২০১৭ সালে অকালবন্যার পর হাওর সারা দেশে আলোচিত হয়েছিল। হাওরের খবর প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছিল। এরপর মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরে ছুটে আসেন। নানামুখী সরকারি-বেসরকারি তত্পরতায় পরিস্থিতি বদলেছে অনেক। ঠিকাদারি প্রথা বাতিল হয়ে এখন সব হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে। হাওরবাসী আশা করেছিল এই তত্পরতার পর ফসল রক্ষা নিয়ে তাদের আর হয়তো ততটা ভাবতে হবে না। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট কাটেনি। এখনো সময়মতো প্রকল্প হয় না, বাস্তবায়ন কমিটি হয় না। বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু হয় না, সময়মতো শেষ হয় না। তবে ২০১৭ সালের পর ফসল হারানোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু এর কৃতিত্ব বাঁধের না ভাগ্যের, তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। কারণ এরপর আর কোনো অকালবন্যার মুখে পড়তে হয়নি হাওরবাসীকে।

আগে যেখানে বাঁধের কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হতো, এখন সেখানে মাটি ফেলে বিল নিতে হয়। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে জেলা ও উপজেলা বাঁধ মনিটরিং কমিটি। কিছুটা আশার আলো সঞ্চারিত হলেও বাঁধ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারছে না হাওরবাসী।

অকালবন্যার হাত থেকে হাওরের ফসল সুরক্ষায় সরকার ২০১৭ সালে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা প্রণয়ন করে। কাবিটা নীতিমালার ৪.৮-এ উল্লেখ আছে, ‘পরিচালক, পওর পরিদপ্তর, বাপাউবো, ঢাকা প্রাপ্ত সব স্কিমের একটি তালিকা বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করবেন।’ নীতিমালার ৪.৯-এ ‘দাখিলকৃত স্কিমসমূহ ৩০ অক্টোবরের মধ্যে স্কিমওয়ারি অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম অনুমোদনের, ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন ও ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি কোনো বছরই।

এ বছর কয়েক দফা বন্যায় হাওরের পানি নেমেছে দেরিতে। এখনো কোনো ডেডলাইনই মানা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের দেড় মাস পরেও সব বাঁধে কাজ শুরু হয়নি। প্রথম দিকে ডেডলাইন মিস করলে বাকি ডেডলাইন ঠিক রাখা যায় না। দেরিতে কাজ হলে বন্যার সময় বাঁধের মাটি নরম থাকে এবং পানির তোড়ে সহজেই বাঁধ ভেঙে যায়। একদিকে বোরো ধান রোপণ করতে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে অকালবন্যার সময় দিনকে দিন এগিয়ে আসছে। তাই শুরু থেকে সতর্ক থাকতে হবে। দেরিতে পানি নামায় দেরিতে ধান রোপণ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেরিতে ধান পাকবে। তাই সঠিকভাবে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে হাওরের কৃষকের মনে ভয় কাজ করছে। হাওরের ইতিহাসে দেখা যায় সাধারণত দুই-তিন বছর পরপর একটা বড় অকালবন্যা হয়। সেই ঐতিহাসিক সত্য হাওরবাসীকে আরো ভাবিয়ে তুলছে।

সমস্যা শুধু সময়ের ক্ষেত্রে নয়। সমস্যা রয়েছে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও। কাবিটা নীতিমালা ২০১৭-এ স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে প্রকাশ্যে গণশুনানি করে পিআইসি গঠন করতে হবে। ২০১৮ সালে এর কিছু বাস্তবায়ন দেখা গেছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে গণশুনানি অনেক জায়গায় হয়েছে কিন্তু কমিটি গঠিত হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে বা স্থানীয় সংসদ সদস্যের পছন্দের জায়গায়। পিআইসিও গঠিত হয়েছে সংসদ সদস্যের পছন্দের লোকদের দিয়েই। অথচ সংসদ সদস্য এই কমিটির কোনো সদস্য নন, একজন উপদেষ্টা মাত্র। এতে রাজনৈতিক অনেক হিসাবনিকাশের কারণে সংশ্লিষ্ট হাওরে জমি নেই বা কৃষক নন এমন লোকও পিআইসির সদস্য হয়েছেন। এমনকি অতীতে বাঁধ কাটার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত লোককেও পিআইসিতে সদস্য করা হয়েছে। যার সবই নীতিমালার লঙ্ঘন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে দু-একজন সদস্য বিশেষ করে সংসদ সদস্যের মনোনীত সদস্য বেশি প্রভাব খাটান। বাকি সদস্যরা তাদের কথামতো দস্তখত করে যান বলে অভিযোগ আছে। এতে সবার মতামত প্রতিফলিত হয় না।

কোথায় বাঁধ হবে এবং কত টাকা খরচ হবে সেই বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা। সেক্ষেত্রে অনেক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। একদিকে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ, অন্যদিকে বাঁধ হওয়া দরকার এমন সব জায়গায় বাঁধ হচ্ছে না। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাই স্কিম নির্ধারণে আরো বেশি জনঅংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রয়োজন কার্যকর গণশুনানি।

কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি কাটার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাঁধের ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাঁধের পাড় থেকে মাটি কেটে বাঁধ দেয়া হয়। এতে বাঁধ দুর্বল হয়। বাঁধে একটি নির্দিষ্ট ঢাল থাকার কথা (২:১), কিন্তু অনেক বাঁধই খাড়া থাকায় পানির তোড়ে সহজেই ভেঙে যায়। ড্রেজার মেশিনে বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করার কারণে অনেক বাঁধ দুর্বল হয় এবং সহজেই ভেঙে যায়।

হাওর এলাকা এমনিতেই নিচু এলাকা। বছর বছর বাঁধের জন্য মাটি কাটার ফলে যেসব জায়গা একটু উঁচু ছিল, তা-ও নিচু হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন অনেক হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য বাঁধের ধারেকাছে মাটি পাওয়া যায় না। দূর থেকে নৌকায় করে মাটি আনতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, খরচও তেমনি বেশি হয়। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরো বাড়বে। তাই দ্রুত এর সমাধান বের করতে হবে। খুঁজতে হবে অন্য কোনো বিকল্প।

পানিকে তার স্বাভাবিক পথে চলতে দিলে এই পানি ক্ষতির কারণ হতো না। কিন্তু পলি পড়ে নদীর তলদেশ উঁচু হওয়ার কারণে পানি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষেত-খামারে। হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য নদী খননের কোনো বিকল্প নেই। সীমিত পরিসরে নদী খনন শুরু হয়েছে। তবে তা আরো ব্যাপকভাবে করতে হবে।

কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে কিছু স্থানে স্লুইচ গেট নির্মাণ করা দরকার। এতে হাওরে পানি প্রবেশ রোধ করা যায় এবং প্রয়োজনে হাওরের পানি বাড়ানো বা কমানো যায়। তবে স্লুইচ গেটের ব্যবস্থাপনা যথাযথ হতে হবে। কিছু হাওরের স্লুইচ গেট অকেজো পড়ে আছে। স্থানীয় অনেকের অভিমত কালভার্ট দিয়েও পানির হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এতে প্রয়োজনে কালভর্টের মুখ বন্ধ করতে হবে এবং প্রয়োজনে খুলে দিতে হবে।

হাওরের বাঁধ ভাঙার একটি অন্যতম কারণ হলো বাঁধের ভেতর দিয়ে প্রবহমান ছোট পানির ধারা। স্থানীয়ভাবে একে বলে খুলফা। এই খুলফার কারণে বাঁধ দুর্বল হয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে পানির চাপ পড়লে বাঁধ সহজেই ভেঙে যায়। যদি আগেভাগে বাঁধের মাঝখানে অপারেশন করে এসব গর্ত বন্ধ করা হয়, তবে বাঁধ ভাঙার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এ বিষয়টি স্থানীয় কৃষকরা অনেকবার বললেও পানি উন্নয়ন বোর্ড আমলে নিচ্ছে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এসব সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ অর্থলোভী মানুষ পিআইসি গঠন করে অপেক্ষায় থাকে কোনোভাবে কাজ না করে টাকা লোপাট করার জন্য। এদেরকে চিহ্নিত করে পিআইসির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দিয়ে অনিয়ম বন্ধ করতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আগের মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়ে জনমনে অসন্তোষ ও সন্দেহ রয়েছে। দ্রুত ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করে এই অসন্তোষ দূর করতে হবে।

পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তা নিশ্চিত করতে হলে সময়মতো অর্থ ছাড় করতে হবে। এজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে। পিআইসিদের চাপ প্রয়োগ করতে হবে এবং মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

যুগ যুগ ধরে যেভাবে বাঁশ-টিন দিয়ে বাঁধ রক্ষা করা হতো, এখনো কৃষকরা তার থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না। প্রযুক্তির উত্কর্ষের এ যুগে বাঁধ রক্ষায় কীভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, তা ভেবে দেখতে হবে। এজন্য গবেষণা জরুরি। তবে প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে ড্রেজার মেশিনে বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করা বন্ধ করতে হবে।

বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে জড়িতদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে তাদের ওপর সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এজন্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মীর সমন্বয়ে সামাজিক বাঁধ মনিটরিং কমিটি গঠন করলে আরো বেশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। সুষ্ঠুভাবে ও সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য বাঁধের কাজ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। অনেক সময় পিআইসিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোনীত প্রতিনিধি প্রভাব বিস্তার করে বা ঠিকাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাঁধের কাজে অবহেলা করেন। তা বন্ধ করতে হলে বাঁধের কাজ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

সর্বোপরি এই বাঁধ বা ফসলের ওপর যাদের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে, সেই কৃষকদের অধিকার সচেতন করা গেলে তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবেন। এজন্য কৃষকদের সচেতনতা খুবই জরুরি। এ লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা, মাইকিং, পোস্টারিং ইত্যাদি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

সংশোধিত কাবিটা নীতিমালায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সম্পূর্ণরূপে কৃষকদের সমন্বয়ে পিআইসির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করার নীতি প্রবর্তন করেন। এ নীতিমালায় আগের চেয়ে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ অনেক ভালো হচ্ছে বলে কৃষকরা জানান। তবে নির্ধারিত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে এবং কাজের মান বজায় রাখতে না পারলে হাওরের ফসল রক্ষা কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যাবে। যা কারো কাম্য নয়। আমাদের সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ ও সামান্য প্রচেষ্টা হাওরবাসীর এই গভীর ক্ষত দূর করতে পারে। আসুন, আমরা সচেষ্ট হই।

 

কাসমির রেজা: সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা