জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত এবং কভিড-১৯-এর সংমিশ্রিত বিষাক্ত আবহ এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোয় তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। ফলে ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড ২৩৫ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন হবে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

এ ধরনের সংখ্যাতত্ত্বের ক্ষেত্রে মাথাপিছু কোনো উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন। কিন্তু এটাও সত্য, এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি মানুষের জীবন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য সামনে যে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে এবং বড় ক্ষতি করবে, সেজন্য নভেল করোনাভাইরাস নয়, বরং দায়ী থাকবে অতিমারীর ফলে সৃষ্ট পরবর্তী ধাক্কা। ধারণা করা হচ্ছে, অতিমারীর প্রভাবে সৃষ্ট খাদ্যাভাব আরো বেশি জীবন কেড়ে নেবে।

বিগত বছরে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৩০ মিলিয়ন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ মিলিয়ন, যা কিনা এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার রাষ্ট্রগুলোই খাদ্যনিরাপত্তার অভাবে বেশি ভুগছে। খালি পেট একটি পুরো প্রজন্মের প্রবৃদ্ধি আটকে দিতে পারে।

উপরন্তু, দুর্ভিক্ষের একাধিক জল্পনা ছড়িয়ে পড়ায় সরকারগুলো জনগণ ও অর্থনীতিকে অতিমারী থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সরকারি বাজেট সম্প্রসারণের কাজ করছে। এ ধরনের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়টি এ মুহূর্তে একটু কঠিন। তবে দুর্ভিক্ষ রোধ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেকোনো বিনিয়োগ হবে সময়োপযোগী।

আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে আমরা যে অর্থ ব্যয় করছি, তা থেকে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারছি। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক মানবিক সব প্রয়োজন মেটাতে একটি প্রত্যাশিত পদ্ধতির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ করছে। এটি স্পষ্টত প্রমাণিত যেকোনো সংকট প্রতিরোধে মানবিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা সংকট প্রতিকারের চেয়ে অধিক কার্যকর এবং সাশ্রয়ী। এ-জাতীয় কৌশল কষ্টার্জিত উন্নয়ন অর্জনগুলোকে সুরক্ষা দেয়।

উদাহরণ হিসেবে গত বছরের বাংলাদেশে জাতিসংঘ এবং রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্টের দুর্যোগ-পূর্ববর্তী গৃহীত কার্যক্রমটি অনন্য। তারা ভয়াবহ বন্যার আগে দুর্যোগ কবলিত হতে পারে এমন এলাকার মানুষকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়েছিল, যাতে তারা তাদের নিজেদের ও গৃহপালিত পশু সরিয়ে নিতে পারে। এতে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছিল এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় খরচ অনেক কম হয়েছিল।

জরুরি খাদ্যাভাব সম্পূর্ণ দুর্ভিক্ষে পরিণত হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আসন্ন ক্ষুধা অতিমারী মোকাবেলায় আমরা একই রকম প্রতিরোধ পদ্ধতির প্রয়োগ করছি। অতিমারী প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চরম আবহাওয়া ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প আয়, ভঙ্গুর মান শৃঙ্খলা এবং সংঘাত ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ, বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যাংকের গঠিত তহবিল) গত ছয় মাসে (এপ্রিল, অক্টোবর, ২০২০) খাদ্যনিরাপত্তায় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে। এই অর্থ একাধারে কভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে চলমান একটি প্রকল্প থেকে অর্থ সরিয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার ক্ষুদ্র ডেইরি ও পোলট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে অর্থ সাহায্য করেছে। অতিমারীর প্রভাবে হাইতিতে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমে আসবে আশঙ্কা করা হয়েছিল। এ অবস্থায় আইডিএ কৃষকদের বীজ ও সার প্রদানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র সেচ সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষিকে সচল রাখার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা নিশ্চিত করেছে। আইডিএ আরো ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল গঠন করেছে ভবিষ্যতের যেকোনো আসন্ন খাদ্য সংকট এবং রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার উদ্দেশ্যে। 

২০২০ সালের জুনে একইভাবে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় জরুরি পর্যবেক্ষণ তহবিল সোমালিয়ায় খাদ্য সংকট এড়াতে অর্থসহায়তা প্রদান করেছিল। এতে পঙ্গপাল, বন্যা ও কভিড-১৯-এর ত্রিমাত্রিক হুমকি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে এবং রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি হ্রাস পেয়েছে। শিগগিরই দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে জাতিসংঘ পানির উৎস সম্পর্কিত বিরোধ, স্বাস্থ্যকর প্রাণিসম্পদ, পরিবারের আর্থিক উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ এবং বৃহৎ জনসংখ্যার বাস্তুচ্যুতি রোধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বসহকারে কাজ শুরু করবে।

কার্যকর কভিড-১৯ টিকা আসার মাধ্যমে বিশ্ব হয়তো শিগগিরই অতিমারীর শেষ দেখতে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক দুর্বল রাষ্ট্রই অতিমারীর পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদে উপার্জন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক খাতে সংকটের সম্মুখীন হবে।

কার্যকর পদক্ষেপ এই কঠিন সময়কে সহজ করতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের বর্তমানকে গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে এবং পূর্বপ্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে ভবিষ্যতের খরচ কমাতে। যেকোনো বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা মেধাবী, নৈতিক এবং সাশ্রয়ী কৌশল। জীবন রক্ষা এবং রূপান্তর করতে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে ক্ষুধা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি সবার জন্য আরো মজবুত ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে পারি।

(স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
)

 

মার্ক লোকক: জাতিসংঘের হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল

এক্সেল রোটজেনবার্গ: বিশ্বব্যাংকের অপারেশন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

 

ভাষান্তর: মুহাম্মাদ হাসান রাহফি