সুশাসন ও জবাবদিহিতা টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে সুশাসন ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে বা আদৌ আছে কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ ড. কেএএস মুরশিদ রচিত ‘দ্য অডস রিভিজিটেড’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সেটিরই পুনরুল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না’। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে তাকালে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চিত্রটি সহজেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার নীতি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা। একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোয় যখন জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার সুফল উপলব্ধি করতে পারে জনগণ। জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, যা উন্নয়নকে টেকসই রূপ দিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে এর সুফল থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। এর অন্যতম সূচক হলো আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে দেশে আর্থিক খাত থেকে শুরু করে বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। সরকার ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে এ পথচলা মসৃণ করা যাবে না। তাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া হবে। 

একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো, কোনো দেশের জাতীয় আয় যদি চলমানভাবে ৫-৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে তাহলে বুঝতে হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংঘটিত হয়েছে। তখন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও কাঠামোগত পরিবর্তনকে উন্নয়নের পরিমাপক হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দিকে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতির কিছু অনুষঙ্গ দেখে হোঁচট খেলেন। তারা দেখলেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশি লোকজন অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো সুফল বা কল্যাণ ভোগ করতে পারেনি। তখন তারা জাতীয় আয় বৃদ্ধিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণা থেকে অন্যত্র দৃষ্টি ফেরালেন। সত্তরের দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণাকে তারা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পুনর্বণ্টনের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্ব্যাখ্যা প্রদান করলেন। এই মতবাদের প্রবক্তাদের অন্যতম ডাডলি সিয়ার্স। তিনি দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অসমতার প্রসঙ্গ আনলেন। তার মতে, যদি এ তিনটি সূচক উঁচু স্তর থেকে একটা সময়ের ব্যবধানে নিচু স্তরে নেমে আসে, তবে সন্দেহাতীতভাবে সংশ্লিষ্ট দেশটির উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। মাথাপিছু আয় যদি দ্বিগুণও হয় আর দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অসমতা যদি সামাজিকভাবে বা স্বতন্ত্রভাবে বেড়ে যায় কিংবা আংশিকভাবে বেড়ে যায়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলা যাবে না।

সময়ের পরিক্রমায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংজ্ঞা আধুনিক রূপ ধারণ করেছে। মাইকেল টোডারো আধুনিক এ ধারার অর্থনীতিবিদ। তার মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সামাজিক কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন ঘটে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়, অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূর হয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটবে। ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন আসবে। আর এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে হাজির হয়। উপরের নিতান্ত তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা দেখলাম অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে তার পরিসরকে ব্যাপকতার সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। মাথাপিছু আয় থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পৃক্ততা মানুষের জীবনযাত্রায় আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের সীমা পর্যন্ত ব্যাপৃত হয়েছে।

উন্নত অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সেখানে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটে না। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য ও ওষুধের মান রক্ষায় ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নাম সবার জানা। বিশ্বের সবাই জানে কতটা শক্তিশালী তারা। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো পণ্য বিনা পরীক্ষায় বিক্রি করা যায় না। শুধু তাই নয়, ভোক্তা অধিকার রক্ষায়ও তাদের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নীতি অনুসরণ করা হয়। দেশগুলোয় আইনের শাসন খুবই কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও দুর্বল ব্যক্তিভেদে আইনের প্রয়োগের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো এতটাই ভঙ্গুর যে সবাই ওপরের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। আইনের মধ্যে থেকে ব্যবস্থা নিতেও অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো ভয় পায়। শুধু তাই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতির বিস্তার ও একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেই যাচ্ছে; কিন্তু কারো বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ প্রশংসিত হয়ে আসছিল আজ তাদের নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে সুশাসনের সব উপাদানকে হয়তো প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, তবে অনেক উপাদান যখন কার্যকর হয় তখন সুশাসনের গুরুত্ব মানুষ উপলব্ধি করতে পারে এবং সুশাসনের প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা আগে দুর্নীতিকে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে ধরতে রাজি হননি। প্রখ্যাত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ গুনার মিরডাল বলেছেন উন্নয়নের স্বার্থে দুর্নীতিকে প্রতিহত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা। তার এ বক্তব্য প্রথমে অর্থনীতির পণ্ডিতেরা মানতে রাজি হননি। পরে তারা কথাটির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে আমাদের বড় অন্তরায় দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। দুর্নীতির কারণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান দেয়। দুর্নীতির কারণে আমাদের সমাজে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ তৈরি হয়; সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকট হয়; সরকারের ঋণ বাড়ে, সমাজের টার্গেট গ্রুপ তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়; জিডিপিতে প্রায় একটি বড় অংশ নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমির জন্ম হয়; দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংক প্রথম গভর্ন্যান্স সম্পর্কে একটা পর্যালোচনা করে। সে প্রতিবেদনের দলিলে সুপরিচালনকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা, উন্নয়নের জন্য একটি আইনি কাঠামো, তথ্য পরিবেশন ও স্বচ্ছতাকে সুপরিচালনের চারটি মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে সরকারি ও ব্যক্তিগত খাতের মধ্যে পার্থক্য রক্ষা করার অপারগতা, যার ফলে ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি সম্পদের ব্যবহার রোধ সম্ভব হয়নি, উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে পূর্বানুমানযোগ্য আইন ব্যবস্থা ও পরিচালন প্রতিষ্ঠার অভাবে অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ বিধির দরুন বাজারের স্বাভাবিক গতিক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি, সম্পদের অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ পদ্ধতিকে দুর্বল পরিচালন বা দুর্বল শাসনের কারণ হিসেবে সেই দলিলে শনাক্ত করা হয়।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারা। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করে তুলতে যোগ্যদের যথাস্থানে পদায়নের বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিহত করতে হবে। এর সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবার জন্য সমান হবে। কোনো রকম প্রভাব বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই অপরাধীদের বিচার করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য থাকতে হবে, দুর্নীতি দমনে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সেসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা থাকতে হবে। যেমন জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুদক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যাদের ওপর নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কাজ করতে এবং সক্রিয় থাকতে হবে। জাতীয় সংসদের যে কমিটিগুলো রয়েছে সেগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকবে এবং তাদের জবাবদিহি থাকতে হবে।