বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিয়ে থাকে। এভাবে জনগণের সঞ্চয়কে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখে ব্যাংক। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে পারে না ব্যাংক তাদের জমানো টাকা ফেরত দিতে পারবে তখনই ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের অবিশ্বাসের জন্ম হয়। তখন আমানতকারীরা সবাই নিজেদের টাকা তুলে নিতে ব্যাংকে ছোটে। বাংলাদেশের ব্যাংকসহ পুরো আর্থিক খাতে আস্থার সংকট বিদ্যমান। এ কারণেই গ্রাহকরা আতঙ্কে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, বলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মুখ্য সচিব মন্তব্য করেছেন। খুবই উদ্বেগজনক এ তথ্য। যদি কোনো বিশেষ সময়ে আমানতকারীরা গণহারে তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নিতে শুরু করেন, তাহলে ব্যাংকের তারল্য সমস্যা সৃষ্টি হবে এবং ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। এমন প্রবণতার রাশ টেনে ধরা না গেলে আর্থিক খাতে বড় বিপর্যয় দেখা দেবে। গ্রাহকের আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত, যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করছে বা হয়েছে, এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এখনই আইন অনুযায়ী দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে এ খাতে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি। মনে রাখা দরকার, এবারের নোবেল লরিয়েটদের মূল বক্তব্যই হচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট এবং মন্দা থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে ব্যাংক। কাজেই অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ব্যাংক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

স্বীকার করতেই হবে দেশের ব্যাংক খাত বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে। আছে সুশাসনের প্রবল ঘাটতি। এ দুর্বলতা হঠাৎ আবিষ্কার হয়েছে তা-ও নয়। মাত্র ১৪ বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। এর পেছনেও রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক উদাসীনতা। একের পর এক কেলেঙ্কারিতে ব্যাংক যে অর্থ হারিয়েছে তা সাধারণ মানুষেরই। নানা ছলছুতায় ব্যাংকের মালিকানা বদল হয়েছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। গুটিকয়েক ব্যাংকের মালিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পরিচালক রাখার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঋণখেলাপিদের বছরের পর বছর সুবিধা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি পরিবর্তন করা হচ্ছে। দুর্বল করপোরেট শাসন ব্যবস্থা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। আইন শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ক্ষমতা ও ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে ঋণ দেয়া থেকে শুরু করে সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও খেলাপি ঋণ আদায়েও শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত দ্রুত ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে, আমানতে সুদের হার বাড়িয়ে, খেলাপি ঋণ বন্ধ করে, প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যের বিপরীতে সঠিক ব্যবসায়ীদের ঋণ দানের ব্যবস্থা করে, ব্যাংকের পুলিশি আচরণ বন্ধ করে, ব্যাংক আমানতে কর কমিয়ে, সঞ্চয়ে সুদ বাড়িয়ে আস্থা তৈরি করে গ্রাহকের আমানত সুরক্ষা করার দায়িত্ব নেয়া। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বিপরীতে সুদের হার অন্তত অর্ধেক বলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন না। একদিকে নগদায়ন বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন জমার হার কমেছে বলে ব্যাংকে তারল্য কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকে বা খোলাবাজারে ডলার বিক্রি করছে বলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে নতুন সম্পদ তৈরি না হলে এ অর্থ কেন্দ্রীয় থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ফিরবে না।

আমানতকারীরা যখন আতঙ্কে অর্থ তুলে নিচ্ছেন তখন তা ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিছু ব্যাংক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। নীতিনির্ধারকদের উচিত আয়নায় নিজেদের চেহারাটাও দেখে নেয়া। ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার সংকট বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী মূলত তারাই। বছরের পর বছর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও প্রভাবশালীদের খুশি রাখতে এ খাতে কোনো সংস্কার করা হয়নি, বরং ঋণখেলাপি ও অসৎ ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে কখনো আইন সংশোধন আবার কখনো আইন ভঙ্গ করা হয়েছে। এক দশক ধরেই অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বারবার ব্যাংক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী ২০১৯ সালে বাজেটে এ নিয়ে কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ধরনেরই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার ফল গ্রাহকের আস্থাহীনতা।

