সারা দেশে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। রাস্তাঘাট ভেঙে গিয়েছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ মহাসড়ক ভেঙে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। বন্যাকবলিত মানুষের বাড়ি-ঘর ভেঙে গিয়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট। অনেক বিদ্যালয় পাঠদানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীর বইপত্র বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে পড়েছে। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা গেছে। সব মিলিয়ে বন্যাকবলিত এলাকায় একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেকে আবার গোখাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তারা বাধ্য হয়ে পানির দামে গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার অনেক মানুষ এখনো পানিবন্দি। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। যদিও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কম-বেশি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, কিন্তু নিজ বাড়িতে দুর্গত মানুষের কাছে সে পরিমাণ ত্রাণ পৌঁছেনি। সেসব দুর্গত মানুষের কাছে আরো বেশি করে ত্রাণ পাঠানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে যেসব বানভাসি মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। অনেক স্থানে পানি নেমে গেলেও বাসস্থান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে যেতে পারছে না, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব এলাকায় রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোয় ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। সে সঙ্গে যেসব স্কুলে অবকাঠামোর অবনতি ঘটছে, সেগুলো ঠিক করতে হবে। যেসব জায়গায় রেলসেতু ভেঙে পড়েছে, সেগুলো স্থায়ীভাবে মেরামত করতে হবে। না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শুধু রেলসেতু নয়, অন্যান্য যেসব কালভার্ট ধসে পড়েছে, সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করা জরুরি। বন্যার পর কৃষকের দানা শস্যের অভাব পূরণে ভুট্টা, সরিষা, মাষকলাই, মসুর ও মুগডালের চাষ করতে হবে। মাষকলাই গাছ ও ভুসি পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রবি ফসল বিশেষ করে বোরো ধান, গম, আলু, মিষ্টি আলু, শীতকালীন সবজি, তেলবীজ, পেঁয়াজ, রসুন, আখ প্রভৃতি ফসল চাষে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে বিনামূল্যে বীজ, সার ও বালাইনাশক সরবরাহের সরকারি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবস্থা করতে হবে পর্যাপ্ত কৃষিঋণের, যাতে সময়মতো ঋণ গ্রহণ করে কৃষক পুরোদমে কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করতে পারেন।

বন্যা-পরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকি অনেক বেশি। বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ যেন স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পায়, তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য তাদের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো রোগ থেকে রক্ষা পেতে স্যালাইন ও অন্য ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। যেসব এলাকায় বন্যার কারণে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের বইপত্র নষ্ট হয়ে গেছে, সেসব এলাকায় বিনামূল্যে বই বিতরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। না হলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়তে পারে। অনেক স্থানে বন্যার পানিতে ডুবে মানুষ মারা যাচ্ছে। এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করতে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বন্যার কারণে গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। যে কারণে অনেকেই উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন গরু বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে করে নিম্ন আয়ের মানুষ সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়ছে। তাদেরও প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাদের ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। বিনাসুদে এসএমই ও কৃষিঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

বন্যা বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে তোলে। সৃষ্টি হয় যোগাযোগ সংকটও। ২০১৯ সালে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। প্রায় দেড় মাস স্থায়ী হয়েছিল সেই বন্যা। গত বছরও বন্যার কবলে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন স্থান। সে সময় মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কাজেই বন্যা মোকাবেলার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া জরুরি। যেকোনো দুর্যোগ সামনে রেখে এর মানবিক বিপর্যয়ের দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত সবার আগে। এজন্য সম্ভাব্য বন্যাকবলিত এলাকায় অসহায় মানুষ যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পায়, সে ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলার বিষয়েও প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সময় উপদ্রুত এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ খাবার পানির সংস্থান এবং ডায়রিয়া মোকাবেলার ওষুধপথ্য, বিশেষ করে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালাইন। এরই মধ্যে বন্যার্তদের সহায়তায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সমন্বয় এবং মনিটরিং খুবই জরুরি। বিশেষ করে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ ও পথ্য সরবরাহ হচ্ছে কিনা, এসব দেখভাল করা দরকার। দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকায়ও যেন চিকিৎসাসেবা দানকারী টিম তত্পর থাকে সেটা নিশ্চিত করা দরকার। বন্যা-পরবর্তী রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। আমরা চাই, বন্যাদুর্গত অঞ্চলের চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক তত্পরতা যেন নিশ্চিত করা হয়; বন্যার্তদের মাঝে দ্রুততার সঙ্গে যেন পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়া হয়; উপদ্রুত এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতা কার্যক্রম যেন জোরদার করা হয়।

জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে। পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষায় অবশ্যই সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে এবং সব কাজে নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বন্যার পানি বা বন্যায় তলিয়ে যাওয়া নলকূপ, কুয়া বা অন্য কোনো উৎসের পানি জীবাণু দ্বারা দূষিত থাকায় কোনো অবস্থায়ই এসব পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া, কুলি করা বা পান করা যাবে না। বন্যার পানিতে গোসল, কাপড় চোপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিষ্কার করা চলবে না। যতটা সম্ভব বন্যার পানি এড়িয়ে চলতে হবে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও এসব পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বহুমাত্রিক। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবারের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায়। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ। রাস্তাঘাট অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখনই শুরু করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামত, সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে বন্যার্ত মানুষ যেন বন্যার সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে।