যাত্রার সাত বছরের মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা। করোনাকালে এর সম্প্রসারণের গতি আরো বেড়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি শতভাগের বেশি। সন্দেহ নেই, প্রযুক্তির উন্নয়নে করোনা মহামারীর মাঝেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং বড় ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উত্কর্ষের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ব্যাংকিং সেবাকে আরো উন্নততর করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এটা অর্থনীতির চাকাকে আরো গতিশীল ও মজবুত করতে সাহায্য করবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারতাকে সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে সুশাসনের ঘাটতিও লক্ষ করা যাচ্ছে। ইদানীং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কিছু অনিয়মের খবর সামনে এসেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনৈতিক প্রতিযোগিতাও চলছে। এসব ঘটনা এজেন্ট ব্যাংকিং প্রসারে সহায়ক নয়।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দেশের একটি বড় অংশকে এখনো বিদ্যমান ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যায়নি। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেশকিছু ব্যাংকের পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি বড় অংশের নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এলেও তাদের ব্যাংকের ঋণসেবার আওতায় আনার জন্য ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ ও আমানত সেবা ব্যতীত আমাদের মতো দেশে একটি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ এখনো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দেশের কৃষি ও গ্রামীণ খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী খুব সামান্যই ঋণসেবা প্রদান করতে পেরেছে। প্রকৃতপক্ষে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যাংকিং সেবা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। একে ধরে রাখা চাই। ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান থাকায় খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো ভালো একটি উদ্যোগে যেন এমন কোনো ছায়া না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। 

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এ সেবা যত্রতত্র ও অপেশাদার ব্যক্তি দিয়ে করানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন এলাকায় মোবাইলের ফ্লেক্সি লোড দোকানদার, মুদিখানার দোকানদার, ওষুধের দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক এনজিওর আদলে ঋণ বিতরণ করছে। কোনো কোনো ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংক টাকা পাঠানোকেই প্রধান কাজ মনে করছে। কোনো কোনো এজেন্ট বিল কালেকশন করছে এবং সেই টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সটকে পড়ার ঘটনাও আছে। ফলে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমন ঘটনা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থায় চিড় ধরাতে পারে। এটি বন্ধে তদারকি আরো জোরদার করতে হবে। বাজার দখলের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের স্থায়িত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। শেষ বিচারে যে ব্যাংকের   প্রযুক্তি ও সেবার মান ভালো হবে, তারা টিকে থাকবে। বেশির ভাগ ব্যাংকের এজেন্টদের কার্যক্রম শুধু আমানত সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ায় গ্রামের অর্থ শহরে চলে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে শহর ও গ্রামের মানুষের সম্পদবৈষম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এলাকাভিত্তিক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্টসংখ্যক জনগণকে এর আওতায় না আনা হলে লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্তও নেয়া হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। গ্রাম থেকে কত শতাংশ আমানত শহরে আনা যাবে, গ্রামে কত শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে, তাও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এতে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি চাঙ্গা হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশও এ নীতি অনুসরণ করতে পারে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। ইতিবাচক বিষয় হলো, বাংলাদেশ এরই মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার জন্য বীমা চালু করেছে। এর পরিমাণ আরো বাড়ানো যেতে পারে। ২০১৭ সালে কার্যরত ব্যাংক, তাদের এজেন্ট ও সেবা গ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে ‘প্রুডেন্সিয়াল গাইডলাইনস ফর এজেন্ট ব্যাংকিং অপারেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার শৃঙ্খলা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তদারকি বাড়ানো দরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কমপ্লায়েন্স পরিপালনে কঠোর হতে হবে।

দেশের সুষম ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনে ব্যাংকিংয়ের আওতাবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে অর্থনৈতিক মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক উদীয়মান শক্তির দেশ হিসেবে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির মহাসড়কে ওঠার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেও দেশের সক্ষম সব নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা জরুরি। আর সেজন্য প্রয়োজন দেশের সক্ষম সব নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার বিকাশে প্রকৃত অর্জন নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা অর্থাৎ আর্থিক লেনদেন, ঋণ ও আমানতের সার্বিক বিকাশের বিকল্প নেই এবং এর মাধ্যমেই সত্যিকারের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এখন সময় এসেছে তিনটি ব্যাংকিং পণ্যকে আলাদাভাবে বিবেচনায় এনে কার্যকরী কৌশল বাস্তবায়নের। প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য এ পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির তিন ধরনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত. আর্থিক লেনদেনে অন্তর্ভুক্ত জনগণ, দ্বিতীয়ত, আমানতে অন্তর্ভুক্ত জনগণ এবং তৃতীয়ত, ঋণে অন্তর্ভুক্ত জনগণ। লেনদেন ও আমানত সংগ্রহে শুধু তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে সফলতার মূল নিয়ামক হলো সেবার দ্রুততা ও মান। কিন্তু ঋণ প্রদান, এর কার্যকরী ব্যবহার এবং আদায়ের জন্য সেবার দ্রুততা ও মানের পাশাপাশি আরো বেশকিছু নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা অর্জনের জন্য বিশেষ কৌশলের প্রয়োজন। করোনাকালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সেবার মানও বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা, সেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে এমএফএস সেবার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য অর্জন হয়নি। সেবাটি এখন শুধু অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হয়ে গেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকগুলো এ সুযোগ কাজে লাগাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।