এখানে দুইটা শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। উন্নতি বা ডেভেলপমেন্ট, অন্যটা সমাজ। এ দুই বিষয়েই কিছু কথা। প্রথমত আসা যাক, উন্নতি বা ডেভেলপমেন্ট বলতে কী বুঝি। কার উন্নতি, কিসের উন্নতি, কেমন উন্নতি! অনেক বিজ্ঞজনের এ বিষয়ে বিজ্ঞ অভিমত তো আছেই। এখানেও কোনো একক মত চূড়ান্ত না। বর্তমান সময়ে উন্নতি এই কথার নিচে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার এবং ব্যক্তি জীবন বোধ।

উন্নয়ন বলতে সহজ কথায়, ইতিবাচক পরিবর্তন এবং তার বিকাশ। অনেকে তাই বলেন, It is a stage of growth or advancement. অর্থাৎ বৃদ্ধি বা প্রগতির একটা পর্যায় হলো উন্নয়ন। আবার কারোর মতে, এটা পুঁজিবাদতত্ত্ব। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর ইউরোপে ‘উন্নয়ন’ ধারণার জন্ম। উন্নয়নের ধ্রুপদী তত্ত্বের রূপকার হিসাবে অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ এবং ডেভিড রিকার্ডোকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে গণ্য করা হলেও সমাজ চিন্তাবিদ কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস, জন স্টুয়ার্ট মিল এঁদের কথাও উন্নয়ন তত্ত্বে আমরা পাই ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই।

ধীরে ধীরে উত্তর আধুনিক সময়ের নানান সংকট আজ থেকে এখন পর্যন্ত, এ উন্নয়নে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই অনেক আধুনিক অর্থনীতিবিদ মনে করেন রাষ্ট্রের জিএনপি (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাকশন) বৃদ্ধি পেলে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফল দেখা দেবে।

উল্লেখ্য, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তার বহুমুখিতা-উত্তর আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য হলেও কেবল জিএনপি বৃদ্ধিতেই সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নতি নির্ভর করে না, মানুষের জীবন বা সমাজের উন্নতি কেবল অর্থনীতির মাপকাঠি দিয়েও বোঝা সম্ভব না। আধ্যাত্মিক এবং সমাজের নৈতিক ভ্যালুজের একটা বড় ভূমিকা আছে সামগ্রিক সংস্কৃতিক চর্চার মধ্যেও। তাই ‘উন্নতি’ বলতে গেলে একটা বৃহত্তর সমাজ এবং রাষ্ট্রের সবাইকে এবং ব্যক্তির সার্বিক মনোজগতের উন্নতি ও তার ব্যবহার সংস্কৃতিকেও বোঝায়।

সংস্কৃতি বলতে কী বুঝি। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সংস্কৃতির একটা অর্থ হতে পারে ইংরেজিতে যেটাকে বলি ‘রিফাইনমেন্ট’। একসময় বিষয়টা কেবল সাহিত্যের গণ্ডিতে আলোচিত হতো। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতি বা কালচারের সংজ্ঞা দেয়াও কঠিন। ইংরেজি সাহিত্যে কালচার শব্দটা প্রথম আমদানি করেন ফ্রান্সিস বেকন ১৬ শতকের দিকে। ২০ শতকের মাঝামাঝি রবার্ট এযরা পার্ক ও টেইলার মার্কিন পণ্ডিত এবং টার্নার ও লাসকি ইংরেজ পণ্ডিতের লেখায় এ সংস্কৃতি বা কালচার শব্দটা আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহূত হয়। এ কালচারের সঙ্গে সভ্যতার একটা ভালো যোগাযোগ আছে। প্রখ্যাত লেখক, আবুল মনসুর আহমদ লেখেন, ‘মন এবং মস্তিষ্ক মানুষকে অন্যান্য জীবজন্তু হইতে পৃথক করিয়াছে। সেই মনের বিকাশের নাম সিভিলিজেশন। হূদয়ের সঙ্গে সভ্যতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য নয়। তাই গ্রহণকারীকে অন্তর দিয়া সভ্যতা গ্রহণ করিতে হয় না। তার দরকারও নাই। এরোপ্লেনকে শয়তানের কল বলিয়াও অনেকে হাওয়াই জাহাজে চড়িয়া হজ করিতে যাইতেছেন। অন্যান্য সম্পদের মতোই সভ্যতার সাফল্য তার প্রয়োজনে।’ (বাংলাদেশের কালচার, আবুল মনসুর আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৬৬)

