গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। আর এতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার অবস্থা কিছুটা সহনীয় হলেও অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা খুবই নাজুক। মফস্বলে দিনে গড়ে ১৬-১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে খবর মিলছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে এরই মধ্যে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ওঠায় সরবরাহ কমিয়ে আনতে হয়েছে। আর এতেই বিদ্যুতের সংকট বেড়ে উঠছে। বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, গ্যাস-সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যার দ্রুত সমাধান মিলছে না। অধিক দামে গ্যাস কিনে কতদিন তা সরবরাহ করা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এমন সংকটের বিষয়ে বণিক বার্তা বহু আগে থেকেই সতর্ক করে এলেও নীতিনির্ধারকরা সেটি আমলে নেননি। মূলত প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগস্বল্পতা ও মনোযোগহীনতা থেকে সংকটের সূত্রপাত। গ্যাস সংকটের পেছনে আরো একটি কারণ অধিক মাত্রায় স্পষ্ট মার্কেটনির্ভর হওয়া। স্পষ্ট মার্কেটে গ্যাসের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, এমনকি অনেকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশকে গ্যাসও দিতে চাইছে না। সংকটটি অনেকটা ২০০৭-০৮ সময়কালে খাদ্য সংকটের মতো। অর্থ দিয়েও গ্যাস মিলছে না। তাছাড়া অর্থেরও সীমাবদ্ধতা আছে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমেছে, বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হচ্ছে, বিনিময় হার বড় ধরনের চাপে রয়েছে, ডলারের সংকটও দেখা দিয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভেঙে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের ভুল নীতি-পরিকল্পনার ফল এখন জনগণ-উদ্যোক্তাদের ভোগ করতে হচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণে স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে সর্বাগ্রে। আর সেটি করা সম্ভব শুধু স্থানীয় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে, সে সুযোগও রয়েছে। সংকট আরো বড় হওয়ার আগেই প্রাথমিক জ্বালানি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রাথমিক জ্বালানিতে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ হয়নি। অথচ গ্যাসের অবকাঠামোগত নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ করে সুফলও কম। দেশের অনেক জায়গায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে অথচ এসব লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। অথচ এ পরিমাণ অর্থ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেত। দেশের জ্বালানি খাতে কয়েক বছর ধরে গ্যাস সরবরাহে সংকট চলছে। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকের ওপরও পড়ছে এর প্রভাব। গ্যাস সংকট উত্তরণে সরকার নানা পরিকল্পনা হাতে নিলেও বিনিয়োগ হয়েছে মূলত সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায়। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক সামান্যই। ফলে গ্যাসের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার সামঞ্জস্য রক্ষা করা যায়নি। এলএনজি আমদানি দিয়ে জ্বালানি চাহিদা পূরণের পথ বেছে নেয়া হয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ঢিমেতালে চলছে। এক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতাকেও ব্যবহার করা যায়নি। অস্বীকারের উপায় নেই, দেশে বিদ্যমান গ্যাস সংকটের প্রধানতম কারণ দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম অকার্যকর থাকা, হাতে পর্যাপ্ত ডাটা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ব্যবহার না করে আমদানিনির্ভর এলএনজিকে গুরুত্ব দেয়া। অথচ জ্বালানিপণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কখনই স্থিতিশীল নয়। ফলে জ্বালানি পরিকল্পনায় যে সংকট তৈরি হবে তা সহজেই অনুমেয় ছিল। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, নানামুখী পরিকল্পনা করা হলেও শুরুতেই গ্যাসের উৎস ও সংস্থান নিশ্চিত না করায় এমন সংকট তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। জ্বালানি সংস্থানের ক্ষেত্রে আমদানিতেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে স্থানীয় উৎসগুলোও এখনো অকেজো। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা প্রাধান্য পাওয়ায় দেশের গোটা শিল্প অবকাঠামোই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা থেকে উত্তরণে সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনাকে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা, তার অন্যতম সবার জন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু সমস্যা হলো এসডিজির অন্যতম শর্ত সবার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সহজলভ্য করে তোলা। সেদিক থেকে ততটা ভালো অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপাদান জ্বালানি সহজলভ্য, জ্বালানির সামর্থ্য, জ্বালানির উপযোগিতা ও জ্বালানির নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। আমরা এর কোনোটিই সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে নিতে পারিনি। জার্মানির মতো উন্নত দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখন ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন পর্যন্ত বেশির ভাগ উন্নত দেশই প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজাতে হবে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পের উৎপাদন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শিল্পমালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। উপরন্তু গ্যাসের সংকটে উৎপাদনে প্রভাব পড়লে অনেকের জন্য টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি আমলে নিয়ে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রত্যাশা করছে সবাই।
আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলে প্রতিটি দেশ। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে হাঁটেনি। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। এতে সংকটই শুধু বেড়েছে। বিদ্যমান সংকট এড়াতে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও আমাদের দেশে এটি করা হয়নি। এটি জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা—উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে, এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আকস্মিক দর বাড়ায় বাংলাদেশসহ এলএনজির উদীয়মান বাজারগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সস্তা জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের দিকেই ঝুঁকেছিল দেশগুলো। অদূর-ভবিষ্যতে আরো বেশি দামে গ্যাস ক্রয় করতে হতে পারে। জ্বালানি তেলের বাজারের মতো এলএনজির বাজারও অস্থির হয়ে উঠছে। এভাবে এলএনজি বাজার আরো অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে পারে। গ্যাসের উদীয়মান বাজারগুলো মূলত মূল্যসংবেদনশীল এবং আসন্ন গ্যাসের অস্থির বাজারে পরিণত হতে চলেছে, ভবিষ্যতে যা আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। উচ্চ ও অস্থির এলএনজির দাম এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে এবং গ্রাহকের ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে। গ্যাসের দর বৃদ্ধির এ অনিশ্চয়তা একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। সম্ভাব্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে উঠবে, আবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রফতানিকারকরা পিছিয়ে পড়বেন।
দেশে উৎপাদিত গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে। এছাড়া সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি (আবাসিক), সিএনজি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গ্যাস ব্যবহার করে। এ অবস্থায় গ্যাস খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ বিষয়টি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গ্যাস খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে বলেছিল, দেশে গ্যাসের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের বিস্তর ফারাক রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ত্রুটিহীন রেখে এর দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার গ্যাস সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
গ্যাসের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ চালিয়ে গেলে উৎপাদন ধরে রাখা যায়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতা কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি সবকিছুই নির্ভর করছে টেকসই জ্বালানি খাতের ওপর। স্থানীয় সম্পদ আহরণ জোরদারের মাধ্যমেই সেটি অর্জন সম্ভব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এতদিনের ভুল বুঝতে পারবে এবং জ্বালানি খাত উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ উৎসকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজাবে এবং যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে।