২০০৭-০৮ সালে আমেরিকার ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানতের টাকা বিনিয়োগ করেছিল এমন সম্পদে যার ফলে উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল। আবাসন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি হওয়ায় লাগাম টানার জন্য সুদের হার আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতাদের সুদ পরিশোধ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকেই ব্যাংকে বন্ধক দেয়া সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ফলে ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট দেখা দেয়, যা ব্যাংকিং ইতিহাসে সাব-প্রাইম মর্টগেজ ক্রাইসিস নামে পরিচিত। এ সংকটের ফলেই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক লেম্যান ব্রাদার্স নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছিল। ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনাই মূলত অর্থনীতি মন্দার জন্য দায়ী। লোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডায়মন্ড ও ডিবভিগ দেখিয়েছেন, ব্যাংক কীভাবে এ সমস্যার সেরা সমাধান দিতে পারে। ব্যাংক মূলত সঞ্চয়কারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। তারা সঞ্চয়কারীদের যেমন তাত্ক্ষণিকভাবে সঞ্চয় ভাঙার সুযোগ দেয়, তেমনি ঋণ গ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণও দেয়। কিন্তু ব্যাংক যে এভাবে উভয় পক্ষকে সেবা দিচ্ছে, তাতে ব্যাংক নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকে। গুজব সৃষ্টি হলে ব্যাংক খাত ধসে পড়তে পারে। বিপুলসংখ্যক সঞ্চয়কারী যখন একসঙ্গে সঞ্চয় ভাঙার জন্য ব্যাংকে যান, তখন এ গুজব বাস্তব রূপ লাভের কাছাকাছি চলে যায়। এ বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে সরকার আমানতের বীমা দিয়ে ব্যাংকের জন্য আপত্কালীন ব্যাংকার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। অন্যদিকে ডায়মন্ড দেখিয়েছেন, সঞ্চয়কারী ও আমানতকারীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে ঋণগ্রহীতার ঋণ যোগ্যতা নিরূপণে ব্যাংকের অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। আর ঋণ যাতে ভালো বিনিয়োগে ব্যবহূত হয়, তা নিশ্চিত করাও ব্যাংকের কাজ।

ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়াতে বাণিজ্যিক ব্যাংককে বৈদেশিক রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে হবে। কিন্তু ব্যাংক রেটের ওপর অনাস্থায় রেমিট্যান্স হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ আমানত বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে এবং খেলাপি ঋণ ফেরত এনে তারল্য সংকটের কাঠামোগত সমাধান ছাড়া বিকল্প নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংককে অবশ্যই মূল্যস্ফীতির হারের বেশি বা অন্তত সমান হারে সুদ দিতে হবে। তারল্য সংকট সমাধানের প্রধান উপায় দুর্বৃত্তায়িত প্রশ্রয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তৈরি করা খেলাপি ঋণ ফেরানো। খেলাপি ঋণ না ফিরিয়ে ‘ব্যাংকে টাকার সংকট হলে দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক’—এ কথা বলার অর্থ খুব বেশি সুখকর নয়। এর অর্থ এমনও হতে পারে, একদিকে বিশেষ মালিকানাধীন ব্যাংকের ঋণ ইচ্ছাকৃত খেলাপি করা হবে, অন্যদিকে সরকার জনগণের টাকা বেইল আউট করে অসৎ মালিকদের ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখবে। অতীতে সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে মূলধন খেয়ে ফেলা বেসরকারি ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখার ঘটনা দেখা গিয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলে কিংবা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা হলে এসব ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের কী হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় আছে। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকের উচিত বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে, কীভাবে ব্যাংকে টাকা রাখাকে লাভবান করা যায়, সে উদ্যোগ নেয়া। ব্যাংক খাতে অনাস্থা ও তারল্য সংকটের সঙ্গে নীতিগত সমস্যার সংযোগ রয়েছে। 

ব্যাংক খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এ সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত হাতে, কোনো রকম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া, ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সময়োচিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী বোর্ড, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সবাইকে কমপ্লায়েন্স মানতে বাধ্য করতে হবে। ব্যাংক খাত উন্নত হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে, উন্নয়ন হবে সুষম। জনগণের দোরগোড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে ব্যাংক খাতকে ভালোভাবে সাজাতে ও একে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী ও ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটাতে হবে। আর কাজটি করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। ব্যাংক খাতকে যত দ্রুত সম্ভব খেলাপি ঋণের বোঝা মুক্ত করে সুশাসন শুদ্ধাচার নিশ্চিত করে সুস্থ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী অবস্থায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।