লক্ষ করার বিষয়, ‘প্রয়োজন’ কথাটার অর্থ এবং এর সঙ্গে ‘উন্নতির’ সম্পর্ক। সম্প্রতি একটা লেখা পড়েছি নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় ৯ নভেম্বর, ২০২২। সম্মানিত এবং সমাজ চিন্তাবিদ লেখক কামরুজ্জামান ভূঁইয়ার। শিরোনাম, ‘নিরন্তর সাংস্কৃতিক চর্চা উন্নত সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত’। ‘উন্নত’ এবং ‘পূর্বশর্ত’ কথাটাও আমরা একেকজন একেকভাবে দেখি। তবে সার্বিক অর্থে উন্নত বা উন্নতি বলতে সবার উন্নতিকেই অধিক গুরুত্ব দিই।

উন্নতি, একটা ‘ইনক্লুসিভ’ ধারণা। সমাজের কোনো ইনস্টিটিউশন এবং অবকাঠামোকে এ ধারণার অন্তর্ভুক্তি থেকে বাইরে রাখলে সেটা সবার উন্নতি বোঝাবে না। উল্লিখিত লেখায় শ্রদ্ধেয় লেখক, সংস্কৃতি চর্চা বলতে অনেক কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, কিন্তু মানুষের সভ্যতায় ‘ধর্ম বিশ্বাস’ এবং এর কৃষ্টিও যে এর একটা অন্যতম ব্যারোমিটার। এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তাহলে কি ধরে নেব শিল্প, সাহিত্য, মনুষ্যত্ব, বিবেক আচার-আচরণ। কেবল এসবই মানুষকে কোন সত্যের দীক্ষায় দীক্ষিত করে বা করবে? ধর্মের কোনো ভূমিকা নাই এতে! আলোচনার অবকাশ আছে। উন্নত সমাজ বিনির্মাণে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে উন্নতির ‘পূর্বশর্ত’ হিসাবে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকা দরকার। এটি নিয়ে ডিবেট করা যায় কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব না বা একে অস্বীকার করাও যাবে না।

লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন বিশেষ করে আমাদের শিল্প-সাহিত্য এবং সংগীতে রাজার ‘আজ্ঞাবহ’ থাকা বহুদিনের চরিত্র। লেখক বলেছেন, ‘একসময় শিল্প বা শিল্পীর স্বাধীনতা ছিল ঠিক ততটুকু যতটুকুতে রাজ রাজনের ভাবমূর্তি রক্ষা হয় এবং মনোরঞ্জন বা বিনোদন সীমারেখায় নির্দিষ্ট থাকত।’ এখনো কিন্তু এর কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়নি, বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে এবং এর সমাজ ব্যবস্থায়। আমাদের সমাজ বিনির্মাণের অথবা উন্নতির ধারণায় মানুষের ধর্ম-বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে বা অবজ্ঞা করে সমাজে ‘শান্তি’ আসবে না। এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রমাণিত।

সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ বললে, সাহিত্য কিন্তু মানুষের ধর্মীয় কৃষ্টি আচার-আচরণ এবং বিশ্বাসের দর্পণ। সমাজবিজ্ঞানেও একে স্বীকার করা হয়। কিছু কিছু রাজনৈতিক ধারণা এবং চিন্তায় সমাজের ধর্ম ইনস্টিটিউশন এবং ধর্মবিশ্বাসকে যেভাবে ‘উপহাস’ বা উপেক্ষা করি আমরা সেটা কোনো ‘ইনক্লুসিভ’ সমাজের পক্ষে কাজ করে না। শান্তিও আনতে পারে না। ইনক্লুসিভ সমাজ ও রাষ্ট্র দিতে পারে না। ভাষা, যেমন একটা ইনক্লুসিভ সমাজ ব্যবস্থার পূর্বশর্ত, তেমনিভাবে ধর্ম উন্নত সমাজ নির্মাণের বড় একটা অংশ। এটাও পরীক্ষিত।

