আগামীকাল ঈদুল আজহা। করোনা-পরবর্তী প্রথমবারের মতো এ উৎসব উদযাপিত হতে যাচ্ছে এবার। মহামারী পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এখন। যদিও আবারো করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা কিছুটা শঙ্কা তৈরি করছে। তাই উৎসব পালনের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। ঈদুল আজহার মাহাত্ম্য অনেক। স্রষ্টার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম উপলক্ষ এটি। একই সঙ্গে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসবের একটিও এটি। এ ঈদে সামর্থ্যবানরা কোরবানি দেন। ত্যাগ কোরবানির প্রধান মর্মবাণী হলেও আমাদের সবসময় তা স্মরণে থাকে না। ফলে এ সময় অনেকের মধ্যে ত্যাগের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোগবিলাস, অপচয়। আধ্যাত্মিকতাকে ছাপিয়ে যায় বস্তুগত আনুষ্ঠানিকতা। কোরবানির মধ্যে যে উৎসর্গের মহিমা রয়েছে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোজনোৎসব। এটা কাম্য নয়। ঈদুল আজহায় কোরবানির মধ্য দিয়ে স্রষ্টার প্রতি আত্মনিবেদন প্রদর্শনের পাশাপাশি সামাজিক কিছু কর্তব্য পালনের তাগিদও বিদ্যমান। এ তাত্পর্য মনে রেখে সমাজে ত্যাগ ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা।
এবার এমন এক সময়ে কোরবানি উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুল মানুষ বন্যার কবলে। কোথাও কোথাও পানি নেমে গেলেও কমেনি দুর্গতদের দুর্ভোগ। অনেকের মাথার ওপর আচ্ছাদন নেই। বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে ভিজছে তারা। নতুন করে ঘর নির্মাণের লড়াই করছে। ত্রাণ দেয়া হলেও তা অপর্যাপ্ত। খাওয়ার পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট। এর মধ্যে কোরবানিই-বা কীভাবে দেবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। নানা সমস্যায় ভুগছে তারা। এটা একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, দেশে এখনো অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। তারা ঠিকমতো অন্ন জোগাতে পারে না। অপুষ্টিজনিত রোগব্যাধিতে জর্জরিত অনেক শিশু। বন্যার্তদের পাশাপাশি এ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা ভাবা সামর্থ্যবানদের একান্ত কর্তব্য। আলোচ্য উৎসবে আমরা যেন এটি বিশেষভাবে মনে রাখি।
কোরবানির ঈদে একটি বড় ইস্যু হলো কাঁচা চামড়ার বেচাকেনা। এ উৎসবে জবাই করা পশুর চামড়ার ওপর আমাদের চামড়া শিল্পগুলো অনেকখানিই নির্ভরশীল। এরই মধ্যে সরকার কিছুটা বাড়িয়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর দুই বছরে চামড়ার চাহিদা কমে গিয়েছিল। ফলে এক বছরের মজুদ পরের বছরেও থেকে যায়। পাশাপাশি অর্থ সংকটে চামড়া সংগ্রহে ছিল ভাটা। এতে বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। নামমাত্র দামও না মেলায় দেশজুড়ে চামড়া ফেলে দেয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। মহামারীর দুই বছর ঈদ উৎসবের সময় এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল বিস্তর। এর পেছনে অবশ্য কিছু অসাধু ট্যানারি মালিকের সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়েছিল। এবার সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম যেন কেউ কমিয়ে দিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।
ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। কয়েক বছর ধরে সিটি করপোরেশন নগরবাসীকে নির্ধারিত জায়গায় পশু কোরবানিতে অভ্যস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গতবার ঈদের আগেই মাইকিং করা হয়েছিল। লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছিল, যাতে নগরবাসী নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি দেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, যেখানে-সেখানে পশু জবাই করা হয়েছে। এবারো সে ধরনের কিছু নির্দেশনা এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। তাতে কোরবানির পশুর বর্জ্য রাত ১০টার মধ্যে অপসারণের কথা বলা হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে এগুলোর পরিপালন ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও রাখতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা।
নতুন করে করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ছে। তাই কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবার বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনা গেলে এডিস মশার বিস্তার বাড়বে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে। তাই কোরবানির বর্জ্য দ্রুত সরিয়ে ফেলার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে তত্পর থাকতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মানুষ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে উদ্যোগী হলে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কাজ অনেক সহজ হবে। সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। ঈদুল আজহা নামাজের জামাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ আট দফা নির্দেশনা দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এগুলো আমাদের মেনে চলা জরুরি।
প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ও করোনার নতুন শঙ্কার মধ্যে এবারো পালিত হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা। তাই প্রত্যেকেরই আরো বাড়তি সচেতনতা ও সাবধানতা দরকার। ঈদুল আজহার উদযাপন নিরাপদ ও সম্প্রীতির হোক—এ কামনা করি। সবাইকে এ আনন্দ উৎসবের শুভেচ্ছা।










