দেশে এলএনজি আমদানি হচ্ছে ২০১৮ সাল থেকে। এজন্য ব্যবহৃত হচ্ছে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে নির্মিত টার্মিনাল দুটি পরিচালনা করছে স্থানীয় ও বিদেশী দুটি কোম্পানি। টার্মিনাল দুটির দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই ব্যবহার করা যাচ্ছে না এলএনজি সংকটে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় এলএনজি আমদানিকারকদের মধ্যে চীন, ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে আমদানি বিবেচনায় এলএনজি অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি অব্যবহৃত থেকেছে বাংলাদেশে। ডলার সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে সরকার আমদানি করেছে কম, কিন্তু এলএনজি টার্মিনালকে বিনিয়োগ ব্যয় বাবদ অর্থ দিতে হয়েছে। স্বীকার করতেই হবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অতিমাত্রায় বেসরকারি ও আমদানিনির্ভর করে তোলায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার নতুন করে আরো এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বলে খবর মিলছে। বিদ্যমান সক্ষমতাই যেখানে অব্যবহৃত সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ অপ্রয়োজনীয়। এতে বিদ্যুৎ খাতের মতো সরকারের বোঝা বাড়বে, অর্থের অপচয় হবে।
কভিড-১৯-এর কারণে পণ্যমূল্য বাড়ছিল, কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকে সেই সংকট আরো প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের জন্য ইউরোপের প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর। গ্যাস সংকট এখন কেবল ইউরোপে আর সীমাবদ্ধ নেই। এলএনজির দাম বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ নিয়ে সংকটে পড়ে গিয়েছে। মিয়ানমার এলএনজি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তান বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের রেশনিংয়ের দিকে গিয়েছে। চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড এলএনজি কেনা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশকেও যেতে হয়েছে একই পথে। মূলত ভ্রান্ত নীতির ফলে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন কমার প্রক্ষেপণ ছিল পেট্রোবাংলার, কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। অথচ সারা বিশ্ব এটাই করে, এটাই নিয়ম। সরকার পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় সংস্কারের পথে এগোয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানেরও জোরালো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো কিছু ব্যবসায়ীর পরামর্শে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। এভাবেই জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপাদন না বাড়িয়ে ২০১৮ থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে সরকার। এখন ৬০ ডলার দাম এলএনজির। যেখানে দেশীয় গ্যাসের খরচ ১ ডলারের কম। নিয়ম অনুযায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ পরিকল্পনাসংক্রান্ত প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে অনুমোদন নেয়ার কথা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তা যাচাই-বাছাই করবে। এক্ষেত্রে তার কিছুই করা হয়নি। বিদ্যমান সক্ষমতা অব্যবহৃত রেখে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
পাকিস্তান সরকারও এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারা ও ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান নিয়ে জটিলতায় ভুগছে। দেশটি এখন ব্যক্তি খাতকে টার্মিনাল ব্যবহারে অনুমতি দিতে যাচ্ছে। এতে ব্যক্তি খাতের কোনো কোম্পানি যদি নিজ উদ্যোগে এলএনজি আমদানি করে ব্যবহার করতে চায়, তারা নির্ধারিত চার্জ দেয়ার মাধ্যমে তা ব্যবহার করতে পারবে। ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বাড়তি অর্থ দেয়ার চাপ কমাতে পাকিস্তান এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। দেশটির বেশকিছু কোম্পানি গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি করে। বাংলাদেশ সরকারও গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে চাইছে। এক্ষেত্রে অনেক কোম্পানি আছে যারা শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গ্যাস আমদানি করতে চাইতে পারে, কিন্তু সমস্যা হলো এ গ্যাস কীভাবে কোম্পানিগুলো ব্যবহার করবে। এখানে মজুদ, বিতরণসহ বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে। পাকিস্তানে বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে।
দেশের ৫০ শতাংশ গ্যাস শেভরনের ওপর নির্ভর করে আছে। কয়েক বছরের মধ্যে তাদের পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় ধস নামতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো বিকল্প ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস তুলছে। একই সীমানায় বাংলাদেশ একটা অনুসন্ধান কূপ খনন করতে পারেনি। সব মিলিয়েও বিশ্বের সবচেয়ে কম গ্যাস অনুসন্ধান হয়েছে বাংলাদেশে। গ্যাস অনুসন্ধান না করেই আমদানির পথ বেছে নেয়া হয়েছে। ফলে এখন সংকট গভীরে চলে গিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন শীর্ষ ১২ কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও শুধু অলস বসে থেকে সরকারের কাছ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করছে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দেশের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং বসে বসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা আদায় করা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু সরকার কোম্পানিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে আসছে, যার ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করার পরও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৪৯ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরো ৪৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এর অধিকাংশই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ খাতের মতো জ্বালানি খাতও যেন ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে অর্থ সংকটে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানির বহুমুখী উৎস তৈরি করতে অনেক দেশই এখন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এরই মধ্যে জার্মানি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য এ খাতের জায়ান্ট কোম্পানিগুলোকে বুকিং দিয়ে রেখেছে। এর বাইরে নেদারল্যান্ডস, ইতালির মতো দেশও এখন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণে তোড়জোড় শুরু করেছে। সে অর্থে এলএনজির অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশে শিগগিরই টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। যদিও পেট্রোবাংলা বলছে, আগামী ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এ দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। টার্মিনাল দুটি নির্মিত হবে বিল্ড ওউন অপারেট ট্রান্সফারের (বুট) ভিত্তিতে। এ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করবে কোম্পানি। এ সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে সরকারের পক্ষ থেকে টার্মিনাল পরিচালনা ও রিগ্যাসিফিকেশনের ব্যয়ও পরিশোধ করা হবে। নির্দিষ্ট সময় শেষে ভাসমান টার্মিনাল দুটির মালিকানা সরকারকে হস্তান্তরও করা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে আবার নতুন করে টার্মিনাল নির্মাণ করতে গেলে জ্বালানি বিভাগ ভয়াবহ আর্থিক চাপে পড়বে বলে আশঙ্কা খাতসংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এমনিতেই বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। এর ওপর একই সক্ষমতার দুটি নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে গ্যাস সরবরাহ দিতে না পারলেও শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থ জোগান দিতে গিয়েই আর্থিকভাবে আরো বিপত্তিতে পড়ে যাবে সংস্থাটি।
বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম এখন আকাশচুম্বী। স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৫৬ ডলারের ওপর। ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি আমদানি করা না গেলে তা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে জ্বালানি বিভাগকে। এছাড়া বিদ্যমান এলএনজির অবকাঠামো পুরোটাই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বর্তমানে ৫০ শতাংশের মতো সক্ষমতা বসে আছে। টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর কম ব্যবহার হলে প্রতি ইউনিটের রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ ৫০ সেন্ট এবং ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে। এসব বিষয়ের পুনঃপর্যালোচনা প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাতে সুষমভাবে গড়ে ওঠে এদিকে নজর দিতে হবে। সারা দেশে বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই মূল্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ আমদানি ব্যয় বেশি হলে তা মানুষের জীবনযাপন ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। জ্বালানি নিরাপত্তার ভাবনাকে একমুখী না করে সম্ভাব্য সবদিকেই নজর দিতে হবে।










