দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ)। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্যান্সার আক্রান্তদের প্রধান ভরসা এটি। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতিতে সেখানে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হাসপাতালটির তিন-চতুর্থাংশ যন্ত্রপাতিই এখন অকেজো কিংবা নষ্ট। ফলে সারা দেশ থেকে আসা রোগীদের সেবা পেতে দীর্ঘ প্রহর গুনতে হচ্ছে। বেশ কষ্টে-সৃষ্টে অনেকে শেষ পর্যন্ত সেবা পেলেও সংকটাপন্ন কোনো কোনো রোগীকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে চিকিৎসা ছাড়াই। দিন যত যাচ্ছে, এ সমস্যা প্রকট হচ্ছে। রোগীদের ভোগান্তি নিরসনে তাই হাসপাতালটিতে জরুরি ভিত্তিতে আবশ্যকীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা জরুরি।
মূলত স্বল্পমূল্যে মারণব্যাধি ক্যান্সারের উন্নতমানের চিকিৎসা জোগাতেই এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। গত শতকের আশির দশকের প্রারম্ভে স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। শুরুতে শয্যাসংখ্যা ছিল ৩০০। ২০১৯ সালে তা বাড়িয়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তথ্য বলছে, প্রথম দিকে একটি কোবাল্ট মেশিন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে রেডিওথেরাপি সেবা চালু হয়। পরে আরো একটি কোবাল্ট মেশিন যুক্ত করা হয়। এরপর ২০০৮-১০ সালে যুক্ত করা হয় চারটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন। এর মধ্যে মাত্র একটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর সচল রয়েছে। সম্প্রতি একটি নষ্ট হয়েছে। বাকি দুটির আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে কোবাল্ট যন্ত্র দুটিও বাতিল করা হয়েছে গত বছরের শেষে। আর ব্র্যাকিথেরাপি দেয়ার জন্য দুটি যন্ত্রের মধ্যে একটি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। আবার রোগ নির্ণয়ে দেড় যুগ আগে হাসপাতালে একটি ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (এমআরআই) যুক্ত করা হয়েছে। তবে যন্ত্রটি চালু হওয়ার কয়েকদিন পরই অকেজো হয়ে পড়ে। এরপর নতুন করে কোনো এমআরআই যন্ত্র যুক্ত করা হয়নি। দুটি কম্পিউটেড টমোগ্রাফি স্ক্যান বা সিটি স্ক্যানের মধ্যেও একটি নষ্ট। সব মিলিয়ে রোগ নির্ণয় ও সেবা পেতে প্রতিষ্ঠানটিতে নানা দুর্ভোগে পড়ছেন রোগীরা।
ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং অনেকটা যন্ত্রনির্ভর। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়া চিকিৎসা শুরু করাটাই দুষ্কর। সেজন্য আন্তর্জাতিকভাবে এ চিকিৎসায় ব্যবহূত যন্ত্রপাতির একটা আদর্শ অনুপাত বেঁধে দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উচ্চ আয়ের দেশে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে অন্তত একটি রেডিওথেরাপির যন্ত্র থাকতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশে ১০ লাখে একটি ও নিম্ন আয়ের দেশের ক্ষেত্রে প্রতি ৫০ লাখে একটি। অথচ সাড়ে ১৬ কোটির বাংলাদেশে রয়েছে ৫০টিরও কম যন্ত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যা অনুপাতে বাংলাদেশে অন্তত ২০০-২৫০ রেডিওথেরাপি ও ব্র্যাকিথেরাপি জরুরি। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে থাকা ২৪টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে থাকা ১৮টি মিলে দেশে রেডিওথেরাপি ও ব্যাকিথেরাপি যন্ত্রের সংখ্যা এখন ৪২; আদর্শ মানদণ্ডের দিক থেকে যা ভীষণ হতাশাজনক।
সময়ান্তরে দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা সুবিধা আগের চেয়ে বেড়েছে। বেসরকারি পর্যায়ের ১৭টি প্রতিষ্ঠানেও এখন ক্যান্সারের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে খরচ বেশি হওয়ায় বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের এখনো প্রধান ভরসার জায়গা জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল। কিন্তু যন্ত্রপাতির অভাবে সেখানেই তাদের চিকিৎসা পেতে কষ্ট হচ্ছে! তাহলে তারা কোথায় যাবে? আমরা দেখছি, একে তো যন্ত্রপাতির ঘাটতি আছে; অন্যদিকে যেগুলো মেরামত উপযোগী সেগুলোও যথাযথ মেরামত করা হচ্ছে না। শুধু চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ঘাটতি নয়; সার্বিকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হাসপাতালটিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। বারান্দা, করিডোর ও টয়লেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তূপ ও দুর্গন্ধ। অন্যদিকে বসার জায়গার সংকটে বাধ্য হয়েই অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে শুয়ে-বসে থাকতে হচ্ছে রোগীদের। রোগীদের চিকিৎসা, ভর্তি ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অবহেলা স্পষ্ট। মূল ভবনের লিফট নষ্ট হয়ে পড়ায় নতুন ভবনে উঠে দুই ভবনের সংযোগ সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, যা বয়োজ্যেষ্ঠ ও রোগাক্রান্তদের ভোগান্তির কারণ। খরচ কম হওয়ায় সবসময়ই দরিদ্র রোগীদের ভিড় লেগে থাকে। তবে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও সক্রিয় ভূমিকার অভাবে তারা যথাযথ সেবা পাচ্ছেন না। একদিকে যন্ত্রপাতির ঘাটতি, অন্যদিকে যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংকট। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি কার্যকর হয়ে উঠতে পারছে না। তাই প্রতিষ্ঠানটিতে বিরাজমান বহুমাত্রিক অব্যবস্থাপনার অবসান এখন সময়ের দাবি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে বলা হয়েছে, মেশিন কেনার জন্য কয়েক মাস আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়। এখন আবার নতুন করে প্রক্রিয়া চলছে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহারপূর্বক রোগীদের ভোগান্তি দূর করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা জরুরি। শুধু যন্ত্রপাতি কিনলেই হবে না, সেগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার হয় তা নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকিও জোরদার করতে হবে। যথাযথ চিকিৎসাসেবার পথে বিদ্যমান সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
ক্যান্সার এখন দেশে এক বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে বছরে দেড় লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে মারা যাচ্ছেন ১ লাখ ৮ হাজার। সামনে এর ব্যাপকতা আরো বাড়বে। সে হিসেবে ক্যান্সার চিকিৎসায় আমাদের সক্ষমতা আরো অনেক বাড়িয়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেটি করতে হলে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালসহ অন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।










