ মোতাবেক ছাদ বাগান সম্প্রসারণে সরকারের সহায়তা আরো বাড়ানো হবে—এ প্রত্যাশা শহরবাসীর।
ড. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ ও পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ










