করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে জেএসসি এবং এসএসসির ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এইচএসসি মূল্যায়ন করা হবে। এ নিয়ে কেউ ইতিবাচক আবার অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। যা হোক পরীক্ষা নিয়ে সবার মধ্যে যে সংশয় ছিলো তা কেটে গেছে। অনেক অভিভাবক হয়তো হা-হুতাশ করছেন সন্তান আমার ভালো রেজাল্ট করতে পারলো না। শিক্ষার সাথে রেজাল্টের সম্পর্ক নেই তা আমি বলবো না। শিক্ষার সাথে রেজাল্টের অবশ্যই সম্পর্ক আছে তবে তা হতে হবে জীবনের সাথে সম্পর্কিত। যে শিক্ষা জীবনের সাথে জড়িত নয় বা মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করে না সে শিক্ষা আসলে প্রকৃত শিক্ষা নয়। যে শিক্ষার দ্বারা আমি আমার ভেতরের মানুষটিকে জাগাতে না পারি সে শিক্ষা নিরর্থক। তাই শুধুমাত্র পরীক্ষার রেজাল্টের শিক্ষা আসলে প্রকৃত শিক্ষা নয়, অথচ এ চিন্তাচেতনাই আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি অবিরত। এ জন্য অভিভাবকও অনেকটা দায়ী। এখনকার অভিভাবকের মূল ফোকাস থাকে সন্তানদের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া। শিক্ষাকে বেটে খেতে হলেও যেন পরীক্ষায় সন্তানের ভালো রেজাল্ট চাই। সন্তানদের মেধাবিকাশের কথা আমাদের কেউ ভাবে না। অভিভাবক আর শিক্ষকদের অতিরিক্ত চাপে আজকের বেশীর ভাগ সন্তানরা দিশেহারা।   

মেধা বিকাশের জন্য পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস নামে একটা বিষয় আছে তা তারা ভুলে যায়। এই এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস একাডেমিক সার্টিফিকেট অর্জনে সহায়ক না হলেও প্রত্যেকের সামগ্রিক ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস না থাকলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস বা সহশিক্ষা পাঠক্রমের  গুরুত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠান বা অভিভাবকরা তা অনুধাবন করে।

সহশিক্ষা পাঠক্রমিক কার্যক্রম বলতে সাধারণত পুঁথিগত বিষয়ের বাইরের জ্ঞানার্জনকে বুঝায়। সহ শিক্ষা পাঠক্রমিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম যা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সাধারণ পাঠ্যক্রমের অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক (বাধ্যতামূলক নয়), সামাজিক জনহিতকর এবং সমবয়সী শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এ শিক্ষা একঘেয়েমি ও অবসন্নতা দূর করে সৃজনশীলতা বিকাশে পূর্ণ সহযোগিতা করে এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে মূল্যবোধ উজ্জীবিত করে। সহ শিক্ষার এ কার্যক্রমের মাধ্যমেই যেহেতু তরুণরা অনেকাংশে বাস্তব জীবনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হয় তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস বা সহ শিক্ষা পাঠক্রমিক কার্যক্রম এর গুরুত্ব বুঝা উচিত। জেনে নেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সহশিক্ষা কার্যক্রম কেন জরুরি। 

১। একাডেমিক পারফরমেন্স উন্নত করে: সহশিক্ষা কার্যক্রমে কিছু সময় ব্যয় হলেও এটা একাডেমিক পারফরমেন্সকে উন্নত করে। কারণ এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলে। সহশিক্ষা কার্যক্রম উচ্চতর একাডেমিক শিক্ষা অর্জনে নিজের ভিতরের আকাঙ্ক্ষাকে প্রসারিত করে।  

২। নিজের আগ্রহ প্রকাশ করার সুযোগ থাকে: যখন আপনি বিভিন্ন সহশিক্ষায় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন তখন আপনার বিভিন্ন আগ্রহ থাকে এবং পরিশেষে পছন্দের আগ্রহটি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। হয়তো এতদিন আপনি জানতেন না যে কোনটি আপনার পছন্দের। ধরুন আপনার মনে মনে আঁকাআঁকি, কবিতা লেখা, গান করা, বিতর্ক করা ইত্যাদির আগ্রহ আছে কিন্তু গান করতে গিয়ে দেখলেন আপনি  অনেক সুন্দর গান করতে পারেন। এ গানই আপনাকে আপনার সামগ্রিক জীবনকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে।   

