বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর বাজেটে একটু ভিন্নতা থাকবে। এটিই স্বাভাবিক। এ বাজেটকে যেমন জীবনের সুরক্ষার কথা ভাবতে হবে, তেমনি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের চাকা যেন নির্বিঘ্নে ঘুরতে পারে, সে বিষয়ে নিতে হবে নানা পদক্ষেপ। আমাদের মাথায় রাখতে হবে নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে যে নিম্ন আয়ের মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ওষ্ঠাগত, এ বাজেট যেন তাদের কথা ভাবে। টিকা আবিষ্কার হয়েছে। দেশে টিকা কার্যক্রম চলমান। কিন্তু এখন পর্যন্ত কতজন নিম্ন আয়ের মানুষ টিকা দিয়েছে? তারা যদি টিকা কার্যক্রমের আওতার বাইরে থাকেন, তবে তারা তো বটেই, সারা দেশও করোনার থাবা থেকে মুক্ত হতে পারবে না। টিকার জোগান নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই হাওর, চরসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টিকা প্রদানে তাদের যে অনীহা রয়েছে, তা দূর করার জন্যও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা কর্মসূচি নিতে হবে।

করোনাকালে হাওর এলাকায় বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করেছে। হাওরের অনেক শ্রমিক শহর থেকে আবার গ্রামে ফিরে এসেছেন। গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় তারা বেকার বসে আছেন। যাদের সামান্য কিছু সঞ্চয় ছিল, তাও শেষ হয়েছে। এখন এসব পরিবারের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বাজেটে তাদের সহযোগিতার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। একই সঙ্গে হাওরে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটাতে হবে।

বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া আরো গণতান্ত্রিক করতে হবে। শুধু কয়েকটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাজেট প্রণয়ন করলে হবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কথা শুনতে হবে। বাজেটে তাদের মতামতের প্রতিফলন থাকতে হবে। বাজেটকে আরো সুষমভাবে বণ্টন করতে হলে কার্যকর জেলা বাজেটের দিকে এগোতে হবে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জেলা বাজেটের কথা দু-একটি বাজেটে উল্লেখ করেছেন কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

হাওর এলাকার উন্নয়নে সরকারের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প পরিকল্পনাধীন আছে। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তার মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে ধর্মপাশার পথে হাওরে উড়াল সেতু প্রকল্প, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প, সীমান্ত সড়ক উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে, না-হয় হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পড়বে।

হাওরে দারিদ্র্য নিরসনে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। যেহেতু হাওর এলাকা বছরের অর্ধেক সময় পানিবেষ্টিত থাকে, তাই হাওরে মাছ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। হাওরের মাছে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। জাটকা নিধন বন্ধ করে ইলিশের ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ যেভাবে বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে, তেমনি হাওরে মাছের ফলন বাড়িয়েও বিশ্বকে অবাক করা যাবে। হাওরে দূর হবে বেকারত্ব, কমবে দারিদ্র্য। এজন্য হাওরে মাছের প্রজননকালীন অন্তত দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। তবে এ দুই মাস জেলেদের প্রণোদনা দিতে হবে। হাওরের জেলেদের এমন প্রণোদনা দিয়ে দুই মাস মা-মাছ ও পোনা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে পারলে হাওরেও মত্স্য বিপ্লব ঘটবে। মাছের ফলন বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। এক লাখ নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা করে দিলে তিন মাসে খরচ হবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা; কিন্তু এর ফলে বছরে হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের মাছ উৎপাদন বাড়বে। হাওরের সুস্বাদু মাছ বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও উপার্জন করা যাবে। তবে বিষয়টিকে শুধু ক্যালকুলেটর টিপে আর্থিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব আরো সুদূরপ্রসারী।

হাওরে প্রায় প্রতি বছরেই অকালবন্যা, শিলাবৃষ্টি, ব্লাস্ট রোগ, গরম বাতাস ইত্যাদি কোনো না কোনো কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরই এক সন্ধ্যার গরম বাতাসে প্রায় ৬৮ হাজার ১২৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে অকালবন্যায় সুনামগঞ্জে প্রায় শতভাগ ফসলহানি হয়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে হাওরের বাকি ছয়টি জেলায়ও। এর প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাপক ভিত্তিতে নদী খনন প্রয়োজন। অধিক হারে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। বজ পাতে মৃত্যুর হার কমায় বজ ত ফিরে আসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাইডেনের গ্লোবাল লিডার সামিট বা সাম্প্রতিক সময়ে তার জলবায়ুসংক্রান্ত বিশেষ দূত জন কেরির বাংলাদেশ সফর এমন ইঙ্গিত বহন করে। এসব ফান্ড থেকে হাওরের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখার দাবি তুলছেন হাওরবাসী।

হাওরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত নাজুক। যাতায়াতের সমস্যার কারণে রোগীরা দূরে শহরে বা বড় বাজারে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে না। তাই হাওরে অধিক হারে কার্যকর কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ প্রয়োজন। বর্তমানে যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, এসব কমিউনিটি ক্লিনিকের অনেকগুলোই সেভাবে সচল নেই। এগুলোকেও সচল করা জরুরি।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওর এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম। যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় দূরবর্তী গ্রামে নৌকায় গিয়ে ক্লাস করা ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। তাই হাওরে আরো ঘন ঘন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই এমন গ্রামগুলোয় সরকার এক হাজার নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রকল্প থেকে হাওর এলাকায় অধিক হারে প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বাড়ি থেকে হাওরের বিদ্যালয়গুলোয় যাতায়াতের জন্য আলাদা নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১০ সালের ৮ জুন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় যাত্রীবাহী নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে আটজন ছাত্রছাত্রীর সলিল সমাধি হয়। হাওরে এ রকম দুর্ঘটনার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে হাওরাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের জীবনরক্ষায় প্রত্যেকটি নৌ-রুটে এক বা একাধিক নৌকা চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ওইসব বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার কমবে এবং পড়াশোনার মানও বাড়বে।

