বাংলাদেশে এ মুহূর্তের দুশ্চিন্তা নগদ অর্থের প্রবাহ নাকি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি? বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়াকেই দ্রব্যমূল্য বা পণ্যমূল্যের বৃদ্ধি হিসেবে অভিহিত করা হয়। খুবই সাধারণ ধারণা হলো, স্বল্প পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয়ে যখন অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়, তখনই মূল্যস্ফীতির সমস্যা তৈরি হয়। বিষয়টি যতটা সরল হিসেবে দেখা হয় আসলে তা নয়। অর্থের জোগান বাড়লেও অর্থের হাতবদলের হার কমে গিয়েও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তখন অর্থের সরবরাহজনিত মূল্যস্ফীতি নাও ঘটতে পারে। সামগ্রিকভাবে যদি মানুষের আয় না বাড়ে তাহলে পণ্য ও সেবার চাহিদাও বাড়বে না। বাজারে সরবরাহকৃত পণ্যের চেয়ে যদি চাহিদা বেশি থাকে, তাহলে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি ঘটে।  

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ যে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিজনিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মূল্যস্ফীতির একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিজনিত এবং একটি অংশ ডলারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত। বর্তমানে দেশে স্থানীয় টাকার মান কমছে আর ডলারের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতেও ডলার পাচ্ছেন না। ডলার নিয়ে দেশে এমন সংকট নিকট-অতীতে দেখা যায়নি। ফলে ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারে অস্থিরতা চলছে। উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে ডলারের দামের সম্পর্ক রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 

এবার আসা যাক মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে হারে ঋণ দেয়, তাকে ব্যাংক রেট বলে। ব্যাংক রেট বৃদ্ধি করলে বাণিজ্যিক ব্যাংক যে ঋণ প্রদান করে, তার সুদহারও বৃদ্ধি করে। এতে বিনিয়োগ ঋণ ও ভোগ্য ঋণের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে অর্থের জোগান হ্রাস পায়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তার মূলধনের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে, যাকে নগদ জমার অনুপাত বলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নগদ জমার অনুপাত বৃদ্ধি করলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণদানের ক্ষমতা কমে। এতে অর্থের জোগান হ্রাস পায়। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে খোলাবাজার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসাধারণ বা ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণপত্র বিক্রি করে বাজার থেকে নগদ অর্থ তুলে নেয়। এ কারণে অর্থের জোগান হ্রাস পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণদানের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র স্থির করে দিতে পারে। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ প্রদান ক্ষমতা এবং অর্থের জোগান হ্রাস পায়। এতে দেশের অর্থনীতির গতি কিছুটা মন্থর হতে পারে। মূলধন বিনিয়োগে ভাটা এবং ব্যবসার পরিধি প্রসারিত হওয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। নতুন উদ্যোক্তারা প্রকল্প শুরু করতে পারেন না। সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। 

এত কিছুর পরও মূল্যস্ফীতি রোধে প্রথমেই অর্থের জোগানের রাশ টেনে ধরার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের গৃহীত নীতির উদাহরণ দেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে যে কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে বাংলাদেশে সে একই কারণে মূল্যস্ফীতি নাও ঘটতে পারে। ফলে তাদের নেয়া পদক্ষেপে সবসময় বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান নাও মিলতে পারে। সবক্ষেত্রে অর্থের জোগানের রাশ টেনে মূল্যস্ফীতি নাও রোধ করা যেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো, মূল্যস্ফীতি রোধ সম্ভব কোন পথে? 

মূল্যস্ফীতি রোধে সুদের হার বৃদ্ধি একটি নিয়ামক বটে, তবে এটিই যে একমাত্র পথ তা বলা যাবে না। অন্য যেসব কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে সেগুলোর সমাধান না করা গেলে মূল্যস্ফীতি আশানুরূপভাবে কমবে না। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ ডলারের দামের অতিরিক্ত বৃদ্ধি। এটি তৈরি হয়েছে ডলারের চাহিদা-জোগানের সমন্বয়ের অভাব থেকে। এক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হবে। বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সর্বোপরি সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। 

উচ্চমূল্যস্ফীতি খুব একটা সুখকর নয়। কারণ এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ বা যাদের আয় অপরিবর্তিত রয়েছে তারা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে, তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আবার এ কথাও সত্য, অর্থনীতির গতি বাড়াতে হলে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় মূল্যস্ফীতি থাকা আবশ্যক। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরকার মূল্যস্ফীতি বাড়াতেই নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। কারণ দেশটিতে তখন মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১ থেকে ২ শতাংশের ঘরে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্বের হারও বেড়ে যায়। তখন বিনিয়োগ-উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থের প্রবাহ বাড়নোর নীতি গ্রহণ করে। এ কারণে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নীতি সুদের হার প্রায় শূন্য শতাংশে নামিয়ে এনেছিল। বর্তমানে অবশ্য দেশটিতে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি বিষয়টি সবসময় খারাপ নয়। তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটি অর্থনীতির গতি বাড়াতে সহায়তা করে। উৎপাদকের দৃষ্টিতে দেখলে মূল্যস্ফীতি তাদের কাছে এক ধরনের প্রণোদনা। দাম বাড়লে তাদের মধ্যে বাড়তি মুনাফা অর্জনের আশা তৈরি হয়, যা ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, মানুষের আয়ও বাড়ে। তবে মূল্যস্ফীতির হার খুব বেশি হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে না। এক্ষেত্রে আয়ের বণ্টন একটি বড় বিষয়। 