আমাদের পাশের দেশ ভারত, তার সমাজ নির্মাণের অথবা উন্নতিতে এর সনাতন ধর্ম বিশ্বাস এবং তার কৃষ্টি কতখানি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে ওটা আলাদা করে বলার বা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি লক্ষ্য করি বাংলাদেশের অনেক জ্ঞানী সম্মানিত ব্যক্তিত্ব আছেন, ধর্মের বিষয়ে তাদের একটা ভুল ধারণা এবং গায়ে চুলকানির মতো কিছু একটা কাজ করে। তারা অনেকদিন থেকেই চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের উন্নতি বা সমাজ উন্নতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাসের সংস্কৃতি এবং চর্চাকে খাটো করে দেখার ও রাখার। এ কাজটাতে আমাদের মধ্যে যারা সামাজিক ‘রক্ষণশীল’ চিন্তা-চেতনায় উৎসাহী বা সমর্থন করি, তারা বেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও জাতীয় উন্নতির প্রশ্নে তারাও কোনো একক মত প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, যা জনগণ গ্রহণ করেছেন বলা যায়।

কেউ হয়তো বলবেন, জনগণ মূর্খ। বলতেই পারেন। কিন্তু সমাজ উন্নতির পূর্বশর্ত তো জনগণের মনে শান্তি এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তা, তাদের বিশ্বাসের মুক্তচর্চা, গণতন্ত্র এবং নিজের মানসিক নৈতিক উন্নতির মূল্যবোধ বিনির্মাণেও কাজ করে। এক্ষেত্রে সমাজ জীবনের সংস্কৃতি থেকে ধর্মকে বাদ দিতে পারি কি?

অভিজাত প্রযুক্তি, উন্নত সাহিত্য, শিল্পকল কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যাধুনিক সংযোগ ব্যবস্থা যে কেবল আর আশীর্বাদ না, শান্তির একমাত্র পূর্ব শর্ত না। উত্তর আধুনিক পর্বে এসে এ বিষয়টি আমরা অনেক বুঝতে এবং শিখতেও পারছি। আমাদের অনেক চিন্তাবিদ মানুষ কেবল বস্তু বা জাগতিক বিশ্বের অনেক কিছুকে যেভাবে গুরুত্ব দিই সেই অর্থে মানুষের আত্মিক বা আধ্যাত্মিক উন্নতি বা অগ্রগতির ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ফলে আমরা কোনো কিছুর উন্নতি এবং সুনির্মাণে ‘একতা’ সৃষ্টি করতে পারছি না। এখানে আমাদের এককেন্দ্রিক শিক্ষা এবং অন্যের মতামত এবং চিন্তার প্রতি অশ্রদ্ধা ইনক্লুসিভ সংস্কৃতি চর্চার পথেও এক অন্তরায়।

নিরন্তন সংস্কৃতিচর্চা বলতে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনের কোনো একটাকে বাদ দিয়ে কিছু অর্জন করতে চাই ইতিবাচক অর্থে, আমাদের বিভেদ এবং অনৈক্য বাড়বে। বিভেদ এবং অনৈক্যের সেতুতে দাঁড়িয়ে আমরা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছতে পারব না। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে একই গ্রামের অন্য বাসিন্দাকে আলাদা করে ফেলব। এভাবে বিভক্তির কোনো চিন্তা দিয়ে সমাজের কোনো উন্নতি বা সুনির্মাণ হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে কিনা তা জানি না। তবে অল্প জ্ঞানে মনে হয় সব সমাজেই মানুষের ‘ধর্মবিশ্বাস’ (যদি সেটা সঠিকভাবে জানা ও চর্চা করা যায়) এর অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিসরেও বড় পজিটিভ ভূমিকা আছে সমাজের সুনির্মাণে পূর্বশর্ত হিসেবে। বিষয়টি এক চোখে না দেখে উভয় চোখে দেখা দরকার। এক চোখ বন্ধ করে রাখলে বা বন্ধ থাকলে বা এক চোখে সব না দেখলে অন্ধ বলি।

 

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: রাজনৈতিক বিশ্লেষক