বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী না হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। প্রায় ফি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে এর বাসিন্দাদের। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তাই বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগের সংখ্যাও। হুমকিতে রয়েছে আমাদের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আগামী দিনে সবচেয়ে বড় বিপদ জলবায়ু পরিবর্তন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ হেডস অব গভর্ন্যান্স শীর্ষ ভার্চুয়াল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ুর ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে সম্মিলিত লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তিন দফা প্রস্তাব রেখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী সবুজ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কার্বননিরপেক্ষ প্রযুক্তিতে জোর দেয়া এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যাতে অভিযোজন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জলবায়ু অর্থায়নের সুবিধা পায়, সেজন্য তাদের সমর্থন দেয়া। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় তিনটি প্রস্তাবই গুরুত্বপূর্ণ ও যথার্থ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। চীনের রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাবিষয়ক সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। সুইডেনে জলবায়ুবিষয়ক আইনে ২০৪৫ সালের মধ্যে সরকারকে সব ধরনের গ্রিনহাউজ নির্গমন হ্রাসের বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেয়া হয়েছে। পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি সম্পর্কিত নীতি চালু করেছে ভারত সরকারও। ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মুক্ত হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ডেনমার্ক। বাংলাদেশও বিভিন্ন জলবায়ুসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এমন প্রেক্ষাপট থেকে পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উড্ডয়নমুখী। বৃহৎ অনেক অবকাঠামো প্রকল্প চলমান। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কার্যক্রম চলমান। একাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এসব প্রকল্পে পরিবেশের ওপর যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্তের শিকার। অভিযোজন কৌশল গ্রহণের জন্য ব্যাপক অর্থের প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সহায়তাও এক্ষেত্রে বাড়ানো প্রয়োজন।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ জীবনযাত্রার মান হ্রাসের আশঙ্কাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা জীববৈচিত্র্যসহ দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে বৈকি। সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস মত্স্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে উপকূলে, যাদের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষি। জলবায়ু পরিবর্তন যাদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। সামগ্রিক এ বিষয়গুলো খাদ্যের সহজলভ্যতা, খাদ্য সংগ্রহ, ভোগ ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো বাড়িয়ে দেবে। তাছাড়া দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় সুপেয় পানীয় জলের অভাব বিদ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তন চিকিৎসাবঞ্চিত গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলবে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা এবং সময়ের পরিবর্তনে বিভিন্ন ভেক্টরবর্ন রোগ, যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কালাজ্বর, কলেরা ও ডায়রিয়ার বিস্তার ঘটে। নিকটবর্তী সময়ে তাপমাত্রা যদি শূন্য দশমিক ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট বাড়ে, তবে বাংলাদেশে ডায়রিয়ার প্রায় আট লাখ অতিরিক্ত কেস দেখা দেয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
বিদ্যমান অবস্থায় ভবিষ্যতের জলবায়ুসংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহণের আগে এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি যাচাই ও মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। আসন্ন বাজেটে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি খাতে প্রায় ৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় সময়াবদ্ধ পরিকল্পনার আওতায় জলবায়ু প্রকল্পগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান উন্নয়ন যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, তা-ও পর্যালোচনা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আমরা পরিবেশের ক্ষতিকর কোনো কার্যক্রম হাতে নিচ্ছি কিনা, তা মূল্যায়ন করা চাই। পুনর্নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, রাসায়নিক কীটনাশক দিয়ে মাটি-পানিকে বিষাক্ত না করে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদনের প্রযুক্তিগুলো আয়ত্তের অভিজ্ঞান অর্জন করতে হবে। গোটা বিশ্ব ক্রমে পরিবেশবান্ধব কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে টেকসই কার্যক্রম ও কর্মসূচির বিবেচনা করা জরুরি। শুধু তহবিলের ব্যবস্থা করলে চলবে না, ওই তহবিল ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছল কিনা এবং তাদের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, পানিনিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানিনিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের বৈশ্বিক সমর্থন প্রয়োজন। এজন্য সঠিক পদ্ধতিতে আবেদন ও তদবিরের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে সব মন্ত্রণালয়কে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তাছাড়া দাতা দেশগুলো স্বচ্ছতা চায়। আমরা যদি জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে প্রাপ্য তহবিল আনার চেষ্টা করি, তাহলে আমাদের কর্মকাণ্ডগুলোকে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট করতে হবে। তুলে ধরতে হবে যে আমাদের কার্যসাধন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, সহযোগিতার মানসিকতা এবং বেসরকারি অংশীদার রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য সমতাভিত্তিক, সহনশীল ও সবুজ প্রাকৃতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবহার না করা পর্যন্ত বাস্তবিক অর্থে প্রকৃতির বিরুদ্ধে এ লড়াইয়ে জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ব আজ এক নজিরবিহীন মহামারী পরিস্থিতি অতিবাহিত করছে এবং এই বৈশ্বিক মহামারী পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সেখানে সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজনীয়।