যতদূর জানা যায়, সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা। এ হারেও যদি মূল্যস্ফীতি ঘটে, তবে তা সমাজের দরিদ্রতর মানুষের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করবে। কারণ দরিদ্র পরিবারের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় নিত্যপণ্য কেনার জন্য। খাদ্য, জ্বালানিসহ অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাড়ে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধিও তাদের জন্য উদ্বেগজনক। অন্যদিকে বিলাসপণ্যের দাম বাড়লে তা সমাজে তেমন প্রভাব রাখে না। কারণ এসব পণ্যের ক্রেতা মূলত ধনী ও অতিধনীরা, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমানে নিত্যপণ্যের দামই সবচেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের পাশাপাশি সাবান-তেলের দামও বেড়েছে উচ্চ হারে। খাদ্যবর্হিভূত মূল্যস্ফীতিও বেশি। ফলে এটি সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবার, মধ্যবিত্ত, সর্বোপরি নির্দিষ্ট আয়ের ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। হয় তারা ভোগ কমিয়েছে নতুবা ধারদেনা করে সঞ্চয় ভেঙে চাহিদা মেটাচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বৃদ্ধির কোনো উপায় নেই। এর মধ্যে করোনায় অনেকেই চাকরি হারিয়েছে, অনেকের আয়ও কমেছে। ফলে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই বর্তমান মূল্যস্ফীতি খুবই কষ্টদায়ক।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগের গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীতে বসবাসরত চার সদস্যের একটি পরিবারের মাসে খাদ্যব্যয় ২৩ হাজার ৬৭৬ টাকা। এটাকে রেগুলার ডায়েট বলছে সিপিডি। এখানে ১৯টি খাদ্যপণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাছ-মাংস বাদ দিলেও খাদ্যের পেছনে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৫৫৭ টাকা। এটা ‘কম্প্রোমাইজড ডায়েট’ বা আপসের খাদ্যতালিকা। বেতন প্রতি বছর ৫ শতাংশ বাড়লেও সেটা নিয়মিত ডায়েটের ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম বলেও উল্লেখ করা হয়, কিন্তু নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের যে আয় তা দিয়ে খাদ্যপণ্য কিনে টিকে থাকা কঠিন। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ খাবার খাওয়া কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে, তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম। বিশেষ করে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও স্থানীয় বাজারে সেই প্রভাব নেই। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও কারণ ছাড়া ঊর্ধ্বমুখী। এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। 

মূল্যস্ফীতি ঘটলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থের জোগান কমানোর দিকে দৃষ্টি দেয় সর্বাগ্রে। এক্ষেত্রে তারা রেপো রেট, রিভার্স রেপো রেট, সুদের হার বাড়ানোর মতো টুলস ব্যবহার করতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সে পথে হাঁটছে। বাজারে নগদ অর্থের জোগান কমাতেই মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানত ও ঋণের সুদের হারও বাড়বে, ফলে বিনিয়োগ কম হবে, চাহিদা কমবে। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থানও কমবে, আয়ও কমবে। তার ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদাও কমবে। এভাবে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি আটকানো সম্ভব হবে, কিন্তু উৎপাদনের ব্যয়বৃদ্ধি যেমন—ডলারের অতিমূল্যায়ন বা আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটে, তাহলে কী হবে? আর কর্মসংস্থান ও আয় কমলে কী মানুষের স্বস্তি ফিরবে? 

শুধু মুদ্রানীতির প্রয়োগে নয়, সরকারের রাজস্ব নীতির প্রয়োগের মাধ্যমেও মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় আনা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ৎরণে রাজস্ব নীতি বেশি কার্যকর বলে গবেষণায়ও দেখা গেছে।  যেমন—জ্বালানিপণ্যের ওপরে শুল্ককর কমিয়ে; জনসাধারণকে খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরকার নির্ধারিত দামে প্রদান করে; প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে; পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ গড়ে তুলে; খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে; বিভিন্ন অত্যাবশ্যক পণ্য এবং ওষুধের ওপর ভর্তুকি দিয়ে; মজুদদারি ও একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পথ আছে। এগুলো বাস্তবায়ন কষ্টকর বলে সরকার সুদের হার নিয়ন্ত্রণের পথকেই বেছে নেয়, কিন্তু এতে দরিদ্র ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা খুব বেশি সুফল পায় না। মূল্যস্ফীতি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত নীতিগুলোকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। রাজস্ব নীতি ছাড়া বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ৎরণ কঠিন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। 


এম এম মুসা: সহযোগী সম্পাদক, বণিক বার্তা