একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার ওপর। এ পরিপূর্ণতা বাস্তবায়নে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারে। ‘বিশ্ব শিশু দিবস ২০২২’-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘শিশুদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তকরণ নীতি’ যাতে করে শিশুরা আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সমানভাবে শিশু অধিকার চর্চা করতে পারে। জাতিসংঘের ১৯৮৯ সালের গৃহীত শিশু অধিকার সনদেও শিশুদের কল্যাণের বিষয়টি সর্বোচ্চ বিবেচনায় এনে আইন প্রণয়ন করার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৬ দশমিক ২ ধারায় স্পষ্টভাবে শিশুদের শোষণ, নির্যাতন, পাচার ও শিশুদের বিরুদ্ধে সব নিপীড়ন বন্ধকরণ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া আছে। শিশু অধিকার সনদের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কতটুকু সচেষ্ট তা মূল্যায়ন সময়ের দাবি। শিশুরা আগামী পৃথিবীর কর্ণধার এবং জাতীয় জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। ফলে রাষ্ট্রকে শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে হবে যাতে করে শিশুরা নিরাপদে ও নির্ভয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি ইউনিসেফের একটি জরিপে উঠে এসেছে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার প্রবণতা বেশি এবং এই বয়সী শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও ৮ শতাংশ ও ক্রমাগত বাড়ছে যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় রাষ্ট্রীয়ভাবে শারীরিক নির্যাতন বন্ধকরণে আইন বলবৎ আছে, কিন্তু মানসিক নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেই। শিশুবিষয়ক গবেষক জানেট কেই তার গবেষণা গ্রন্থ ‘প্রোটেক্টিং চিলড্রেন’-এ লিখেছেন শিশুদের মানসিক নিগ্রহের বিষয়টি তখনই গ্রহণযোগ্যতা পায় বা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয় যখন ভিক্টিমের শরীরে শারীরিক আঘাতের চিহ্ন থাকে। অথচ শিশুদের মৌখিক কিংবা নীরব বুলিং তাদের অন্তরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে শিশুদের সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। জানেটের মতে, শিশুদের মানসিক অপব্যবহারের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত না হলে অভিভাবক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে না। যেহেতু শিশুদের শারীরিক বিকাশের মতোই মানসিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ তাই শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার বিকল্প নেই। বয়সের বিভিন্ন স্তরে শিশুমস্তিষ্কের বিকাশের সঠিক অবকাঠামোর জন্য দরকার একটা শিশুবান্ধব পরিবেশ। এক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। ম্যারি এমিং ইয়াং তার জনপ্রিয় বই—‘ফ্রম আরলি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট টু হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’-এ খুব জোর দিয়ে বলেছেন যে তিন-আট বছর বয়সী শিশুদের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার বিকাশ তার পরবর্তী জীবনের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, কোনো বিষয়ের সম্যক জ্ঞান লাভ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও লজিক্যাল আর্গুমেন্ট করার সক্ষমতা সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। তাই শিশুদের এ স্টেজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং। আর এ চ্যালেঞ্জিং সময়টুকু সঠিকভাবে মোকাবেলার জন্য পরিবার, প্রাকপ্রতিষ্ঠান এবং প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বিকাশে শব্দ চয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উদাহরণস্বরূপ দুটি শিশুর মধ্যে যখন একটিকে নির্দিষ্ট করে প্রশংসা করা হবে তখন অন্য শিশুটির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিরূপ প্রভাব পড়বে। তেমনিভাবে স্কুলে একজন বাচ্চা ভালো করছে বা আরেকজন বাচ্চা পিছিয়ে পড়ছে বলে তুলনা করে সামনাসামনি নেতিবাচক কিছু বললে সেটি তার মনোকষ্টের কারণ হতে পারে। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া বাচ্চাটি ভালো না করতে পারায় অনুশোচনায় ভুগতে পারে এবং তা ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

পরিবার শিশুর বিকাশের প্রথম প্রতিষ্ঠান। অভিভাবক অনেক সময় শিশুদের ছোট ভেবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিজেরা নিয়ে তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। অভিভাবকের অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ, পারিবারিক কলহ, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থানও শিশুর মানসিক বিকাশে অনেক বড় সমস্যা হতে পারে। যে পরিবারে একাধিক শিশু রয়েছে তাদের মধ্যে সৌন্দর্যগত, মেধাগত তুলনা ও পার্থক্য শিশুদের পরবর্তী ধাপের মানসিক বিকাশের অন্তরায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুদের সঙ্গে জাগতিক পার্থক্য নির্বিশেষে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। তাকে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদের ভাবনা-চিন্তাকে ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের খেলাচ্ছলে মূল্যবোধ শেখাতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশুরা বাবামায়ের অপরিপূর্ণ কোনো স্বপ্ন পূরণের গুরুদায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসেনি। অনেক বাবা-মা শিশুদের পরিবারের স্বপ্নপূরণে চাপ দেয়, ফলে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মানসিকভাবে বিষণ্ন হয়ে পড়ে এমনকি সুইসাইডের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না। তাই পরিবারেই শিশুর গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাকপ্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের ভবিষ্যতের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অনেক শিশুই ঝরে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে এ শিশুরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন শিশুশ্রমে লিপ্ত হয়। শুধু আর্থিক কারণে যে তারা শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত হলো এ ধারণা তাদের মানসিক অবসাদে ফেলে দেয় এবং সে সঙ্গে সুবিধাভোগকারীদের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভের জন্ম দেয়। তাই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণীকক্ষে সব শিশুকে সমানভাবে মূল্যায়নের সক্ষমতা শিক্ষকদের অর্জন করতে হবে।

জানেট কেই তার গবেষণায় আরো উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিক শিক্ষা পরিসরে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ইমোশনাল নেগলিজেন্সির শিকার হয় যা শিশু আজীবন মনে রাখে। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে শিশুরা ভয়মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা লাভ করতে পারে। অন্যদিকে বয়ঃসন্ধির সময়টুকুতে শিশুরা যাতে সানন্দে তাদের গল্পটি বলতে পারে সেজন্য স্কুলগুলোয় কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষক থাকতে হবে।

শিশুরা বাঁচুক ফুল হয়ে, পাখির মতো ডানা মেলে, নিরাপদে, নিশ্চিতে। শিশুদের মানসিক ও মানবিক বিকাশে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করলেই নিশ্চিত হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত সুন্দর ভবিষ্যৎ।

 

তানিয়া সুলতানা: শিশুবিষয়ক গবেষক

এসওএস চিলড্রেন্স ভিলেজ, বাংলাদেশ