হাওরের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী সমাধান বের করতে হলে প্রয়োজন গবেষণা। কিন্তু হাওর নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হচ্ছে না। অকালবন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য যে স্বল্পমেয়াদি বা পানি সহনীয় ধানের কথা বলা হচ্ছে, তা উদ্ভাবনের জন্যও দরকার গবেষণা। একই সঙ্গে হাওরে মত্স্য গবেষণাগার ও মত্স্য হ্যাচারি বা প্রজননকেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। প্রত্যেকটি হাওরে মত্স্য অভয়ারণ্য রাখা দরকার। তাই হাওরের সম্পদ সুরক্ষা ও হাওরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে গবেষণা খাতে আরো বেশি বাজেট বরাদ্দ এখন সময়ের দাবি।

হাওরের কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পান না। অভাবের তাড়নায় অনেকেই ক্ষেতে ধান রেখেই ধান বিক্রি করে ফেলেন। কেউবা ধান কাটার মৌসুমে কম দামে ধান বিক্রি করেন। কৃষকরা যাতে ধান-চালের ন্যায্য মূল্য পান, তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার বর্ধিত মূল্যে ধান-চাল সংগ্রহ করে। কিন্তু এ সংগ্রহের পরিমাণ এত কম যে তা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই আরো অধিক হারে ধান-চাল ক্রয় করতে হবে। অন্যদিকে সরকারিভাবে ধানের চেয়ে চাল বেশি কেনা হয়। ধান বিক্রি করেন কৃষক, আর চাল বিক্রি করেন চালকল মালিকরা। তাই চাল কিনলে কৃষক নয়, চালকল মালিকরাই তথা মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হন। তাই চাল নয়, অধিক হারে ধান ক্রয় করতে হবে। তা অবশ্যই প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে কিনতে হবে। অধিক হারে ধান-চাল সংগ্রহে সরকারের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় গোডাউনের অভাব। তাই হাওরে পর্যাপ্ত পরিমাণে গোডাউন নির্মাণ করতে হবে। ন্যায্যমূল্যে অধিক ধান সংগ্রহ এবং গোডাউন নির্মাণ করার জন্য বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন।

জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০০৯-এর ২(খ) অনুযায়ী, ‘প্রকৃত মত্স্যজীবী সংগঠন স্থানীয় পর্যায়ে সমবায় অধিদপ্তরে বা সমাজসেবা অধিদপ্তরে স্থানীয় জলমহাল ব্যবস্থাপনা নিবন্ধিত হলে স্থানীয় জলমহাল ব্যবস্থাপনা বা ইজারায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে কোনো সমিতিতে যদি এমন কোনো সদস্য থাকেন, যিনি প্রকৃত মত্স্যজীবী নহেন, তবে সে সমিতি কোনো সরকারি জলমহাল বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্য হবে না।’ কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত মত্স্যজীবী নয়, অমত্স্যজীবীরাই লিজ নিচ্ছেন বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত মত্স্যজীবীদের সমিতি লিজ পেলেও তাদের নাম করে স্থানীয় প্রভাবশালীরাই ভোগ করছেন ওই জলাভূমি। আবার কখনো বাহারি মত্স্যজীবী সমিতির নামে যে সংগঠন দেখানো হচ্ছে, সেখানে কোনো মত্স্যজীবী নেই। এর মূল কারণ অর্থনৈতিক। কোনো কেনো বিল বা হাওরের লিজ মানি কোটি টাকার ওপরে। দরিদ্র মত্স্যজীবীদের পক্ষে কোটি টাকা দিয়ে বিল ইজারা আনা সম্ভব নয়। তাই তারা প্রভাবশালীদের খপ্পরে পড়েন। এজন্য বিলগুলোর লিজ মানি কমিয়ে প্রকৃত মত্স্যজীবীদের বিল দখলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। এতে মত্স্যজীবীদের অধিকার যেমন সংরক্ষণ হবে, তেমনি মত্স্যজীবীরা মাছের প্রজাতি রক্ষায়ও ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মাছ উৎপাদন বাড়বে। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ ও নির্দেশনা প্রয়োজন।

করোনাকালের এ বাজেটে আমাদের যেমন সুরক্ষার কথা ভাবতে হবে, তেমনি ভাবতে হবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কথাও। এই দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সরকারি সব প্রণোদনা বা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে এসব হতভাগা মানুষকে। কিন্তু বাস্তবে কি তা হচ্ছে? সরকার গত বছর যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, তাতে পুঁজিপতিরাই বেশি সুফল পেয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগে কমই ছিল। পুঁজিপতিদের তোষণের এ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে হাওর, চর এলাকার মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে যে অতিরিক্ত বেকারত্বের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে এ বাজেট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ভাবতে হবে জীবন ও জীবিকার কথা।

 

কাসমির রেজা: সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা