প্রতিটি মানুষের মনের কোঠায় জমানো আছে হাজারো অতীত স্মৃতি। আমারও আজ লিখতে বসে অনেক ছোটবেলার ছোট ছোট স্মৃতি জেগে উঠছে। আকবর আলি খান আমার চাচা। আমাদের ছোটবেলা ঘিরে নানা রঙের দিন ছিল। চাচা যখন ঢাকায় পড়তে এসেছিলেন তখন আমাদের বাড়িতে ছিলেন। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, আমার বাবা আনোয়ার আলী খান পাকিস্তান আমল থেকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। সে সুবাদে ভাই-বোন সবার মাথার ওপর ছাদ ছিলেন তিনি। আমার মা জোহরা খান দেবর-ননদ সবাইকে নিয়ে থাকতে ভালোবাসতেন। মায়ের শখ ছিল মজার মজার খাবার রান্না করে পরিবারের সবাইকে আপ্যায়ন করা।

আকবর আলি খান চাচা আম্মার হাতের রান্না খুব পছন্দ করতেন। চাচা আম্মার খুব প্রিয় দেবর ছিলেন। তাই চাচা তার লেখা একটি বই তার প্রিয় ভাবিকে উৎসর্গ করেছিলেন। আজ চাচাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে খুব মনে পড়ছে। কত কত গল্প করতেন ভাইদের নিয়ে। ছোট ছিলাম আর আমি বরাবর চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে তাই গল্প মন দিয়ে শোনা হতো না। খুব আফসোস লাগছে আজ, কেন আমি আরেকটু বড় ছিলাম না। তাহলে উপলব্ধি করতে পারতাম কী হচ্ছিল আমার জন্মভূমিতে। একাত্তরের অস্থির সময়ে আমার পরিবারের সবার নির্ঘুম রাত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারা আমি বুঝতে পারতাম। কেন নবী চাচাকে ১৪ ডিসেম্বরের ভয়াল রাতে ধরে নিয়ে গেল? আর ফিরে এলেন না তিনি। কেন বিনু ভাই (আমার খালাতো ভাই) যুদ্ধে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে এল? যা-ই হোক, দুঃখগাথার পর একটা মজার কথা মনে পড়ে গেল। সেটা হলো আমার নাম লেখার হাতেখড়ি আমার চাচার হাতেই হয়েছিল।

আমাদের পরিবার বরাবরই রাজনীতিসচেতন পরিবার। বিকালের চায়ের টেবিলে মনে হতো ডিবেট অনুষ্ঠান বসে গেছে। আমি ছোট থাকায় মজার মজার গল্প কিছুই বুঝে উঠতে পারতাম না। বড় হয়ে শুনেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আকবর আলি খান চাচা প্রথমে আগরতলা ও পরে কলকাতায় যান। মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বলে বাবা-মায়ের মুখ থেকে শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধকালে পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন চাচার কোনো খবর পেতেন না বলে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাচা কলকাতা থেকে দেশে ফিরলেন। আমরা অনেক হারিয়ে চাচাকে ফিরে পেয়েছিলাম আমাদের মাঝে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তার জ্ঞানের জ্যোতির্ময়তা আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়।

 

শাহনাজ খান: ভাতিজি