৩। আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়: ধরুন আপনি কবিতা আবৃতিতে খুব ভালো। শিক্ষক আপনাকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। আপনি আবৃতি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বেশ ভালো করলেন। সবাই আপনাকে সম্মানিত করলেন। এতদিন আপনি অংশগ্রহণ করেন নাই বিধায় নিজের প্রতিভা সম্পর্কে আপনার ধারণা ছিলো না। আপনার এমন প্রতিভা অবশ্যই আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করতে অনেক উৎসাহিত করবে। আপনার আত্মবিশ্বাসের উন্নতি হয়ে গেলে আপনার জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে আরও উম্মুক্ত হয়ে উঠবেন।

৪। সামাজিক সুযোগগুলো উম্মুক্ত হয়: এখন ঘরে বসে থাকার সময় নয়। নিজেকে উন্নতি করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ। সহজেই আমরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারি এবং মতবিনিময় করতে পারি একে অপরের সাথে। শুধু নিজ প্রতিষ্ঠানের বন্ধু না এখন যেন বন্ধুর বিস্তৃতি হওয়ার সুযোগ অনেক বেশী। বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে বাইরের দুনিয়ার সাথেও পরিচিত হওয়া যায়। সেবামূলককাজেও নিজেকে নিবিষ্ট করা যায়। নিজের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। সাথে সাথে গড়ে উঠে পারস্পারিক বন্ধুত্ব। সত্যিকারের বন্ধু বানানো কঠিন হলেও এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস বন্ধু তৈরি করার সহজ উপায়।

৫। দলগতভাবে কাজের শিক্ষা অর্জন: বাস্তব জীবনে দলগতভাবে কাজ আমাদের সবারই করতে হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যার অনেকাংশেই অনুপস্থিত। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি জীবনের অন্যতম শর্ত হলো টিম ওয়ার্ক বা দলগত ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এই দলগতভাবে কাজের শিক্ষার মাধ্যমেই নেতৃতের শিক্ষা অর্জন করা যায়। এ শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস। 

৬। সময়ের সদ্ব্যবহার: সময় চলে যায় সময়ের তালে। জীবনকে উপলব্ধি করতে হলে সময়টাকেও করতে হবে আনন্দময় ও উপভোগ্য। অনেক অভিভাবকরা মনে করেন ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, গোসল ইত্যাদির বাইরে পড়ালেখা ছাড়া আর কি হতে পারে- আসলে এমন মনমানসিকতার অর্থ হলো সন্তানদের একটা রিমোট কন্ট্রোলের মাঝে বেঁধে ফেলা। তাদের এক্সট্রা কারিকুলার কিছু করতে দিলে তারা সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং সময়টাও হবে তাদের জন্য উপভোগ্য।  

৭। চাকরির প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রাখা: নিয়োগকর্তারা সবসময় উপযুক্ত বা শ্রেষ্ঠ প্রার্থীকে খুঁজে থাকেন। চাকরি প্রার্থী সম্পর্কে নিয়োগকর্তাদের প্রথম ইম্প্রেশন সিভির মাধ্যমে তৈরি হয়। চাকরিদাতার কাছে নিজেকে তুলে ধরার উপযুক্ত কৌশল। সিভি হচ্ছে একজন ব্যক্তির পরিচয়, যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রাপ্তি, ইচ্ছা, ইত্যাদির রিপোর্ট। সিভিতে পেশাগত ও শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি আরো কিছু ব্যক্তিগত তথ্য যেমন নিজের পছন্দ, অপছন্দ, আগ্রহ, শখ, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা ইত্যাদিও যোগ হয়। এখন আগের দিন নাই। নিয়োগকর্তারা সিভির চৌহদ্দি খুঁটিয়ে দেখেন চাকরি প্রার্থীর কী কী গুণ আছে। শুধু ভালো রেজাল্টের মধ্যেই তারা এখন আর থেমে থাকে না। নিয়োগকর্তারা দেখেন প্রার্থীর দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে কিনা, তাই এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিস চাকরি প্রার্থীর সিভি সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে।

লেখক: ব্যবস্থাপক, মানব সম্পদ ও প্রশাসন
মুন্ডিফার্মা (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড